বই না পড়লে কেউ মারা যায় না, শুধু অন্ধ হয়ে যায়

শুদ্ধসত্ত্ব সহজিয়া ঘোষ

(কলকাতা থেকে): সারাদিন যেখানে গিয়েছি বই নিয়েই কথা বলেছি। বাংলা বই, সমকালীন সাহিত্য, সহলেখক এবং প্রকাশকদের কথা বলে গেছি অনন্ত। তার মাঝে মাঝে নিজের কথাও। সোনাঝুরির হাটে দেখা হয়েছিল বাপ্পার সঙ্গে। বাপ্পা বাউল গান করে, চায়ের দোকানও চালায়। বাপ্পা জানে ও বাউল নয়, খাঁটি বাউল হওয়া মুখের কথা নয়। তাই ভেক ধরেনি। কথায় কথায় ঘুরে ফিরে দয়ালদা, বাসুদা, লক্ষ্মণ, আনন্দ, গৌর ক্ষ্যাপা! সোনাঝুরির মাটিতে ঢেউ উঠছিল। কখনো আশির দশক, কখনো নব্বই একেকবার টুকি দিয়ে যাচ্ছিলো। তার মধ্যেও হাটের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললাম। একদিন ইচ্ছে হলে হাটে এসে বই নিয়ে বসবো। বাপ্পার পাশেই বসবো না হয়। কাপড়, গয়নার এক্সক্লুসিভ সংগ্রহ করতে যাঁরা সোনাঝুরির হাটে গিয়ে থাকেন তাঁদের সঙ্গে মৃদু বই বিনিময় করে আসবো। বাংলা সাহিত্যও বেঁচে এবং সংগ্রহের মতই- এটুকু জানাতে। সে বই বিক্রির জন্য প্রকাশকেরা আমাকে খুদকুঁড়ো দেবেন কী না ভাবিনি, ভাবছিলাম বই আন্দোলনের কথা। পাঠক যদি বই-এর কাছে না আসেন, তবে বইকে পৌঁছতেই হবে পাঠকের কাছে। সে পথে না হয় রইলোই আমার কিছু স্বেচ্ছাশ্রম।

আমাকে ঘিরে আছে তখন রাত। হোটেলের আশেপাশের ঘরে একঝাঁক ছেলেমেয়ে উঠেছে। সম্ভবত কোন কলেজের। তাদের হৈ-হুল্লোড়, নেশা, গান-বাজনা আমার ঘুমের দিকে হাত বাড়িয়েই রেখেছিল। হাতে তুলে নিলাম বই। তারপর এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটলো! বইটা খুলতেই একটা দরজা প্রথমে। কাঠের সবুজ রং করা দরজা। ছিটকিনি লাগান। দরজা খুলে গেল। এক বিস্তীর্ণ আঙিনা। কোথাও সিমেন্ট আছে, কোথাও নিখাদ মাটি। কোথাও বোগেনভোলিয়া তো কোথাও নাম না জানা অযত্ন্রের গাছটি। তার একপাশে ভাঙাচোরা ঘর। সে ঘর হয়ে উঠবের আশায় আশায় কুকুর-বিড়াল-মাকড়সার জন্ম দিতে থাকে অবিরল। শীতের খোলস ছাড়ে সাপও। মানুষ অবিরত যে সব অন্য ঘরে ঘোরে, সে সব ঘরে কালীর ক্যালেন্ডার থেকে উজ্জ্বল জীবনের আশ্বাস ছড়িয়ে যায় লক্ষ্মীর থানে। ক্ষয়ে যেতে থাকা হাড়ে-মজ্জাতেও কোন এক চাঁদ রাতে সাদা প্যাঁচার স্বপ্ন উঁই-এর মত কুড়তে থাকে। ঢিলে হতে থাকা প্যান্ট দু-হাতে এঁটে নিয়ে দৌড়তে থাকে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা। ইস্কুলে যায়, ধেয়ে চলে খেলার মাঠে।

