ব্রুটাস তুমিও!

ব্রুটাস তুমিও! একটি লাইন। লাইনের শেষে বিষ্ময়বোধক চিহ্ন। পৃধিবীতে বহুকাল ধরে বসবাসকারী মনুষ্য প্রজাতির চরিত্রের অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি দিক নিপুন ভাবে প্রকাশ করেছে এই এক লাইন। যুগ যুগ ধরেই করে আসছে। জুলিয়াস সিজারের পিঠে আমূল বসিয়ে দেয়া ব্রুটাসের ছোরা যেন বিশ্বাসেরই মূল উপড়ে ফেলা এক ঘাতক অস্ত্র। দিনে দিনে বেড়ে ওঠা বিশ্বাসের শরীরে লটকে দেয়া বিশ্বাসঘাতকতার ভয়ংকর নোটিশ। উইলিয়াম শেক্সপীয়াররের অমর নাটক ‘জুলিয়াস সিজার’ এক অর্থে বিশ্বাসঘাতক চরিত্রটিকে পৃথিবীতে একটি অবয়ব দিয়ে রেখেছে।
চারপাশে এমন দৃষ্টান্ত প্রতিদিনই আমরা দেখতে পাই। দেখতে পাই বিশ্বাসঘাতকতা গুড়িয়ে দিচ্ছে নির্ভরতা, ভেঙ্গে দিচ্ছে মন। মানুষের ইতিহাসের পৃষ্ঠায় বিশ্বাসঘাতকতার এই রক্তচিহ্ন বহু পুরনো।রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারকে খুন করার ঠিক দুই বছরের মাথায় নিজেই আত্নহত্যা করেছিলো ব্রুটাস। কিন্তু তার ছায়া কিন্তু আজো মানুষের মনের ভূগোলকে তছনছ করে দিচ্ছে। ভালোবাসার গোপন আবাস, সমাজের বেড়ে ওঠা আর রাজনীতির মঞ্চ-সব জায়গাতেই আছে সেই সুপ্রাচীন ব্রুটাস অথবা তার ছায়া। আছে বিশ্বাসঘাতকতা।
এবার প্রাণের বাংলা প্রচ্ছদ আয়োজনের বিষয় সেই বহু আলোচিত, সমালোচিত বিশ্বাস আর তার ঘাতক।

মানুষ কেন বিশ্বাসঘাতকতা করে? মন নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের কাছেও মানুষের মনের এই বিশেষ ক্রিয়ার তেমন কোনো নির্দিষ্ট কারণ ধরা পড়েনি। মনোবিজ্ঞানে সংজ্ঞা হিসেবে বলা হয়েছে, একজন বিশ্বাসী মানুষ যখন তার কাছে সঞ্চিত অন্যের কোনো গোপন তথ্য বা খবর প্রকাশ করে দেয় তখনই তার নাম বিশ্বাসঘাতকতা। এই বিশ্বাসঘাতকতায় পতন ঘটে রাজার, বদলে যায় রাজনীতির মানচিত্র, ঝড় ওঠে মানুষের একান্ত সংসারের নিভৃত কোণে। বিপদাপন্ন হয় একজন ব্যক্তি।
বিশ্বাসঘাতকতার হাত ধরে আসে মানসিক যন্ত্রণা। বিজ্ঞানীরা বলেন, বিশ্বাস ভাঙ্গার এই গোটা প্রক্রিয়াটিই এক ধরণের মানসিক বৈকল্য, ঈর্ষা যার অন্যতম উপাদান। মানুষের মস্তিষ্কে অক্সিটোসিন নামে এক ধরণের হরমোনের প্রবাহে জন্মের পর তৈরী হয় বিশ্বাসবোধ। পরীক্ষায় দেখা গেছে একজন পরিণত মানুষ যখন তার কর্মক্ষেত্রে বিশেষ করে কোনো আর্থিক লেনদেন করে ব্যবসায়, তখনই তার মস্তিষ্কে এই অক্সিটোসিন হরমোন কাজ করতে শুরু করে। সে তখন বিশ্বাস করতে চায় লেনদেন বা চুক্তির অপরপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি শেষ পর্য্ন্ত তার বিশ্বাস রক্ষা করবে। বিশ্বাসভঙ্গের মানসিকতা এই অক্সিটোসিনের প্রবাহকে মাথার ভেতরে আটকে দেয়। আর তাতেই ঘটে প্রলয়।
অনেকে মনে করেন বিশ্বাসঘাতকতা মানেই নারী ও পুরুষের প্রেমের সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া।আজকের দুনিয়ায় এমন দৃষ্টান্তই বেশী। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা তো শুধু ভালোবাসার উল্টোপিঠে বেঁচে থাকে না। বিশ্বাসঘাতক চরিত্রটি আরো অনেক অবয়ব ধারণ করে পেছনে এসে দাঁড়ায়। তার নির্মমতার ছুরি বিদ্ধ করে। আর সেখানেই তৈরী হয় কঠিন মনবেদনা আর যন্ত্রণা। আর সেখান থেকেই কেউ কেউ জটিল মানসিক রোগেও আক্রান্ত হয়ে পড়েন।বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে কেউ হারিয়ে ফেলেন মনের স্থিতি, হারান শারীরিক সুস্থতাও।
