নারী যখন নারীর শত্রু

আন্জুমান রোজী,(কানাডা থেকে)

কতিপয় নারীর উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন এবং আচরণ দেখে অনেকেই নারীবাদের মর্ম গুলিয়ে ফেলছেন। নারীবাদ বিষয়টি কারও ব্যক্তিগত বিষয় নয় যে; যে কেউ যেভাবে খুশি ব্যবহার করে নিজস্ব অন্ধকারাচ্ছন্ন মতবাদ দিয়ে তা উপড়ে ফেলবে! নারীবাদ বিষয়টি নারীর ব্যক্তি সচেতনতার অস্ত্রস্বরূপ। নারীও যে একজন মানুষ; তা যেন সে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে; তার শিক্ষা,মেধা আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। যদিও যার-যার জীবনবোধ তার-তার মতো। অথচ একেকজনের ব্যক্তিগত জীবনের নেতিবাচক জীবনাচারের বিষয় দিয়ে একটি চিরন্তন সত্য ও সুন্দর প্রগতিধারার মতবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। অবশ্য যা্রা এ কাজ করছে; তাদের শিক্ষা, মেধা, বোধ ও মননের জায়গাটা যে শূন্যের কোঠায়; তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মূলত এরাই অন্যের ওপর ভর করে চলতে অভ্যস্ত।

প্রথমত নারী একজন মানুষ। একজন মানুষ হিসেবে নারীরও অধিকার রয়েছে; এই পৃথিবীর আলো বাতাসে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার। একজন নারীরও পছন্দ অপছন্দ আছে; আছে ভালো লাগা, মন্দ লাগাও! তার আছে কথা বলার দক্ষতা, নিজস্ব চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। সর্বোপরি নারী পারে নিজের মতো করে তার জীবন গড়ে তুলতে। অথচ আমাদের সমাজ- জন্মের পর থেকেই নারীকে দুর্বল, অবলা করে গড়ে তোলে। বিভিন্নভাবে নারীকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়; নারী কিছুই বোঝে না। নারীর ভাবার ক্ষমতা নেই, নেই নিজেকে দেখেশুনে রাখার। নারীর নেই কোনো বোধ-বুদ্ধিও! এমনি আরও পশুতুল্য মনোভাব দেখিয়ে আসছে; পিছিয়ে পড়া অন্ধকার সমাজ। এভাবে নারী কতভাবে যে বলী হচ্ছে; তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এখানে শিক্ষিত, অশিক্ষিত বলে কোনো কথা নেই। নারীকে ভাবা হয় শুধু পণ্য আর ভোগের সামগ্রী।

বেশিরভাগ নারী নিজেও এই মানসিকতার; অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় অভ্যস্ত। তারা নিজেরাই নিজেদের দুর্বল মনে করে অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকে। এসব নারীই মূলত অন্য নারীর পেছনে লেগে থাকে। অন্য নারীর স্বাধীন চিন্তা-চেতনাকে, তাদের স্বাকীয়তাকে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপের মধ্যদিয়ে হেয় করে, অপমান করে। এসব দুর্বলচিত্তের নারীই আজ সমাজের দুষ্টক্ষত হয়ে আছে। এটা অনেকটা ঈর্ষাকাতর মনোভাব থেকেও করে; আবার নিজের অসহায়ত্ব ঢাকার জন্যও স্বাধীনচেতা নারীর ওপর আক্রমণ করে বুঝিয়ে দেয়; তারা নিজেরাই ঠিক। অথচ এরাই সমাজে যুগযুগ ধরে অপাংক্তেয় হয়ে আছে। এরাই ‘নারীবাদেরা শুনুন’ বলে কটাক্ষ করে উদ্ধতপনা দেখায়।

নারীর এহেন দুর্বলচিত্তের কারণ অনেকটাই ধর্ম। সব ধর্মে নারীকে ভিন্নসত্তা বা ভিন্নধাঁচের মানুষ মনে করা হয়। বাস্তবতার নিরিখে ভাবলে দেখা যায়; ধর্মের ভিত্তিই হচ্ছে ক্ষমতার রাজনীতির ছত্রছায়ায়! যে ক্ষমতার বিন্যাসকরণ শুরুই হয়েছে নারীর ওপর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে! তাই পৃথিবীর সব ধর্মেই নারীর অবস্থান দ্বিতীয় লিঙ্গে ! সেখান থেকেই লড়াইটা শুরু করতে হয় নারীবাদী আন্দোলনগুলোর ! ধর্মের এই নাগপাশ; সময়ের অগ্রগতির থেকে মুক্ত হচ্ছে কিনা; সেটাই বিতর্কের বিষয়! কিন্তু দেখার বিষয়, যুগ পরিবর্তনের সাথে-সাথে; ধর্মের বাঁধনও একটু-একটু করে আলগা হলেও প্রভুত্বের অনুষঙ্গগুলো নতুন-নতুন রূপে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করতে থাকে- সমাজ থেকে রাষ্ট্রব্যবস্থার অলিতে গলিতে! যার কঠিন ধাক্কা খেতে হয় নারীকে আধুনিক জীবনের পরতে-পরতে!

ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে সর্বত্র নারীর ওপর প্রভুত্ব করার এই যে মানসিকতা; তা আমাদের রক্তের ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে; এমন পুরুষত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার মতো শিক্ষা আমাদের সমাজে আজও অপ্রতুল! তাই শুরু করতে হলে- প্রথমত শুরু করতে হবে শিক্ষা থেকে।সুশিক্ষা অর্জনের মধ্যদিয়ে বিষবৃক্ষের শেকড় উৎপাটনের প্রস্তুতি নিতে হবে! আর এ’ দায়িত্ব নিতে হবে নারীকেই! এই কাজে নারীকে আত্মপ্রত্যয়ী হতে হবে। পুরুষতন্ত্রের শিক্ষায় এই কাজ অসম্ভব ! পুরুষতন্ত্রের বিপ্রতীপে নারীবাদ প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে; পুরুষতন্ত্রের শেকড় কাটার কৌশলের ভিত তৈরি অসম্ভব এবং অবাস্তব ! দুঃখের বিষয়, নারীবাদী আন্দোলনগুলো এইখানে এসেই দিশা হারাচ্ছে ! নারীর জীবনবোধের পরিসরে নারীবাদ প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে সভাসমিতির মঞ্চে কিংবা গবেষণা গ্রন্থের সূচীতে নারীবাদের ঘোষণা কোনোদিনও সত্য হয়ে উঠবে না! কার্যকর হবে না সমাজ জীবনের কোনো স্তরেই! নারীবাদের মূলে যে দুটি বিষয়ের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন; সে দুটি হলো; নারীর আত্মনির্ভরতার দৃঢ়তা এবং পুরুষের প্রভুত্ব অস্বীকার করার প্রতিজ্ঞা ! পুরুষতন্ত্র এই ব্যাপারে বাধা দেবেই! কারণ পুরুষতন্ত্রের চরকায়, নারীর পুংনির্ভরতা ও পুংপ্রভুত্ব স্বীকারের তৈল মর্দনের নিয়মিত যোগান বন্ধ করতে পারলেই পুরুষতন্ত্র বিকল হয়ে ভেঙ্গে পড়তে বাধ্য ! তাই বাঁধা যখন প্রবল; প্রতিরোধের যুদ্ধও তখন তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলা দরকার !

আত্মনির্ভরতার পথে প্রথমেই অর্জন করতে হবে আত্মপ্রত্যয় ! আত্মপ্রত্যয় গড়ে ওঠে আত্মসমীক্ষা এবং চলমান অভিজ্ঞতার যুগলবন্দীতে ! সেইখানেই বিশ্বাসের ভরকেন্দ্রকে ধরে রাখলে দেখা যায় ঘরে-বাইরে সর্বত্র নারীই কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকে পাশের পুরুষটির থেকে! এই কয়েক ধাপের হিসেবটি; পুরুষের স্বীকৃতির মুখাপেক্ষী না থেকে নারী যদি নিজের দৈনন্দিন জীবনচর্চায় নিজেকে যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে; তবেই প্রাথমিক কাজটি শুরু করে দেওয়া যায়- সামগ্রিক যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ হিসেবে ! পাশাপাশি মনে রাখা দরকার,এই যুদ্ধ পুরুষের বিরুদ্ধে নয়; পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে! এবং এটাও স্মরণে রাখতে হবে; ব্যক্তি পুরুষ এই পুরুষতন্ত্রেরই ফসল! তাই সেই পুরুষকেও বিচ্ছিন্ন করতে হবে পুরুষতন্ত্র থেকে!

ইদানীং নারীবাদ নিয়ে যে বিতর্ক; সেই বিতর্কে অনেক নারীই সামিল হচ্ছেন এবং নিত্য-নতুন ঘটনার জন্ম দিচ্ছেন। নারীর যে সমস্যা; তার কিছুটা নারীর, কিছুটা সামাজের। আইনের ধারা বা সামাজিক দণ্ডবিধির আওতায় এনে সুরাহা করা যেতে পারে। তাইবলে কোনো নারীর ব্যক্তিজীবন টেনে এনে নারীবাদকে হেয় করার অধিকার কোনো নারীই রাখে না। এমন হীনমন্যতা দেখায় শুধু সেসব নারী; যারা অন্য নারীর শত্রু হয়ে থাকে এবং তারাই ভেতরে-ভেতরে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা পোষণ করে। এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।নারীবাদ বিষয়কে কটাক্ষ না করে নারী যেন নিজেই নিজের দিকে ফিরে তাকায় সেই কামনা করবো সর্বত্র। লোভ, ঘৃণা, ঈর্ষা, স্বার্থপরতা ও স্পর্শকাতরতার ঊর্ধ্বে ওঠে নারী যেনো স্বকীয় ব্যক্তিত্বে প্রজ্জ্বলিত হোক এবং সেইসাথে নারীর শত্রু নারী না হয়ে বরঞ্চ একে অপরের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হোক।

ছবি: অনিরুদ্ধ দাস