ফিরে আসে লন্ঠনের সন্ধ্যেতে। দুলে দুলে নিজেদের ছায়া বড় হতে দেখে। ফুটন্ত কড়াইতে ছ্যাঁক বেজে ওঠে। সংসারে বিত্তবাসনাতে অতৃপ্ত অসুখী বড়দের নখ-দাঁত ফুটে ওঠে পর্দার বালাই না রেখে। কেউ একজন চেয়েছিল একবার ইডেনে দেখতে যাবে টেস্ট ক্রিকেট। সেই সোবার্স, গিলক্রিস্টের আমলের পর আর সামর্থ্যে কুলোয়নি। এখন মাসের শেষে ভোঁতা ব্লেডে দাড়ি কামানোর পর নিমু হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে অফিসের দিন। ছেলেমেয়ের ইস্কুল আর মাস্টারের মাইনে। মাংস পাঁঠার হলে ভাল, মুরগিতে কম খরচের। মাছ সপ্তাহে দু’দিনের বেশী না। সুতো দিয়ে বাকীদিন ডিম কেটে কেটে সন্তানদের। শাক-সব্জীতেও প্রোটিন থাকে। নিজেরা একটু বেশী খেলে আমিষের অভাব পূরণ। অন্যজন জবাকুসুমের আলতা পায়ে দিয়ে একদা দুপুরের এলানো রোদের সুখ চেয়েছিলো। স্নানান্তে সিঁদুরের টিপ এঁকে মোক্ষদাকে কর্তার খাবার জায়গা করতে বলবে ভেবেছিলো। তারপর ছাদে বসে বড়ি দেওয়া, গঙ্গাজল সই-এর সঙ্গে সংসারের আঁশকাঁটার কিছু জলিফলি করে দিন যাবে। সন্ধেতে একবার যদি টুসুকে নিয়ে যাওয়া চলে, পাশের বাড়ির অন্নপূর্ণাও যাবে, উত্তমের সিনেমা এসেছে বসুধা-তে।

হল না। হল না সে সব ঘিয়ের গন্ধ। বদলে আত্মীয়ের বিষ, লাউ চুরি করা প্রতিবেশী। অথচ প্রতিমার বিয়ে হলো কত্ত বড় ঘরে। সুছন্দাও চলে গেল বিদেশ। তার মতো ঢলো কালো চুল ছিল প্রতিমার? সুছন্দার তো মুখ না, পানিফল। তাকে ঠাকুমা বলতেন ‘সুন্দরী কমলা’। এই কী জীবন মধু! হেমন্তের মাঠে মাঠে ছন্ন খড়ের মত! চালের কাঁকড়ে দাঁত ঠিকরে ওঠে আর গাড়ি কেনে টাপু বোস! মাধ্যমিকটাও পাশ করেনি গুয়ো।

বিষণ্ণতা হাঁটতে হাঁটতে এরপর ট্রেন ধরে। কলকাতা যায়। নিউমার্কেটের সরু গলিপথের আচমকা সিঁড়ি বেয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়। কাঠের একদা পালিশ করা মেঝেতে আস্ত একটা টেনিস খেলার মাঠ যেন। ওই ঘরে সাহেব-মেমের বল নাচ এখনো বেলজিয়াম গ্লাসের আয়নায় প্রতিধ্বনিত হয়। সেইখানে থাকে টুটুলের মাসি-মেসো। একই পরিবার, একই রক্ত, একই বাঙালির এ ভিন্ন দশাতে লালা ঝরে হাঁফানো কুকুর জীবনে। পায়ে পায়ে নেমে আসা। হাওড়া শিবপুরের জিরেনবাটিতে কুষ্ঠে ক্ষইছে বড়দা। দেখা করার ছুতোয় ক’টাকা হাতে দিয়ে ফিরতির ট্রেন। অন্ধকার ধানক্ষেতগুলোর উপর চৌকোণো ছায়া ফেলে ছুটতে ছুটতে কামরাগুলো বলে ঝিক-ঝিক-ধিক-ধিক।

