অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞান

আন্জুমান রোজী,(কানাডা থেকে)

প্রতিদিন চলতে-ফিরতে আমাদের জীবন ঝুলিতে সঞ্চিত হচ্ছে নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা। জীবন নাকি অভিজ্ঞতার অভিজ্ঞান। কোনোকিছু ঘটলে সোজা একটি কথাই সবাই বলে, “কোনো সমস্যা নেই , এটাও একধরণের অভিজ্ঞতা। জেনে রাখা ভালো– এভাবে জীবনের পরতে-পরতে অভিজ্ঞতা জমতে-জমতে পাহাড় সমান ভারে আমরা উবু হয়ে যাই। কিন্তু কোনো অভিজ্ঞতাই কার্যত কাজে আসে না। সময়ের গতির সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু চলমান থাকে। এই চলমান গতিতে সবই যেন অতীতের গহ্বরে চলে যায়! নতুন করে কি আর সেই পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে; নাকি নতুন ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা কোনো পুরনো অভিজ্ঞতা সেখানে ফলাতে পারি? 

বস্তুত, আমরা তা পারি না। প্রতিদিনের সকাল যেমন নতুন দিনের সূচনা করে; ঠিক তেমনি.. একটি নতুন দিন.. নতুন-নতুন ঘটনার যোগান দেয়। নতুন-নতুন ঘটনায় চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে জীবন তার বিচিত্রতা নিয়ে চলতে থাকে ঠিকই; তবে বিগত কোনো অভিজ্ঞতাই জীবন চলার পথে তেমনভাবে আর কাজে আসে না। নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় জীবনের ঝুলি শুধু ভারী হতে থাকে।

মানুষ প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্ত শেখে। শেখার কোনো বয়স নেই; নেই সময়ের নির্দিষ্টতাও। পাশাপাশি জানারও নেই কোনো শেষ! আমরা প্রতিদিন জানছি, আমরা প্রতিদিন শিখছি। আমরা প্রতিদিন জীবনকে ভিন্ন-ভিন্ন এঙ্গেল থেকে দেখছি, নতুনভাবে! এই যে দেখা ও উপলব্ধি; এই ধারণা যেখানে বদ্ধমূল হয়ে আছে; সেখানে কোনো ঘটনার অভিজ্ঞতা কি আমরা কোনো কাজে লাগাতে পারি!?

অন্তত আমি কখনও সেভাবে কোনো অভিজ্ঞতাকে নতুন ঘটনার জন্য অ্যাপ্লাই করতে পারিনি! বিষয়টি প্রায়ই আমাকে বেশ ভাবায়। নতুন নতুন ঘটনায় নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার হয়। আমার চলার পথের.. প্রতিটি মুহূর্তেই নতুন-নতুন পথ তৈরি করে এগিয়ে যেতে হয়। জীবনের বাঁক যে কতভাবে ঘুরে গেলো আমার এই একজীবনে; তার ইয়ত্তা নেই। সেখানে শুধু অভিজ্ঞতার রেখাপাত; তার কোন আলোকপাত নেই।

প্রতিটি মানুষ আলাদা। কেউ কারোর মতো নয়। এমনকি চিন্তা-চেতনায়, স্বভাবে একজন থেকে আরেকজন একেবারেই ভিন্ন। সেই অর্থে প্রতিটি মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন। আমরা যদি মানুষের বাক-স্বাধীনতায়, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস করি; তাহলে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যও বিশ্বাস করবো। সেক্ষেত্রে ভিন্ন-ভিন্ন মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমার জীবনের কোনো সমাধান দিতে পারছি না। তাছাড়া, প্রতিদিন নতুন নতুন দিন আসে। প্রতিটি নতুন দিনে নতুন নতুন ঘটনার সূচনা হয়। কোনো ঘটনার সঙ্গে কোনো ঘটনার আসলে তেমন কোনো মিল থাকে না। তাছাড়া মানুষ অতি বিচিত্র এক প্রাণী। এই বৈচিত্র্যতার কারণে ঘটনাগুলোও থাকে বৈচিত্র্যপূর্ণ। এই বৈচিত্র্যপূর্ণতার জন্যেই হয়তো জীবন এতো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আর তখনি আমরা জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করি। তাইবলে অভিজ্ঞতার আলোকে জীবন কখনওই ছন্দময় হয়ে ওঠে না!

এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের মধ্যে বরাবরই একটা টানাপোড়েন থাকে। কী চিন্তায়; কী চেতনায়; কী ভাব প্রকাশে; কিংবা কথায়! এই যে নতুন পুরনোর মধ্যে শূন্যতা বা কমিউনিকেশন গ্যাপ; এই গ্যাপের কারণেও নতুন নতুন ঘটনার সূত্রপাত হয়। নতুন একরকম পুরাতনকে ছুড়েই ফেলে দেয়। পুরনো কোনো অভিজ্ঞতার কথা বললে– বলে, ওসব ব্যাকডেটেড। আমার ছেলেমেয়ে আমাকে বলে, ” আম্মু, তোমাদের সময় আর আমাদের সময় টোটালি ডিফরেন্ট।” তাদের ডিজিটাল চিন্তা, ডিজিটাল আচরণ, আঙ্গুলের ডগায় ফোনের স্ক্রিনের নেচে ওঠা; সবই আমাকে বিচলিত করে, করে স্তম্ভিত। এতো দ্রুত তাদের গতিবিধি; আমি সেখানে খেই-হারিয়ে ফেলি। তাহলে আমার অভিজ্ঞতা এখানে কী কাজে আসলো! ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া অনেক সময় আসলে কিছুই করার থাকে না।

যদি কেউ জীবনকে নিত্যনতুনভাবে দেখতে চায়; তাহলে এখানে অভিজ্ঞতা কী কাজ করছে? অভিজ্ঞতা থাকলে যেকোনো ঘটনা ঘটার আগে তার পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ব্যস, এইটুকুই অভিজ্ঞতার কাজ। তবে অভিজ্ঞতার ছিটেফোঁটা সেই ঘটনায় অ্যাপ্লাই করা সম্ভব নয়। অনেকেই বলে, কোনো অভিজ্ঞতাই ফেলার নয়। অথচ নতুন প্রজন্ম নতুন-নতুন ঘটনা ঘটিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার অবতারণা করে। যেখানে মানুষের ধর্মই হলো, নিজের মতো করে সবকিছু বুঝে নেওয়া। সেখানে, সেই মানুষ অন্যের কথা শুনবে কেন! আর শুনলেও; সেটা কি শ্রবণকারী অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিচ্ছে!? মেনে নিচ্ছে না। তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়ালো! আসলে কোনো অভিজ্ঞতাই জীবনে কাজে আসে না। শুধু সাবধানতা অবলম্বন করে অপেক্ষা করতে হয় কী ঘটনা ঘটে, তারজন্য। কারণ আমরা জানি না আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। তারপর সেই মোতাবেক নিজেকে তৈরি করে নতুন পন্থায় সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করে নিতে হয়। এই তো জীবন! জীবনের অপরনাম যদি হয় শুধু অভিজ্ঞতার সঞ্চয়; তবে সেই সঞ্চয় শুধু গল্প, উপন্যাসে শোভা পায়, বাস্তবে নয়। শিল্প, সাহিত্যের ভিত গড়ে উঠতে পারে অভিজ্ঞতার আলোকে। এছাড়া অভিজ্ঞতার বিশেষ কোনো সামর্থ্য নেই!

উত্তরাধুনিক যুগে সবকিছু ভেঙ্গে যাচ্ছে। অণু থেকে পরমাণু পর্যন্ত। ভাঙ্গতে-ভাঙ্গতে কোথায় যে পৃথিবী গিয়ে ঠেকবে; আমরা কেউ জানি না। একরাশ শূন্যতার হাহাকার চারদিকে। বোবাদৃষ্টিতে অভিজ্ঞতার আলোকে অনেককিছুই দেখি; তবে প্রতিদিন নিত্যনতুন ঘটনার কাছে নত হয়েই থাকতে হয়। অভিজ্ঞতা মানুষকে ঋদ্ধ করে বটে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত নতুন নতুন অভিজ্ঞতার কারণে জীবনের প্রতি একধরণের বিতৃষ্ণাই জন্ম নেয়। অতএব, অভিজ্ঞতার কথা না ভেবে, জীবনে যখন যেভাবে যাকিছু আসে– তাকে ঠিক সেভাবেই বরণ করে নিয়েই এগিয়ে যাওয়া উচিত। আর অভিজ্ঞতা? তাকে ওই কাগজের পাতায় কথার কথা হিসেবে তুলে রাখা হোক!

ছবি: গুগল