‘যদি রোজ দু পেগ করে হুইস্কি খেতে হয়, আমি খাবো, আই এনজয় দ্যাট’-অঞ্জন দত্ত

আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু সড়ক দিয়ে একটু এগিয়ে গেলেই রিপন ষ্ট্রিট ।চেনা রাস্তা. …..এই পাড়ায় ঢুকলেই কেমন অ্যাংলো একটা ভাব অনুভত হয় আর অজান্তেই মনে মনে  গুনগুন শুরু হয়  “মেরি অ্যান…অ্যান মেরি…।

আর অঞ্জন দত্ত। রিপন স্ট্রিট নামটা সেই ছাত্রবস্হা থেকেই চিনেছি প্রথমবারের মতো অঞ্জন দত্তের জন্যেই ।

সেই পুরনো বনেদি পরিচ্ছন্ন বাড়ি ঠিক প্রথমবার যখন  এসেছিলাম তেমনি আজো।চেনা পরিবেশ, যত্রতত্র ছাইদানি  সেই সঙ্গে ছন্দা বৌদির নিপুন হাতে গুছানো সংসার। অঞ্জন দত্ত যার প্রথম পরিচয় অভিনেতা হিসেবে  ।অভিনয় করতে করতেই চলচ্চিত্র পরিচালনা।অভিনেতা হিসাবে জনপ্রিয়তা পাবার পর গায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ।সেই নব্বই দশকের শুরুতে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন জীবনমুখী গানের গায়ক হিসেবে।তার চলচ্চিত্র দিয়ে কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রে ঘটেছে গুরুত্বপূর্ণ এক পালাবদল।অঞ্জন দত্ত জন্মেছেন কলকাতার এক ক্ষয়িষ্ণু বনেদি পরিবারে   ১৯৫৩ খৃষ্টাব্দের উনিশে জানুয়ারি । ছোটবেলা কেটেছে দার্জিলিং-এ, যেখানে সবাই গিটার বাজায় । পড়েছেন সেখানকারই কনভেন্ট স্কুলে । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতকোত্তর । কিংবদন্তী নাট্যজন বাদল সরকারের কাছে অভিনয় শিখেছেন,  থিয়েটার চর্চা করছেন ১৯ বছর বয়স থেকে।   মৃণাল সেনের হাত ধরে চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি। অজস্র সিনেমা, টেলিফিল্মে অভিনয় করেছেন। পরিচালিত ছবির সংখ্যার তালিকা বেশ লম্বা চওড়া । নিজের লেখা ও সুর করা জনপ্রিয় গানের সংখ্যা অন্তত তিন শতাধিক । তাঁর 2441139 ছুঁয়েছে জনপ্রিয়তার আকাশচুম্বী । গান গাওয়া শুরু করেছেন অভিনয় শুরুর অনেক পরে। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম গানের অ্যালবাম শুনতে কী পাও? এরপর ‘পুরনো গিটার’, ‘কেউ গান গায়’, ‘চলো বদলাই’, ‘হ্যালো বাংলাদেশ’, ‘কলকাতা-১৬’-একের পর এক জনপ্রিয় অ্যালবাম আর গান গাইতে ঘুরে বেড়ানো সারা পৃথিবী। সত্যজিৎ রায় এর চলচ্চিত্রে অভিনয় করার বিরল সৌভাগ্য হয়েছে অঞ্জন দত্ত‘র। এছাড়া অভিনয় করেছেন মৃণাল সেন, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অপর্ণা সেনের চলচ্চিত্রে। হিন্দি ছবি বাড়াদিন এর মধ্য দিয়ে নিজে পরিচালনা শুরু করেছিলেন, পরিচালনা ক