বিশ্বাসঘাতকতার প্রসঙ্গ উঠলেই কেউ কেউ নারীকে দোষারোপ করেন একক ভাবে। যেন পৃথিবীতে তাবৎ বিশ্বাস ভাঙ্গা এবং রক্ষা করার দায় নারীর উপরেই বর্তেছে। তারাই প্রেম এবং বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যে পুরুষকে ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। অভিযোগটি অর্ধসত্য। সম্পর্কের মাঝে বিপদ সংকেত বাজিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে পুরুষেরও দায় আছে। আর তাইতো সম্প্রতি কনডম তৈরির আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিউরেক্স’ এক সমীক্ষা চালিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসঘাতক হচ্ছেন থাইল্যান্ডের দম্পতিরা। দেশটির ৫১ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো সময় তাদের পার্টনারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে ফিনল্যান্ড। দেশটিতে এই পরিমাণ শতকরা ৪৬ ভাগ।
বিশ্বাসঘাতকতার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইতালি। দেশটির শতকতরা ৪৫ জন নারী ও পুরুষ তাদের পার্টনারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। চতুর্থ অবস্থানে থাকা জার্মানিতে এই সংখ্যা ৪৫ শতাংশ।
ফ্রান্স বললেই ভালোবাসার এক দেশ চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমাদের। ফরাসীরা মনে করে একই সঙ্গে একাধিক নারী অথবা পুরুষকে ভালোবাসা যেতেই পারে। এটা কোনো এলিয়ন আচরণ নয়। আর সে কারণেই হয়তো ফরাসীদের ৪৩ শতাংশ মানুষ নিজের সঙ্গীর প্রতি বিশ্বাসী নয়।
তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা নরওয়ের মোট ৪১ শতাংশ নারী-পুরুষ দাম্পত্য সম্পর্কে ছলনা বা মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়। ক্যাথলিক দেশ স্পেনের প্রায় ৩৯ শতাংশ নারী-পুরুষ মিথ্যাচারী বলে দাবি করা হয়েছে ওই গবেষণা প্রতিবেদনে। আর সঙ্গী থাকার পরও অন্য নারী বা পর-পুরুষের প্রতি আকর্ষিত হয়ে থাকে যুক্তরাজ্যের প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ।
কেমন দাঁড়ালো এই গবেষণা চিত্র? নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই এটা সমান দুঃসংবাদ। জীবন আর সাহিত্য দু জায়গাতেই বিশ্বসঘাতক চরিত্রটি অমর হয়ে আছে। আর সাহিত্যের চরিত্র তো উঠে আসে জীবন থেকেই। ব্রুটাসের কাহিনী ইতিহাসের পাতায় সত্য। কিন্তু সাহিত্যের কারণে ইতিহাস ছাপিয়ে এই চরিত্রটি এক ধরণের দার্শনিক গভীরতা লাভ করেছে। তেমনি বাস্তবের আরেক চরিত্র কুইসলিং। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নরওয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নিজের দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এখন বিশ্বাসঘাতকতার দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছেন। অনেক সময় বিশ্বাস ভঙ্গের প্রসঙ্গ টানতে গিয়েও লেখকদের লেখায় তার উদাহরণ চলে আসে। একই ধরণের আরেকটি নাম ইতিহাসে কুখ্যাত। মানুষটি মীরজাফর আলী খান। নবার সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা তুলে দিয়েছিলো বৃটিশ ব্যবসায়ীদের হাতে। আজো তাই বাংলা ভাষায় বিশ্বাসভঙ্গকারীর কথ্য রূপটিও তারই নামে।
শেক্সপীয়ারের বিখ্যাত নাটক ‘হ্যামলেট’। সেখানে মূখ্য চরিত্র হ্যামলেটের সঙ্গে, তার পিতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো তার মা। হ্যামলেট সেই সত্য জানতে পেরে এক ধরণের মানসিক বৈকল্যের স্বীকার হয়েছিলো। এমন বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী আমরা পাই হোমার রচিত পৌরাণিক মহাকাব্য ‘ইলিয়াডে’-এ। যেমনটা পেয়ে যাই আরেক মহাকাব্য মহাভারতে।এমন পরিত্রের দেখা মেলে মানিক বন্দ্যাপাধ্যায়ের ‘প্রাগঐতিহাসিক’ গল্পে।
বাংলা কথাসাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে খল চরিত্র যেন রাজত্ব করেছে। এরা পাপী, নীতিভ্রষ্ট, প্রবৃত্তিতাড়িত। তাঁর উপন্যাসে কোনো কোনো নারী চরিত্রও চতুর, কূটকৌশলী। জীবনের ছায়া থেকেই কথাশিল্পী সৃষ্টি করেছেন এমনি সব চরিত্র।
কিন্তু মানুষ কেন বিশ্বাসঘাতকতা করে, অন্যের পিঠে ছুরি বসিয়ে দেয় অবলীলায় তার কিন্তু কোনো উত্তর আজো খুঁজে পাওয়া গেলো না। শুধু গবেষকরা বলছেন, ঈর্ষা, সন্দেহ আর নিজের অক্ষমতাই মানুষকে বিশ্বাস ভাঙ্গার কাজে প্রবৃত্ত করে। আর লোভ? লোভও এই প্রবৃত্তির মিছিলে অন্যতম এক অংশীদার। অর্থলোভ মানুষের নৈতিকতাকে খুন করে জলে ভাসিয়ে দেয়। আর তারপরেই আসে বিশ্বাসঘাতকতা।
নারী বিশ্বাস ভাঙ্গছে, ভাঙ্গছে পুরুষও। ভেঙ্গে যাচ্ছে মন, শোনা যাচ্ছে যুদ্ধের কোলাহল, বিনষ্ট হচ্ছে সংসার, দেশ। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকের হাত থেকে পরিত্রাণ নেই। সেই কবে যীশুকে রোমান সৈন্যদের হাতে তুলে দিয়েছিলো তাঁরই একান্ত অনুচর জুডাস। যে দৃশ্য আজো অমর হয়ে আছে এক চিত্রকর্ম ‘দি লাস্ট সাপার’-এ। জুডাস চুম্বন করেছিলো যীশুর গলায়। আর সেটাই ছিলো সেনাদলের জন্য সংকেত তাকে চিনে নেয়ার জন্য। তারপর বিশ্বঘাতকের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি।বদলে গেছে অবয়ব। চে গুয়েভেরার অবস্থান বলে দিয়েছিলো বলিভিয়ার স্থানীয় এক বৃদ্ধা। কিন্তু পরে নানা গবেষণায় অনুমান করা হয় চে‘র ধরা পড়ে যাবার পেছনে কলকাঠি নেড়েছিলো তারই বাহিনীর অন্যতম নারী সদস্য এবং চে গুয়েভেরার কথিত প্রেমিকা তানিয়া। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব মসনদ নিষ্কন্টক করার জন্য খুন করেছিলেন আপন সহদোরকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একদল মানুষ পাকিস্তানীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো নিজের দেশের সঙ্গে। হত্যা করেছিলো বহু মানুষকে। সবই বিশ্বাসভঙ্গকারীর নানা অবয়ব।
রাজনীতি যেমন বিশ্বসঘাতকতার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে তেমনি আরেক বড় অণুঘটক প্রেমের ঈর্ষা। নিজের স্বার্থ আর অসততাকে ঢাকতে বহু মানুষ প্রতারিত করে প্রেমিকাকে। প্রেমিকারাও ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে পাল্টে নিয়েছে নিজের চেনা রঙ। অদৃশ্য রক্তপাতে তছনছ করে দিয়েছে ভালোবাসার মানুষের হৃদয়। বিশ্বাসঘাতকতা এমনই। মাথার ভেতরে হরমোনের প্রবাহ মানে না, নিয়ম মানে না, নীতি মানে না। উচ্ছন্নে যাওয়া এক ক্রোধ কেবল বদলে দিতে চায় বিশ্বাসের ঘরবাড়ি। আর তাই বিশ্বাসঘাতক দেখে, বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে আমরা অস্ফূট গলায় বলে উঠি, ব্রুটাস তুমিও!

ইরাজ আহমেদ

ছবিঃ গুগল