আজ আমি গল্প বলবো

শামীম আজাদ

( ইংল্যান্ড থেকে): আজ আমি গল্প বলবো। ঘুমপাড়ানী গানের গল্প। খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো… (at Rich Mix at 7pm for East. few tickets left) এবং আমরা বারোজনই নানান গল্প গান ও বাজনা বাজাবো।

আমার মা শুধু গুনগুনিয়ে গান করতেন না। কি যে সব আজব কথাবার্তা ও গল্পও বলতেন! আর আমি সব বিশ্বাস করতাম।

বয়স তখন সাত আট হবে। তখন আমরা ফেনীতে। হাজারীর পুকুরে সাঁতার করি, বাসার সামনে কচি, শাজান ওদের সঙ্গে কুমীর কুমীর খেলি আর হেঁটে পেট্রল পাম্প পেরিয়ে পিটি আই স্কুলে যাই। সন্ধ্যায় হ্যারিকেনের আলোয় লাল সিমেন্টের বারান্দায় উচ্চস্বরে পড়া করি। গলার স্বর নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে আম্মা কাঠের হাতা সহ রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বকা দিয়ে যান। আব্বা চোখে সর্ষের তেল দিতে বলেন। আর নিজে গায়ে ফু দিয়ে ইজি চেয়ারে বসে চা খেতেন আর আজাদ পত্রিকা পড়তেন।

স্কুল থেকে এসে দেখতাম আব্বা সাদা সাদা চুনকাম করা ইটের তৈরি ফ্লাওয়ার বেডে- লনে ফুল গাছ লাগাচ্ছেন জিনিয়া কার্নেশন ও সূর্যমুখী। আম্মা গা ধুয়ে বেগুনী তাঁতের শাড়ির পিঠে চুল নামিয়ে পেছনে নিজেদের তৈরি কম্পোস্ট আনিয়ে হরই কে দিয়ে অন্য বেডে মেশাচ্ছেন। আমাদের এ্যালসেশিয়ান অকারনে দৌড়দৌড়ি করছে।

এমন একটা সুখের দৃশ্য দেখে আমার মন খারাপ হয়ে যেত। ওরা কিনা সারাদিন ফূর্তি করেছে আর আমি স্কুলে কষ্টকর অংক করে হেঁটে সাজান ও কচির সঙ্গে বাসায় এলাম! আমার ভাব বুঝে আম্মা তার বেগুনী নরম শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে বলতেন, তোর লাগি আমি আস্তা দিন কান্দছি বে। মাগো কান্দতে কান্দতে চৌকোর পানি দিয়া বাল্টি বরি লাইছি।

পাগল আমি সঙ্গে সঙ্গে খুশি হয়ে উঠতাম। আম্মা তাহলে গোখালি শুবুকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন না। খালি ফূর্তি করেন নাই। আমার কথা ভেবে আমাকে মিস করে কেঁদেছেন। আমি বলতাম হাসানিগো আম্মা! অয় অয়।
আম্মা তখন আমাদের গোসল খানার চৌবাচ্চা ও সাপ্লাই কলের জলে ভরা তিমি রঙা বিশাল বাল্‌তি দেখাতেন।

জানিনা তখন সত্যি তা বিশ্বাস করতাম কিনা। বয়সটা এমন অবাস্তবতা বিশ্বাস করার না। কিন্তু কোনদিন মাকে চ্যালেঞ্জ করিনি। আমি জল চেক করে যখন খুশি মনে পেছনের খাবার ঘর দিয়ে মূল ঘরে আসতাম। চলার লয়ে জামার কিশোরী কুচি তালে তালে দুলতো। মা আমার ওই তালে তালে একটি ধ্বনি তুলতেন। আজ তা সুস্পষ্ট মনে থাকলেও ননসেন্স রাইমের মত ওই আহল্লাদী শব্দগুলো বলতে সত্যি লজ্জা হচ্ছে- তাই তা আর উচ্চারণ করলাম না।
আহারে আমার মা!
মা’রা কত কি না বলে আর কত কি না করে তাদের বাচ্চাদের জন্য। ১১ নভেম্বর আমার জন্মদিন ছিলো।সেদিন সন্ধ্যায় রিচ মিক্স ভবনে আমি যখন গল্প বলেছি আর তারপর মনির সুরেলা গলার লালাবাইর সঙ্গে আমরা ১০ জনা হামিং করেছি তখন প্রতিটি দর্শকের হয়তো তাদের মায়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো।

ছবি: লেখক