ফেইরী পুলস এর ঘূর্ণীমেঘ আর ভু-স্বর্গ হাইলেন্ড

শেখ রানা (বার্কিং, লন্ডন)

এবার গীতিকারের গল্পে থাকছে রুল টানা খাতা বই থেকে (গত বইমেলায় প্রকাশ হয়েছিল, অনুপ্রাণন থেকে। ভ্রমণ পিয়াসী পাঠকদের ভালো লাগবে) হাইলেন্ড ঘুরে বেড়ানোর গল্প। তিন পর্বে ছবি আর লেখা মিলে আশা করছি আপনাদের ভ্রমনটাও ভালো হবে। 

এডিনবার্গ ফিরে জীবনের দ্বিতীয় অর্ধে প্রবেশ করে নানা বৈষয়িক ব্যস্ততায় জড়িয়ে যেতে হল।

মাঝে লম্বা সময় বাংলাদেশে ছিলাম। আট মাস। নস্টালজিক ব্যান্ড নিয়ে নানা কর্মযজ্ঞ, বইমেলায় প্রকাশিত ‘কবির তখন সওদাগরি মন’, কোলকাতা ভ্রমণ- সবমিলিয়ে দম ফেলার ফুরসত পাইনি। সবকিছু ভালোয় ভালোয় শেষ করে ফিরে এসে ভেবেছিলাম ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে কাটাবো এক মাস। লেখালেখি থেকে তো বটেই যাবতীয় ব্যস্ততা থেকে স্বেচ্ছায় ছুটি। কোথায় কি! ফিরেই নতুন বাসা খোঁজা নিয়ে বিস্তর ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হল। সে এক আস্ত বিভীষিকা!

এখানে বাসা খোঁজার সহজ তরিকা হলো অনলাইনে খোঁজাখুঁজি। বিভিন্ন  লেটিং এজেন্সির ওয়েব সাইট আছে। সেখানে ঢু মেরে এলাকা আর ভাড়া অনুপাতে বাসা পছন্দ করে বাসা দেখতে যাওয়া যায় (একে বলে ভিউইং)। ভিউইং শেষে শুরু হয় যন্ত্রণা। দেখা গেলো ভিউইং করতে এসে যার বাসা পছন্দ হয়েছে সে সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন করে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে  অ্যাডভান্স বুকিং মানি দিয়ে ফেলে বাসা নিয়ে নেয়। আর এক হ্যাপা হল নানা রকমের কাগজপত্র জমা দেয়া। আগের বাড়ির মালিক এর রেফারেন্স, কাজের রেফারেন্স, কিছু  বাসা পেতে আবার স্টুডেন্ট হলে গ্রহনযোগ্য হবে না…সব মিলে রীতিমত হেস্তনেস্ত।

আমরাও সারাদিন বাসা খুঁজে ঘেমে উঠলাম এডিনবার্গের হিমশীতল আবহাওয়ায়। এখন অবশ্য আবহাওয়া কিঞ্চিত আরামদায়ক। একটা পুলওভার বা পাতলা জ্যাকেট গায়ে দিয়ে বেড়িয়ে পড়া যায়।

মাস খানেক যুদ্ধ করে গোর্গি এলাকায় এক বেড রুমের একটা বাসা পেয়ে গেলাম। বাড়ির মালিক ব্রিটিশ দম্পতি। নতুন বাসায় উঠে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। বাক্স-প্যাঁটরা  তো এই দু’মাসে কিছুই খোলা হয়নি। এবার বাসা গোছানো শুরু হল। মুহিত আর সুমন ওদের গাড়িতে পালাক্রমে আমাদের মালসামান নামিয়ে দিয়ে গেল। ওরা না থাকলে মুশকিলেই পড়তাম খানিক।

ওয়ার্ড `ল প্লেস এর বাসা থেকে দোকানপাট সব কাছে। দোকান বলতে বড় সুপার মার্কেট। বাস স্টপও পায়ের নাগালে। বেশি দূর হাঁটতে হয়না। আমরা দুজনেই খুশী।

নানাবিধ দৌড়ঝাঁপ আর বাসা গোছগাছ করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। একটা পরিপাটি শান্ত ছুটি দরকার ছিলো। সুমনের কাছে হাইল্যান্ড যাবার কথা শুনে আগ বাড়িয়ে আগ্রহ দেখালাম। এখানকার তিন বাঙালী ফ্যামিলী হাইল্যান্ড ট্রিপ এ যাচ্ছে। শেষ সময়ে এক পরিবারের অপারগতায় আমরা দলভুক্ত হয়ে গেলাম।

হাইল্যান্ড এর বিস্ময়কর সৌন্দর্য চোখে ধরার জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা হল গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়া। সুমনের বড় গাড়িতে সবশুদ্ধ পাঁচজনের অনায়াসে জায়গা হয়ে গেল। অন্য গাড়িতে যাচ্ছে আর এক বাংলাদেশি দম্পতি। মফিজ ভাই আর ফারজানা ভাবী।

