এ কেমন রাজ্য বটে তোমার?

অদিতি বসু রায়, কলকাতা

এ এক আজব শহর আমাদের। এখানে অসুস্থ গর্ভবতীকে সাহায্য করতে নিজে থেকে এগিয়ে আসেন পুরুষ পুলিশকর্মী। আবার একই জায়গায় মহিলা পুলিশ নিস্পৃহ তাকিয়ে থাকেন।সাহায্য তো দূরের কথা- সামান্য ভদ্রতাও দেখান না।রাস্তার মাঝে বিবস্ত্র পাগলী নাচে মাঝরাতে। কেউ ফিরেও তাকায় না। পুলিশভ্যান একবার তাকিয়ে দ্রুত পাশ কাটায়। ট্যাক্সি ও গাড়িগুলিও তাই। একা একা গরমে মারা যায় পথিক। সাদা-নীল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। খবরের কাগজ ছাড়া পাত্তাও দেয়না কেউ।

এই শহরের ভিড় পায়ে পায়ে পৌঁছে যায় নন্দন থেকে কালিঘাট।চলচ্চিত্র উৎসবের আঙিনায় পথ হারানো ভিক্ষুক শিশুকে এ শহর এগরোল কিনে খাওয়ায় আবার সিনেমাহল থেকে মেট্রোরেলের কামরায় লাউড স্পিকারের তার স্বরে গান শুনিয়ে অন্যের বিরক্তি উদ্রেক করতেও দ্বিধা করেনা।দলবেঁধে পিটিয়ে মারে নির্দোষ বাস কনডাক্টরকে। হাসপাতালের লাইনে অপেক্ষা না করলেও ধৈর্য্য ধরে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে তারা দাঁড়িয়ে থাকে ঘন্টার পর ঘণ্টা। নামাজ পড়া হয় টিপুসুলতানের মসজিদের সামনে প্রতি শুক্রবার। সেখানে সবাই নীরবে প্রার্থনা করে ।
এখানে আমরা ‘তুমহারা নাম কেয়া হ্যায় বাসন্তী’- বলে ডাকি মেয়েদের।আর ‘ডেঙ্গু’ নামের ‘অজানা’ জ্বরে মারা যায় শত-শত নিরীহ রাজ্যবাসী।তরজার কেন্দ্রে আসে ‘মুকুল’ কিভাবে ‘পদ্ম’ হয়ে ফুটল। আবার সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে এক্সাইডের মোড়ের পাঁপড় বিক্রেতা দুঃস্থ বৃদ্ধা পান ওষুধ, সমবেদনা, সাপোর্ট। সামনে উঠে আসে দুঃখী মানুষের লড়াই।
এখানেই আমি দেখেছি, প্রোগেসিভ মেয়েদের কুলোপানা চক্কর আর বিখ্যাত কবিকে সামান্য লেখকের জন্য উদ্বিগ্ন হতে।দুশোটাকা দিয়ে এক কাপ চা খেয়ে বেরনো লোককে দরিদ্র হাতের ওপর সজোরে গাড়ির কাঁচ তুলে দিতে।

আবার এই শহরের বিশ্ব-বিদ্যালয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন হাতে প্রতিবাদ হয়। রেনবো মিছিলে পা মেলায় শহর। হারিয়ে যান ছন্দা গায়েন। লিভিং লেজেন্ডকে বাদ দিয়ে বসে ছায়াছবির উৎসবের আসর।
ওদিকে আশ্রয়দাতা বৃক্ষ সমূহকে বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে কিশলয় যুবক-যুবতীরদল। রক্ষা পায় যশোর রোড। এ কেমন শহর আমাদের যেখানে সেলফোন কানে রেললাইন পেরুতে পেরুতে লোক ট্রেনে কাটা পড়লে, রেল-অবরোধে বিপত্তিতে পড়ে হাজার রেলযাত্রী! বিনা নোটিশে বারো ঘন্টা লেটে ছাড়ে দূরপাল্লার ট্রেন।লোকে হেলমেট আর সিটবেল্ট বাঁধে কেবল ‘কেস’ খাওয়ার ভয়ে।যেখানে পাড়ায় পাড়ায় বারের ঠাকুর পর্যন্ত শীতে গায়ের চাদর পায় অথচ খালি গায়ে কাঁপে শিশু। এখানে সক্কলের মোবাইল ফোন আছে কিন্তু ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ কেনার সময় নেই কিন্তু ডাক্তার পেটানোর রাইট আছে।এখানে অসুস্থ গায়ককে চোখের জলে চিকিৎসার আর্তি জানাতে হয় আবার ছোট্ট মেয়ে পয়সা জমিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ায়।এ কেমন শহর আমাদের?

ছবি: গুগল