প্রেম যদি অন্ধ হয় তবে যুদ্ধ কি

লুৎফুল হোসেন

সেই যে বলেছিলাম নদী ও প্রেম খুউব বেশী সমিল। তার সূত্র ধরেই সম্ভবত নদী ও জলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাল তোলে নদীমাতৃক এ’দেশের মানুষের প্রেম। এজন্যেই কথায় বলে বাঙালী মাত্রেই কবি। সব শিক্ষিত বাঙালীর জীবনে দু লাইন হলেও লিখেছে কবিতা। আর অশিক্ষিত হলে মনে মনে বুনেছে।

আমার এই কথার পিঠে আর এক শ্বাশ্বত সত্যের কথা বলি। হাজার বছরের পুরোনো প্রবাদ – প্রেমে এবং যুদ্ধে কোনো নীতি নেই। আমি এর সঙ্গে আর এক লাইন কথা বাড়তি বলি- রাজনীতিতে তাহলে তার অন্তত এক সহস্র বছর আগে থেকে কোনো নীতি নাই।

আমরা সবাই জানি এবং মানি প্রেম অন্ধ। প্রেম যদি অন্ধ হয় তবে যুদ্ধ কি ! প্রেম হলো নিজে অন্ধ। যুদ্ধ অন্যের চোখ উপড়ে নিয়ে অন্ধ করবার কর্ম। তাহলে রাজনীতি? সেটা হলো নিজের চোখ ও দৃষ্টিশক্তি দুইই থাকবে কিন্তু দেখতে হলে দেখবে সে অন্যের চোখে। অন্যে (নেতা ও রাষ্ট্রযন্ত্র) যা দেখাবে, যেভাবে দেখাবে ঠিক তা, ঠিক সেভাবে।

এই যেমন ধরুন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মতোন মহাজাগতিক মহাক্ষণেও কিছু কথা ও কাহিনী কিছুতেই আমার বোধগম্যতায় আসেনি। এই এত্তো কয় দশক সময় পরেও! এ কি সেই অন্য চোখে দেখার মতোন কোনো জটিল দৃষ্টিক্লিষ্টতা নাকি তার চেয়ে বেশী কিছু! অন্য কিছু !

সেই সময় ত্রিপুরার গোটা সীমান্ত জুড়ে পাহাড়ে পাহাড়ে সীমানা ডিঙ্গিয়ে ঢুকে পড়তো সংখ্যাতীত স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালী। তাদের প্রায় সবারই প্রাথমিক গন্তব্য থাকতো মেলাঘর যা ক্রমান্বয়ে হরিণা পর্যন্ত ছড়িয়ে গিয়েছিলো।

সেই সময় বামপন্থী দলের নেতৃস্থানীয়রা বেশ অনেক ক’জন একসঙ্গে পাড়ি দিচ্ছিলেন সীমান্ত। আগরতলা থেকে বাংলাদেশেরই কে বা কারা ইন্ডিয়ান আর্মিকে খবর দিলো ওই যারা আসছে ওরা সব ছদ্মবেশী রাজাকার। ওদেরকে মেরে ফেলা দরকার ভারতে ঢোকার আগেই। সেভাবেই ঘটে যেতো সব।

আগরতলার বাম পন্থী কিছু নেতা জানতেন আসলে সেই এম্বুশ টার্গেট ছদ্মবেশী রাজাকারের ট্যাগ লাগানো মানুষগুলো আসলে কারা ছিলেন। শেষমেষ শেষ রক্ষা না হলে কি হতো তা এদেশে আজকের কজন কমিউনিস্ট শীর্ষ নেতার চেয়ে ভালো আর জানবে কে ! রাজনীতির বিষাক্ত ছোবোলে প্রাণই যদি অমন অনায়াসে শিকেয় ওঠে! তাহলে সনদ তো ছাড় ! বলি দ্বিমত আছে কার?

এই এতো প্রহসন ! নিমিষে কেউটে দংশন !
থামে কি ক্ষুদিরাম-প্রীতিলতা তবু অনুক্ষণ?

এ ও এক প্রেম। সীমাহীন ত্যাগে প্রশ্নাতীত মহান।
কার আগে কে পারে এই দৌড়ে তিরিশ লক্ষ বিলায়ে গেছে প্রাণ।

যেতে হলে আমিও যাবো। সন্তানের কাছে স্বপ্ন ও সম্ভাবনার গোলা ঘর বুকের আলমারীতে জমা রেখে যখন তখন অনায়াস ওই প্রেমের টানে আমিও চলে যাবো। যাবার আগে সেই অমোঘ গন্তব্যের ঠিকানা উত্তরাধিকারের বুক পকেটে এঁকে রেখে যাবো।

ছবিঃ গুগল