সুমন আর সুমির  ছেলে সর্বকনিষ্ট সদস্য সাফির এর হাসি হাসি মুখ। মোটে দুই বছর বয়স। বাংলা গানের বিশাল ভক্ত। আরো ভালো করে বললে শ্রীকান্তের। শ্রীকান্তের গাওয়া হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর গান ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’- এর অন্তরা শুরু হলেই সাফির তাল লয় ঠিক রেখে হামিং করা শুরু করে। কথা বলতে পারে না কিন্তু গানে গলা মেলায়। যতবার সাফির হামিং করে ততবার আমরা আনন্দ পাই আর হাসি। সাফির  আমাদের হাসি দেখে দ্বিগুন উৎসাহে গান গাওয়ার চেষ্টা করে।

এডিনবার্গ থেকে বেশ দূর পথ। শীতকালে যাওয়া কঠিন। বরফ পড়ে সব সাদায় ঢেকে যায় । পথ-ঘাটও খুব অনুকূল নয়। চৌকষ চালক না হলে হাইল্যান্ডে গাড়ি নিয়ে যাওয়ার আশা ত্যাগ করাই ভালো।

মিশু রাত জেগে খসরা জার্নি প্ল্যান করে ফেলে। আবহাওয়া পূর্বাভাস দেখাচ্ছে বৃষ্টি হবে। আমরা অবশ্য পূর্বাভাসকে পাত্তা না দিয়ে এক রোদ সকালে বেড়িয়ে পড়ি হাইল্যান্ড অভিযাত্রায়। কে সারা সারা।

ব্রুমহাউজ থেকে যাত্রা শুরু হয়ে গাড়ি নিমিষেই এম-৮ হাইওয়েতে চলে আসে। পোর্ট্রি হয়ে কটেজে উঠে যাবো এ রকম প্ল্যান।

‘পৌঁছাতে প্রায় বিকেল হয়ে যাবে। পথে যেখানেই ভালো লাগবে, গাড়ি থামিয়ে নেমে দেখে নেবো এক ঝলক, কি বলেন রানা ভাই।‘

সুমনের কথায় ধরেই নেই পৌঁছাতে রাত হবে। আমার কোনো তাড়া নেই। আমি সামনের সিটে সিট বেল্ট বেঁধে গান ছেড়ে দেই। পেছনের সিটে সাফির বাজনা শুনেই মুখ হাসি হাসি করে ফেলে।

গাড়ি নির্ধারিত গতিতে এগিয়ে চলে। এখানে গাড়ি নিয়ে খুব বেশি কেদরানী করার কিছু নেই। জায়গায় জায়গায় স্পিডক্যামেরা বসানো আছে। যেখানে ৪০ লেখা আছে,  সেখানে ৪০ বা তার কম গতিতে গাড়ি চালাতে হবে। গতি বেশি হলেই ফাইন সমেত টিকেট বাসায় এসে হাজির। গাড়ি চালকরা সঙ্গত কারণেই নিয়ম মেনে চলে।

আমরা প্রথম যাত্রাবিরতি করি কে এফ সি রেস্টুরেন্ট-এ। কফি খাবো। আমি কফি খাই খুব। নেমেই কাপুচিনো অর্ডার দেই। ছবি তোলা হয় এক প্রস্ত। এই দুইদিনের পরিকল্পনা নিয়ে সবাই আগ্রহ নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠে। আমি মানুষের ভিড়েও একলা হয়ে যেতে পারি। সেই একাকী অনুভূতি ফিরে আসতেই আরামবোধ হয়। সাফির এর দিকে তাকিয়ে দেখি সাফির গান আর খাওয়া পর্ব শেষে ঝিমাচ্ছে। ওর ঘুমের সময়।  কফি শেষ করে আমরা পোর্ট্রির দিকে উড়াল দেই।

পার্থ পেরিয়ে আরো অনেক অনেক পথ পেরিয়ে যেতে থাকি। যত দূরে যাই, ততই নীলিমায় হারাই। নীলিমার নীল, আকাশের পেজা তুলোর মত সাদা মেঘ, আর ক্রমশ দৃষ্টিগোচর হওয়া পাহাড়- ধীরে ধীরেই চারপাশকে বিমূর্ত করে তোলে। আমার মনে হয় আমরা এক সুন্দরম তেপান্তরে চলে যাচ্ছি ক্রমশ। পাহাড়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে, পাল্লা দিয়ে লোকালয়ের সংখ্যা কমে একসময় প্রায় শূন্যতে এসে ঠেকে।

পোর্ট্রি আসতেই বিস্ময়াভূত হই। সবুজ ভেলভেটে মোড়ানো সারি সারি পাহাড় আর পাহাড়ের ভিতর থেকে উৎসারিত ঝর্ণা। একটু পর পর ছোট ছোট লেক। এখানে বলে লক। কত লক যে আছে পুরো হাইল্যান্ড জুড়ে। চোখ জুড়িয়ে যায়। যেন পরম করুনাময় পরম যতনে পাহাড়, লেক, মেঘ, ঝর্ণা- একের পর এক সাজিয়েছেন এই প্রান্তরজুড়ে। গাড়ির গ্লাসের এপাশ থেকে মনে হয় আমরা সবাক আর দুই পাশে নির্বাক ছবি। ভিউকার্ড। ছোটবেলায় যেমন দেখতাম আর অবাক হতাম। এখন মনে হচ্ছে ছোটবেলার সেই ভিউকার্ডের ভিতর এসে পড়েছি।

সারাজীবন ভূ স্বর্গ কাশ্মীর শুনেছি। আমার কাছে এই মুহূর্তে পোর্ট্রি ধরে এগিয়ে চলা রাস্তাটাকেই এক টুকরো ভূ স্বর্গ মনে হয়। ভূ স্বর্গ হাইল্যান্ড।

এইসব অসামান্য দৃশ্য দেখতে দেখতে বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। এবং বইছে বাতাস মন্দা। স্কটিশ ওয়েদার তার যথার্থতা প্রমান করে। আমরা প্রবল বৃষ্টি আর উত্তাল বাতাসে ডোনান ক্যাসেলের পাদদেশে নামি। এই জায়গাটার নাম ডবনি। ডোনান ক্যাসল এর সামনে একটা ভগ্নদশা কামান রাখা।দর্শনার্থীদের দিকে করুন চোখে চেয়ে আছে। সেই কামান পেরিয়ে ক্যাসেল এর পিছনে যেতেই অপরুপ দৃশ্য। আটলান্টিক মহাসাগরের ঢেউ গম্ভীর মুখে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পড়ন্ত বিকেলে আদিম দূর্গের কাছে দাঁড়িয়ে আটলান্টিকের ঢেউ আমাকে বিষাদী করে। সামলে উঠে গাড়ির কাছে চলে আসি। বৃষ্টি বিষাদ ধুয়ে দেয়, জমতে দেয় না চোখে, মুখে। অন্তরে।

ধীরে ধীরে গাড়ি সমতল ছেড়ে পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি উঁচুতে উঠতে শুরু করে। অস্তমিত সূর্যের সঙ্গে ডোনান ক্যাসল দূরে সরে যায়। পাহাড়ের একদম ওপরে উঠে ঢাল বেয়ে নামার আগ দিয়ে সুমন গাড়ি থামায়। তাকিয়ে দেখি পাঁচ পাহাড়ের চুড়া। একান্নবর্তী পরিবারের মত একদম গায়ে গায়ে লেগে আছে। ভাসমান মেঘে দৃশ্যমান বলে পাঁচপাহাড়ের চুড়া আরও রহস্যময় লাগে। আর একটু এগিয়ে গিয়ে একটা বাঁধাই করা ফলক খুঁজে পাই। ফাইভ সিস্টারস। আচ্ছা, এই পাহাড়গুলোকেই তাহলে ফাইভ সিস্টারস বলে। কিন্তু সিস্টারস কেন? ব্রাদার নয় কেন?

‘কারণ, নেচার মাদারলি। আমরা বলি না মাদার নেচার।’

মুগ্ধ চোখে ফাইভ সিস্টারস দেখতে দেখতে মিশু জানায়। পরে জানতে পারি হলিউডের ছবি লিপ ইয়ার এর একটা দৃশ্য এখানেই শ্যুট করা হয়েছিলো।

নিচে নামতে শুরু করি। টমটম জানায় আমাদের কটেজ আর মিনিট দশেক দূরত্বে। এই টমটম (এক ধরণের নেভিগেশন যন্ত্র, স্যাটেলাইট এর সঙ্গে যোগাযোগ থাকে। পোস্ট কোড বলে দিলে রাস্তা চিনিয়ে একদম সদর দরজায় পৌঁছে দেয়) থাকলে হারানোর ভয় নেই। কোনো না কোনোভাবে আপনাকে ঠিকঠাক গন্তব্যে নিয়ে যাবে।

অন্ধকার নেমে আসে। আমরা গ্লেনেলগ কটেজে ঢুকি। বেশ বড় জায়গা জুড়ে পাঁচ-ছয়টা কাঠের কটেজ। তিন বেড রুমের।  কোনোখানে জনমানব নাই। চারপাশে পাহাড় আর পাহাড়। হাইল্যান্ড এর কোথাও না গিয়ে এই গ্লেনেলগ কটেজে বসে থেকেই সারাদিন পার করে দেয়া যায়।

পরদিন বিস্তর ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা। সকাল সকাল উঠে যেতে হবে। আমার সচরাচর দেরিতে ঘুম ভাঙ্গে। মিশুর সেই নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। কটেজে ঢুকে রাতের খাবার সেরে আর আড্ডা হয়না বিশেষ। যার যার রুমে  ঘুমে চলে যায় সবাই।

ছবি: লেখক