ওরা আশীর দশকের শেষে ট্রেনে উঠেছিল। কর্তাটি কলকাতার কাছাকাছি ট্রান্সফার পাবে পাবে ভাবছে। মাইনে বাড়বে। হালকা এক নীলকন্ঠী সুখ। গিন্নির আশা বড়টা পড়াশোনাতে যা, ভাল মাইনের একটা চাকরী নিশ্চই পাবে। পেলে ওকে একটা টেরিলিনের বেলবটম করে দেবে। সিনেমায় কতজন পড়ে নায়ক হয়। বড়টা ভাবছে সামনের পরীক্ষাতেও অধীর ফার্স্ট হলে তার সব খাটনিই বৃথা। সেকেন্ড তো যে কেউ হতে পারে। নিরঞ্জন স্যারের কোচিনে না গেলে সংস্কৃতে নাম্বার কিছুতেই আশির উপর দেবেন না। ছোটটি তাল কষছে কাল সক্কালে পেয়ারা কাঠের ব্যাট নিয়ে ডাকতে যাবে পিন্টুকে। মাহাতোদের মাঠে যারা খেলে তাদেরকে নিলেও হয়। ওরা বল করতে জানে না। সে না হয় শিখিয়ে নেওয়া যাবে। হাবুলের তো এখন জ্বর। ধুঁকছে। বাবা গম্ভীর হয়ে বলছিল মাকে ‘ক্ষয়রোগ’। সে জিনিস কি তার জানা নেই। শুধু হাবুলের কাছে যেতে নেই সবাই বলেছে।

কামরার এক কোণে আমি বসে থাকি দুহাজার সালের সভ্যতার ঘোষিত কমন এরা-তে। এই দুহাজারে মানুষ জেনেছে সর্বত্র মানুষ থাকে। জেনেছে সুখ-দুঃখ তাদের সবার আছে। রক্ত লালই সকলের। তবু কারটা কেড়ে কে কার আগে পৌঁছবে স্বর্গে তার প্রতিদ্বন্ধীতা সবচেয়ে বেড়ে গেছে। পুরুলিয়া যাই আমি বইমেলা-র কথায়। বই না পড়লে কেউ মরে যায় না। না খেতে পেলে মরে। অভুক্তকে বই পড়ার কথা বলার স্পর্ধা আমার স্বপ্নেও নেই। অর্ধভুক্ত অথবা ঠোঁটের কষে আরাম কিঞ্চিত লাগা মানুষকে বলতে চাই বই-এর কথা। বই না পড়লে আপনি সেবার যে ছোট্‌কাকে শেষবারের মত আসতে দেখেছিলেন, ঘুড়ি ওড়ানোর কৌশল যিনি জানাবেন বলে আর আসেননি, তাঁকে আর পাবেন কোথায়! বই খুললে দরজা খুলে যাবে। তার ভেতর দিয়ে মহালের পর মহাল খুলে যায় না শুধু। তার ভেতরে গেলে দেখবেন পায়ে লাগছে নরম মুথা ঘাস। মাথার উপর বিস্তীর্ণ ঘন নীল আকাশ। ওখানে আরেকটা পৃথিবী আছে। যেমন যেমন চেয়েছিলেন এই পৃথিবীতে এসে, তেমনই বেদনার, সৌহার্দ্যের, সুখের, সন্তাপের হাজারো পৃথিবী। শুধু আপনি হাতের মুঠোতে বই নেবেন, শৈশবের গোপন পালকের মত, বন্ধ করে ফুঁ দেবেন এবং যেমন চাইবেন পৃথিবী খুলে যাবে। বই না পড়লে কেউ মারা যায় না, শুধু অন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় স্বপ্ন দেখা। বিশ্বজিৎ রায়ের ‘ঘটিপুরুষ’ খুলেছিলাম বলে আমি পেয়েছিলাম ওই পৃথিবীটাকে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে