শিক্ষার নামে শিশুনির্যাতন বন্ধ হোক

গিয়াস আহমেদ

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আজ থেকে শুরু ২০১৭ সালের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষা। এই পিইসি পরীক্ষা এবার হচ্ছে ৯মবার। আমার মেয়ে বর্ণমালাও পরীক্ষা দিচ্ছে। তার ছোট্ট জীবনে প্রথম বড় কোনো পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছে সে।
একজন পিতা হিসেবে আমি দেখেছি, এই একটি বছরের পুরোটাই, প্রতিদিন ভোরে উঠে সে স্কুলে যায়। সেখানেই দুপুরের খাবার কিছুটা মুখে দিয়ে ছোটে টিচারের কাছে। ইংলিশ টিচার, তারপর ম্যাথ। সন্ধ্যায় হেমন্তের ঝরা পাতার মতো ক্লান্ত, বিবর্ণ সে ঘরে ফেরে।
সন্ধ্যার পর আবার মাথাগুঁজে পড়তে বসা। ক্লাসের পড়া, হোমওয়ার্ক, প্রাইভেট টিউটরের পড়া…। অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে আমার রাত হয়ে যায়। ঘরে ফিরে প্রায়ই দেখি, বর্ণ ঘাড়গুঁজে পড়ে আছে বইয়ের পাতায় বা লেখার খাতায়।
সপ্তাহখানেক আগে সে বলল, ‘বাজান, আমি আর পারছি না! আমার এত্তটুকু ব্রেন, এত্ত পড়া নিতে পারে বলো!’
আমার কাছে কোনো জবাব নেই। জানি, প্রতিটি পরীক্ষার্থীর মা-বাবাই সন্তানের এ প্রশ্নে উত্তরহীন। কিন্তু সকলের উদ্দেশে আমার জোরাল প্রশ্ন, ফাইভ পাস করার এই পরীক্ষাটির আসলে কী প্রয়োজন? এই সার্টিফিকেট ছাত্র-ছাত্রীদের কী কাজে লাগবে? কেন এই ছোট্ট শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এ ধারার নির্যাতন!
গত জেএসসি পরীক্ষার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আগামীতে পিইসি পরীক্ষা থাকবে না। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরাও বলেছিলেন, এ পরীক্ষার আদৌ দরকার নেই। এর পক্ষে তাঁদের যুক্তিপূর্ণ লেখাও আমরা পড়েছি গণমাধ্যমে।
তারপর আবার যা তাই। বহাল রইল শিশুদের ওপর নির্যাতনমূলক এই অর্থহীন পরীক্ষা। এই পরীক্ষা কোমলমতি শিশুদের ওপর ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক চাপ। তাদের শৈশবের আনন্দকে ধ্বংস করে দেয়।
অর্থনৈতিকভাবেও এটি বিরাট অপচয়। অভিভাবকদের ওপর বড় ধরনের বোঝা। আমরা কাগজে-কলমে, বক্তৃতাবাজি যাই বলি না কেন, প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং কিন্তু বন্ধ নেই। হিসাব করুন, একটি পিইসি পরীক্ষার্থী যদি একজন করেও শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ে বা কোচিং সেন্টারে যায়, তাহলে অভিভাবকদের পকেট থেকে কত হাজার কোটি টাকা খরচ হয় প্রতি বছর? সব পিতা-মাতার আর্থিক সামর্থও তো এক নয়। শিশুদের জন্য অতিরিক্ত যে সময় ব্যয় হয় পুরো একটা বছর, তার মূল্যমান আছে, সে অঙ্কও বিরাট।
মনে পড়ছে বিশ্বকবির কবিতা ‘অভিলাষ’-
“ওই দেখো পুস্তকের প্রাচীর মাঝারে
দিন রাত্রি আর স্বাস্থ্য করিতেছে ব্যয়
পহুছিতে তোমার ও দ্বারের সম্মুখে
লেখনিরে করিয়াছে সোপান সমান।”

এই পিইসি পরীক্ষার সিঁড়ি দিয়ে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আমাদের শিশুদের কোন তাল গাছে তুলবেন? কী তাঁর অভিলাষ?

কালকের ‘কালের কণ্ঠ’-এর লিড নিউজ ছিল “মাধ্যমিকে ৪০% শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে”। এখনো! খুবই দুঃখজনক। তবু এ হলো বাস্তবতা। আচ্ছা, যারা মাধ্যমিকে ঝরে যায়, তাদেরই বা এই পিইসি সার্টিফিকেট কী কাজে লাগবে! আগে ছোটখাটো চাকরিতে এইট পাস সার্টিফিকেটের একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল। সে কালও কী আর আছে! আর তো ক্লাস ফাইভের সার্টিফিকেট!

একজন পিতা হিসেবে আমার দাবি, শিক্ষার নামে এই শিশুনির্যাতন বন্ধ হোক। এভাবে সাধারণ আয়ের মানুষের অর্থ, সময় এবং শিশুর শৈশব ধ্বংস করা- রীতিমতো পাপ!
আমাদের মাথামোটা শিক্ষামোড়লরা, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন, দয়া করে থামুন।

ছবি: গুগল