ছেলে নীল দত্তের সঙ্গে

রেছেন ইংরেজি ভাষার ছবি Bow Barracks Forever ও বং কানেকশন এ প্রথমবার যেনো খুঁজে পেয়েছেন নিজের ছবির প্রকরণ। এরপর পরিচালনা করেছেন ‘চলো, লেটস গো’, ‘ম্যাডলি বাঙ্গালী’, ‘ব্যোমকেশ বক্সী’, ‘রঞ্জনা আমি আর আসবোনা’, ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’, ‘গণেশ টকিজ’ ও ‘শেষ বলে কিছু নেই’। অসাধারণ লিরিক, কথা, মেলোডি এবং গায়কী শক্তি হলো গানের বিশেষত্ব । আছে কখনো নাগরিক কবিতা আবার কখনো লোকগীতির সমন্বয় ।গান শুনলে মনে হয় দীর্ঘ নিঃশব্দ মাঠ, পাহাড়ের উপত্যকার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অনুভূতি । সমুদ্রে পা ভেজানো কিংবা জ্যেৎস্না রাতের আকাশে তারা ছোঁয়ার অনুভূতি । মানুষটার গায়কীতে কোন উন্মাদনা নেই কিন্তু কথা, লিরিকে ও সুরের মধ্যে একটা মাদকতা কাজ করে । সুরের মাধুরীতে শ্রোতা ভিজে যান, ভেসে বেড়ান মেঘের রাজ্যে, জ্বলে উঠেন আগুনের ফুলকিতে । এই হলো জীবনমুখী গান ।

অঞ্জন দত্ত‘র সঙ্গে আমার সংলাপ শুরু হয়ে গেছে এই গান নিয়ে। জীবনমুখী গান নিয়ে বললেন, গায়ক পিট সিগারের গান ‘উই শ্যাল ওভার কাম’ ‘হোয়ার অল দি ফ্লাওয়ার্স আর গন?’ আমাদের দেশেও পর্যন্ত খুব জনপ্রিয় গান। আমাদের দেশের স্কুল-কলেজের শিশু-কিশোররা প্রথমে এই গানটি গায়। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের বিখ্যাত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস দ্বিতীয় গানটি অনুবাদ করে ‘ফুলগুলো কোথায় গেল’ নামে গেয়েছেন। বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছাত্র-তরুণদের কন্ঠে একসময় জনপ্রিয়ে এই গানটি ছিল। আমরাও গাইতাম। জীবনমুখী গানের ক্ষেত্রে খুবই পরিচিত জোয়ান বায়েজকেও আমরা চিনি বাংলাদেশের যুদ্ধবিরোধী কনসার্টে অংশগ্রহণের কারণে।

আসলে জীবনমুখী এই গানের ধারা তৈরি হয় ১৯৬০-৭০ এর দশকে বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বর্ণবৈষম্য বিরোধীতার আন্দোলন, মানবমু্ক্তির আন্দোলন, নারীমুক্তি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। রাজনীতি আর ধর্ম মানুষকে আলাদা করে তাই আমি কখনোই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হইনি ব্যাক্তিগত ভাবে ।  মনে হয় শিল্পসত্তার চেয়ে বড় জিনিস পৃথিবীতে নেই। শিল্প মানুষকে এক করতে পারে, যে কোন ধর্ম, যে কোন জাতি, যে কোন পার্টি, যে কোন রং, যে কোন জেন্ডার, এক করছে শিল্প। আমি যদি আজকে একটা ভালো গান শুনি, আমার পাশের লোকটা জু না ফ্যাসিস্ট, খ্রিশ্চিয়ান না হিন্দু, আমার জানার দরকার নেই। একটা ভালো সিনেমা, অনেক মানুষকে এক করে দেয়, একটা ভালো বই সব মানুষকে এক করে দেয়। ভাগ করে ধর্ম, ভাগ করে রাজনীতি,ভাগ করে কাঁটাতার। শিল্প মানুষকে এক করে।  আমি মনে করি কম বেশি করে হলেও আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাজটির সঙ্গে জড়িত।  আমি এটা বিশ্বাস করি।

