শুভ জন্মদিন হুমায়ূন আহমেদ

কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এ তথ্য বাংলা সাহিত্যে তাঁর পাঠকদের জন্য নতুন কোনো সংবাদ নয়। যেমনটা সংবাদ নয় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। আজ বাংলা সাহিত্যের এই অবিস্মরণীয় এই কথাশিল্পীর ৬৯তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে শুধু এটুকুই বলা যায়, টানা চার দশক সহজ, সরল ভাষায় অনাবিল হাস্যরসকে লেখায় সংযুক্ত করে এই মানুষটি শুধু জীবনের উপরিতলের কথা বলে এক ধরণের জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও তাঁর লেখায় মানুষের জীবনের অনেক গভীর রহস্যময় সংকেতকে লিপিবদ্ধ করে গেছেন অদ্ভূত কৃতিত্বের সঙ্গে।

আজ এই প্রয়াত কথাশিল্পীর জন্মদিনে প্রাণের তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।

বাংলা দেশের সাহিত্যে গত ও বর্তমান শতাব্দীতে সবচেয়ে নন্দিত ও আলোচিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ অবিরাম ধারায় লিখে গেছেন। জনপ্রিয় হয়েছেন বহুমাত্রিক ধারায়। গল্প, উপন্যাস, টিভি নাটক রচয়িতা, বাংলাদেশে প্রথম আধুনিক কল্পবিজ্ঞান কাহিনির লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ নানা মাধ্যমেই তার পাঠকদের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছেন। মানুশের জীবনই ছিলো তার লেখার মূল বিষয়। সেখানে তিনি সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন অদ্ভূত সব চরিত্রের, দিয়েছেন মধ্যবিত্ত সমাজের অনুপূঙ্খ বিবরণ। তাঁর লেখায় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধও ধরা দিয়েছে ভিন্ন মাত্রায়।তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা তিন শতাধিক।বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত। সত্তর দশকের শেষভাগে থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। এই কালপর্বে তাঁর গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনারহিত। তাঁর সৃষ্ট হিমু, মিসির আলী ও শুভ্র  চরিত্রগুলি বাংলাদেশের যুবকশ্রেণীকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে।

 তাঁর পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। তাঁর পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ সালে  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তৎকালীন তঃকালীন পিরোজপুর মহকুমার এসডিপিও (উপ-বিভাগীয় পুলিশ অফিসার) হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় শহীন হন পাক বাহিনীর হাতে। তাঁর বাবা সাহিত্য অনুরাগী মানুষ ছিলেন। তিনি পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি করতেন। বগুড়া থাকার সময় তিনি একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছিলেন। গ্রন্থের নাম দ্বীপ নেভা যার ঘরে । তাঁর মা’র লেখালিখির অভ্যাস না-থাকলেও সম্প্রতি একটি আত্ম জীবনী গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম ‘জীবন যে রকম’ । পরিবারে সাহিত্যমনস্ক আবহাওয়ায় ছিল। তাঁর অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের একজন বিজ্ঞান শিক্ষক এবং কথাসাহিত্যিক; সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট।

তাঁর রচিত উপন্যাস থেকে জানা যায় যে ছোটবেলায় হুমায়ূন আহমেদের নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান; ডাকনাম কাজল। তাঁর পিতা (ফয়জুর রহমান) নিজের নামের সাথে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীতে আবার তিনি নিজেই ছেলের নাম পরিবর্তন করে ‌হুমায়ূন আহমেদ রাখেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জীবনে একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য জীবনের শুরু। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায়  ‘নন্দিত নরকে’ নামে উপন্যাসটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২-এ কবি-সাহিত্যিক আহমদ ছফার উদ্যোগে উপন্যাসটি খান ব্রাদার্স কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ তাঁর ২য় গ্রন্থ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দুই শতাধিক গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস রচনা করেছেন।  তাঁর গল্প ও উপন্যাস সংলাপপ্রধান। তাঁর বর্ণনা পরিমিত এবং সামান্য পরিসরে কয়েকটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে চরিত্র চিত্রণের অদৃষ্টপূর্ব প্রতিভা তাঁর ছিলো। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস ‘মধ্যাহ্ন’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে পরিগণিত। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।

তাঁর পরিচালনায় প্রথম চলচ্চিত্র মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি পায় ১৯৯৪ সালে। ২০০০ সালে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ও ২০০১ সালে ‘দুই দুয়ারী’ চলচ্চিত্র দুটি দর্শকদের কাছে দারুন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। ২০০৩-এ নির্মাণ করেন চন্দ্রকথা’ নামে একটি চলচ্চিত্র। এছাড়াও হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র।

হুমায়ুন আহমেদ তাঁর অসংখ্য বহুমাত্রিক সৃষ্টির জন্য নানা পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৮১ সালে লাভ করেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার। ১৯৯৪ সালে লাভ করেন একুশে পদক।

 

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া

ছবিঃ গুগল