হর্ণ খুলে মোটরসাইকেলে ১৪০০ কিলোমিটার

আমাদের দেশেবিদেশের নিয়মিত লেখক সুব্রত গোস্বামী প্রায়ই বন্ধুদের সেঙ্গে করে বাইকে বেড়িয়ে পড়েন ভারত বর্ষের যে কোনো শহরে।সে নিয়েই আমাদের অনেক পর্ব গিযেছে ‘মোটরসাইকেল ডায়রী’।এবারেও বেড়িয়ে পড়েছেন অরণ্যে। তবে এ যাত্রা একটু অন্যরকম। সুব্রত নিজেই যাওয়ার আগে তার ফেইসবুকে লিখেছেন- ‘এবারের পথটা হয়ত কিলোমিটারের হিসেবে বেশি নয়। দিন দশেকের রাইডিং-এ মাত্র চোদ্দ’শ কিলোমিটার। তবে প্রায় পুরো পথটাই. অরণ্যময়। মারোমার, ম্যাকলস্কিগঞ্জ, দলমা আর পুরুলিয়ার বুনো পাহাড়। সে যাই হোক এবারের জার্ণিটার একটা অন্য মাহাত্ম্য রয়েছে। মাহাত্ম্যই বটে। একটা শপথ নিয়েছি আমরা। গোটা টিমের কেউ এই পুরো পথের কোথাও হর্ন বাজাব না। ন্যাশনাল হাইওয়ে, স্টেট হাইওয়ে, মেঠো, পাথুরে, অলিগলি, সবরকমের পথ, কিন্তু কোথাও হর্ন দেব না কেউ। একটাও হর্ন নয়।

চার বাইকার

এটা আসলে আমাদের একটা প্রতিবাদ। যাঁরা অহেতুক, নির্দ্বিধায় হর্ন বাজিয়ে চলেছেন তাদের তো আর ধরে ধরে চড় মেরে শিক্ষা দেওয়ার উপায় নেই আমাদের, তাই এই পথ। কিছুটা মোমবাতি মিছিলের মত বলতে পারেন। আমি বিশ্বাস করি যাঁরা মোমবাতি হাতে মিছিল করে প্রতিবাদে সামিল হন তাঁরা আর যাই করুন, যে বিষয়ের প্রতিবাদে মোমবাতি হাতে পথে নেমেছেন সে অন্যায়টা কোনওদিনও করবেন না। আমাদেরও তাই। আমাদের দলের কেউ কেউ বেশ কয়েকবছর ধরে ছাড়া বাইক চালাই, আমি নিশ্চিত বাকিরা আজ থেকে আর হর্ণ বাজাবেন না।

আমার কথা বিশ্বাস করুন, একটাও হর্ন বাজানোর প্রয়োজন পড়েনা গাড়ি চালাতে গেলে। একটাও না। তা যাই হোক এই পথের অনেকটাই জংলি। হাতিদের বাসস্থান। আমাদের জন্য গুডলাক উইশ করুন যাতে আমরা এবং হাতিরা কেউই কাউকে দেখতে না পাই। আমাদের সবকটা বাইকেরই হর্নের কানেকশান খোলা থাকবে, হাতি পিষে মেরে চলে গেলেও প্রাণের তাগিদে হাতি তাড়াতে হর্নটুকুও দিতে পারব না।’ সুব্রতর এই কথা যেমন শব্দদূষণ দূর কমবে তেমনি অনেককে হর্ণ বাজানো থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিতও করবে।

আপনি বাইক চালান? কিংবা বাইকে সওয়ার হয়ে ঘুরতে বেরোন? যদি এরকম হয়, বাইকে করে বেরোলেন। কিছুটা যাওয়ার পর একটা ভীষণ জ্যামের রাস্তায় দেখলেন আপনার বাইকের হর্ন কাজ করছেনা। কী করবেন? হয় আপনি একটা গ্যারেজ দেখে হর্নটা সারিয়ে নেবেন নাহলে খুব সাবধানে আবার বাড়ি ফিরে আসবেন।কিন্তু কলকাতা শহরের চার যুবক হর্ন খুলে রেখে বাইক নিয়ে বেড়িয়েছেন বেড়াতে। শহর বা শহরতলি নয়। এগারোদিন ধরে তাঁরা হর্নহীন বাইক নিয়ে ঘুরবেন কমবেশি ১৪০০ কিলোমিটার।

বাংলাব্যাণ্ড চন্দ্রবিন্দু তাঁদের গানে লিখেছিল, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তো বাইক চড়লে বেশ হয় কি জন্ডিস কেস হয় ব্রক্ষ্মা জানেন।’ সাধারণত অল্পবয়সী বাঙালি ইদানিং জটিল পরিস্থিতিকে জন্ডিস কেস বলে অভিহিত করে থাকেন। কিন্তু এই চার জন ব্রক্ষ্মার নামে বেরিয়ে পড়েছেন জটিল পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করেই।

চিরঞ্জীব দাস, সুজয় কুণ্ডু, রানা রায় এবং সুব্রত গোস্বামী বৃহস্পতিবার কলকাতা থেকে রওনা হয়েছেন চারটি হর্নহীন বাইক নিয়ে। দলমা, নেতারহাট, মারোমার জঙ্গল সহ ঝাড়খণ্ডের নানা জনপদ ঘুরে কলকাতায় ফিরবেন ১৯ তারিখ। কিন্তু কেন এমন হর্নহীন বাইক সফর? প্রথম দিনের মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে কলকাতার একটা অনলাইন পত্রিকাকে সুব্রত গোস্বামী বলেন, ‘ব্যাপক ভাবে শব্দদূষণ ছড়াচ্ছে প্রতিদিন। গাড়ির হর্ন তার অন্যতম। আমরা তাই শব্দদূষণের বিরুদ্ধে সচেতনতা প্রচারের লক্ষ্যেই এই বাইক অভিযান করছি। মোমবাতি জ্বালিয়ে যেভাবে প্রতিবাদ হয় সেরকমই এটি একটি নিঃশব্দ প্রতিবাদ।’এই চার যুবকের বাইক সফর নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে গিয়ে ওই অনলাইনকে বলেন, থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রাক্তন মুখ্য আইনী পরামর্শদাতা বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই চারজনের প্রতি আমার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। কিন্তু মোটরভেহিক্যাল আইনানুযায়ী হর্নহীন গাড়ি বেআইনি। শব্দদূষণ রুখতে এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে ভাল। কিন্তু উত্তেজনার বশে এই চার যুবক অজান্তেই আইন ভেঙে ফেলেছেন।’

 

তথ্যসূত্র: বাংলা Buzz

ছবি: সুব্রত গোস্বামী