মুক্তিযুদ্ধের মুক্তা, দেশের গর্বিত রত্ন

dulal

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

আমাদের ভাষা আন্দোলনের সাথে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে যুক্ত হয়ে থাকবে, তাঁদের মধ্যে হাসান হাফিজুর রহমান শীর্ষে। কবি কিংবা সাংবাদিক হিসেবে তাঁর মূল্যায়নের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ত্বপূর্ণ সম্পাদক হিসেবে। তবে সে সম্পাদক ‘সমকালে’র সম্পাদক হিসেবে নয়, ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস’-এর সার্থক সম্পাদক হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তথ্য মন্ত্রনালয়ের তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংগ্রহ, সম্পাদনার জন্য একজন যোগ্য ব্যক্তি খুঁজতে খুঁজতে যথার্থ ব্যক্তির উপর দায়িত্ব দেন, তিনি হলেন হাসান হাফিজুর রহমান। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব যে কত বড় কঠিন দুঃসাধ্য দুরূহ কাজ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নানান প্রতিকূলতা, কঠিন চ্যালেজ অতিক্রম করে রাতদিন নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে জাতির জন্য ১৬ খন্ডে শ্রেষ্ঠ উপহার দিয়ে গেছেন স্বাধীনতা দলিল। যা যুগে যুগে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বহন করবে। সেই মানুষটিকে কাছ থেকে দেখার যুগসূত্র করিয়ে দিয়ে ছিলেন বনধুবর প্রয়াত কবি ত্রিদিব দস্তিদার। ত্রিদিব শেষ দিকে তার সাথে সম্পাদনা সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। একদিন ত্রিদিবের সাথে অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার দোতলার বারান্দায় দেখা। তিনি বললেন, ‘হাসান ভাই আপনার কথা জিগ্যেস করছে। আপনার কথা জানতে চেয়েছে। যাবেন, দেখা করবেন?’ আমি বুঝতে পারলাম কেনো হাসান ভাই আমার কথা ‘জিগ্যেস’ করছেন। সে প্রসঙ্গে পড়ে আসছি। আমি সাথে সাথে রাজী হয়ে গেলাম। দু’জনে রিক্সায় চরে হাজির হলাম- হাসান হাফিজুর রহমানের কাছে। কি বিশাল জাতীয় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ঘর ভর্তি বই পত্র পত্রিকার কাটিং ফাইল আর ফাইল। স্তরে স্তরে একদিকে সাজানো অন্যদিকে অগোছানো। যুদ্দূর মনে পড়ে ইতোমধ্যে বেশ ক’টি খন্ড বের হয়ে গেছে। বাকী কাজ ও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ অবস্থায় তাঁর শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। উল্লেখ্য সেই বছর সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ক’জনকে জাতীয় পুরস্কারে পুরস্কৃত করেছেন। তারা হলেন সাংবাদিকতায় খন্দকার আবদুল হামিদ, নাট্যকার হিসেবে আব্দুল্লাহ আল মামুন, অভিনেতা হিসেবে অনোয়ার হোসেন (এবং সম্ভবত আমজাদ হোসেনও), সঙ্গীতে ওস্তাদ ফজলুল হক এবং সাহিত্যে হাসান হাফিজুরর রহমান। ঘটনা ক্রমে এরা প্রত্যেকেই জামালপুরের (তৎকালীন জেলা) কৃতি সন্তান। আমি তাঁদের নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম, ‘ঝিনুক’ নামে একটি সিনে মাসিক পত্রিকায়। হাসান ভাই ‘ঝিনুক’ দেখেই আমার কথা বলেছিলেন ত্রিদিবকে। তখন তিনি আরেকটি মজার কথা বলেছিলেন- ‘ঝিনুকের ভেতর মুক্তো তুলে ধরেছো।’ হ্যাঁ, তাঁর কথা দিয়ে বলতে চাই, তিনি তো সত্যিকার অর্থেই মুক্তিযুদ্ধের মুক্তো, মুক্তিযুদ্ধের মানিক। হাসান ভাইয়ের কাছে ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ শীর্ষক সংকলণের জন্য একটি কবিতা চাইলাম। তিনি তাঁর কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘বীরাঙ্গনা’ কবিতাটি নিতে বললেন।

“তোমাদের ঠোঁটে দানবের থুথু,

স্তনে নখের দাগ, সর্বাঙ্গে দাঁতালের

ক্ষতচিহ প্রাণান্ত গ্লানিকর।

লুই হয়ে গেছে তোমাদের নারীত্বের

মহার্ঘ মসজিদ। উচ্ছিষ্টের দগদগে

লাঞ্ছনা তোমার

পরিত্যক্ত পড়ে আছ জীবনের ধিকৃত

অলিন্দে নাকচ তাড়িত।

এখন চাও কি তোমরা?

বুক চিরে হৃদপিন্ড টেনে ছুঁড়ে ফেলে

দিতে দূরে?

শাড়ির আঁচলে কণ্ঠরুদ্ধ করে

পৃথিবীর হাওয়া থেকে চিরতরে হতে কি

উধাও?

আত্ম ধিক্কারে অপমান ফিরবে না ঘরে

আর কোনো মতে?

তোমাদের ঘৃণার আগুন লেলিহান

স্পর্শ করে

আপন আকাশ সীমা সব পাপ

পোড়াবার

অপার পাবক হয়ে ওঠো রাতারাতি।

সম্ভ্রমেনুইয়ে মাথা

paraner 111

হাসান হাফিজুর রহমান

                                                                   স্তব্ধ চোখে দেখি হতবাক, এমনতো

                                                                     দেখি নি কখনো আগে!

                                                                     জীবনের পবিত্রতা তুচ্ছ হয়ে গেছে

                                                                   তোমাদের কাছে।

                                                                   লাঞ্ছনার বেদীমূলে তোমরা সবাই

                                                                একেকটি জীবন্ত স্মৃতিচিহ হয়ে গেছো

                                                                আজ,

                                                               সংগ্রামের খর প্রাণকণা অনশ্বর

                                                              বীরাঙ্গনা।

ভিটেমাটি ধন্য হবে, সেখানেই হেঁটে

যাবে

পদপাতে আল্পনা এঁকে এঁকে মুহূর্তে

সজীব হবে দূষিত বাতাস।

শত্রু হননের আগুন বইছে দু’হাতে, এর

চেয়ে বেশি।

চাই না কিছুই।

দু’হাত বাড়িয়ে ডাকি,

‘ফিরে এসো ফিরে এসো, তোমারই

নতুন যৌবন,

আসন্ন বিজয়ের আগাম উৎসব’।

পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, বীর ‘বীরাঙ্গনা’য় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি- চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। প্রতিফলিত হয়েছে- নির্যাতনের চিত্র, মা-বোনের বেদনার্থ নির্মম কথা। কবিতার শুরু- ‘তোমার ঠোঁটে দানবের থুথু’ আর শেষ- ‘আসন্ন বিজয়ের আগাম উৎসব।’ চব্বিশ পঙক্তির এই অসামান্য কবিতার মাধ্যমে হাসান হাফিজুর রহমান স্বাধীনতার ইতিহাসের এক শৈল্পিক স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ‘দানবের থুথু’, দাতালের ক্ষতচিহ, লুট হয়ে গেছে নারীত্ব, ‘পরিত্যক্ত জীবন, শাড়ির আঁচলে কণ্ঠ রুদ্ধ, আত্ম ধিক্কার, ঘৃণার আগুন প্রভৃতি শব্দের সমন্বয়ে যেমন নেতিবাচক জ্বালা-যন্ত্রণা-ক্ষোভ-ঘৃণার চিত্র তুলেছেন, তেমনি তার বিপরীতে সতীত্বকে মহার্ঘ মসজিদ, জীবনের পবিত্রতা, ভিটে মাটি ধন্য, বিজয়ের উৎসব প্রভৃতি শব্দ উপমা ব্যবহারের মাধ্যমে কী গভীর সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাসান হাফিজুর রহমানকেও বাঙালি জাতি অনন্তকাল সম্মান জানাবে, শ্রদ্ধা জানাবে। কারণ, তিনি দেশের কৃতি সন্তান, দেশের গর্বিত রত্ন। (জঃ জুলাই ১৪, ১৯৩২ ।। মৃঃ এপ্রিল ০১, ১৯৮৩)