মৃণাল সেনের অন্তরীন ছবিতে

ছবি করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না, আমি তাই থিয়েটার করতাম। একটা ফরাসী নাটকের কাজেই, আমি ফরাসী দূতাবাসে গিয়েছিলাম স্পন্সরের ব্যাপারে পরিচালকের সঙ্গে দেখা করতে। তখন  আমার বয়েস একুশ না, বাইশ এরকম। আমি থিয়েটার তখন করছি। নির্দেশনা দিচ্ছি। আমার তখন একটা ছোট দলও আছে। দুটা নাটক করেছি। সেই ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বেসিতে মৃণাল সেন এসেছিলেন, একদিন প্রতিদিন ছবিটার সাব টাইটেল মানে ফরাসি সাবটাইটেল এর ব্যাপারে। আমি একটা কোণে বসে বসে গাঁজা খাচ্ছিলাম। এতবড় একটা লোক বসে আছে, তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেন, আমি উনার সঙ্গে কথা বলি। আমি পরে বুঝতে পারি, মানে কথাটথা বলে পরে বুঝতে পারি যে উনি মৃণাল সেন। তখন আমি একটা খবরের কাগজে চাকরি করতাম । তার একবছর পর মৃণাল সেন আমাকে খোঁজ করতে শুরু করলেন। সবাই বললো, ‘তোমাকে মৃণাল সেন খুঁজছেন।’  তখন আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। বার্লিন যাবো ভাবছি। তখনই শুনলাম মৃণাল সেন খোঁজ করছেন তাঁর ছবির নায়ক বানাবার জন্য। খুঁজতে খুঁজতে  খুঁজতে, তিনি পেলেন আমাকে। মৃণাল সেন, রিহার্সেলে ডাকলো আমাকে, এবং আমাকে বললো, ‘তুমি সিনেমায় নামবে?’ আমি রাজি হয়ে গেলাম। আমি সিনেমার মোহে পড়ে গেলাম, অভিনয় করলাম, ছবিটা বোম্বেতে গেলো, আমি একটা পুরষ্কার পেলাম।সেরা অভিনেতার পুরস্কার   ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ।এটা বলছি আমি নাইনটিন সেভেনটি নাইনের কথা। সেভেনটি নাইন, আমি গানটান করছি না তখন। মৃণাল সেন নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুটিং শুরু হবার আগেই বুদ্ধদেব বাবু খবর পেয়ে, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বললেন যে, আমার ছবিতে নায়কের চরিত্র করতে হবে। এইবার আমি পর পর  কিছু ছবিতে কাজ করলাম।

মৃণাল সেনের চালচিত্র ছবিতে

আমার কখনোই মনে হয়নি যে আমি কবিতা লিখতে পারবো কোন দিন ।বা লেখক হবার ইচ্ছে যা ইদানীং হচ্ছে, মানে বই লেখা । কিন্তু আমি তো নিজের স্ক্রিপ্ট নিজেই লিখি ।সে জায়গা থেকে কবিতা কখনো আমার মনে আসেনি গানের মধ্যে দিয়েই এসেছে এবং সেই সময় আমি, সুমন প্রথম, তারপর আমি, নচিকেতা, আমরা তিনজনই একটা বড়সড় পরিবর্তন আনলাম গানে।আর  কীর্তন একটা শিল্প, আমার কাছে মস্ক একটা আর্কিটেকচার, সেখানে ঈশ্বর থাকে কি না আমি জানি না। কিন্তু মস্ক যদি না থাকতো, মন্দির যদি না থাকতো, চার্চ যদি না থাকতো, তাহলে আমরা আর্ট হারিয়ে ফেলতাম। একটা আর্ট, ইতিহাস ধরে, এই আর্ট, শিল্প তাঁরা বাঁচিয়ে রেখেছে।

যত রকমের খারাপ কাজ তো করেছি ওই শৈশবেই

 প্রথম কবে সিগারেট খেয়েছি, কবে প্রেম করেছি, প্রথম কবে মদ খেয়েছি…ওই সব কর্মই ঘটিয়ে ফেলেছিলাম আমার শৈশবে ।

 চৌদ্দ বছর বয়সে প্রেম ।আমার স্কুলে । আমার মিউজিক শেখাতেন যিনি অসম্ভব সুন্দরী একজন আইরিশ মহিলা। তাঁর প্রেমে পড়ে আমি রাত্রি বেলা কাঁদতাম। তারপর সে বুঝতে পেরেছিলো। বুঝতে পেরে আস্তে আস্তে কাছে টেনে আমাকে বুঝিয়েছিলো, আমি তার থেকে বয়সে অনেক ছোট।  তারপরে আবার একটু বড় হয়ে লোরেটো কলেজ, একটু বড় হয়ে কলেজের মেয়েদেরকে আবার ভাল্লাগতো…এ রকম কাউকে কাউকে ভাল্লাগতো আর কি।

তারপর দেখা হয় ছন্দার সঙ্গে ।

ইউনিভার্সিটি জীবনে আমাদের দেখা। ও মিয়ানমারে বড় হয়েছে। মিয়ানমারে জন্মেছে।এবার কথার মঝে ছন্দা দত্ত ঢুকে পড়লেন বললেন মিয়ানমারে বড় হয়েছি, রেঙ্গুন থেকে আরও দূরে, পাহাড়ে। ও তো পাহাড়ে বড় হয়েছি দার্জিলিং এ। আমাদের দেখা হয়  ইউনিভার্সিটিতে, ইংলিশে এম এ পড়ছি তখন এবং আমাদের ভালো লাগা, গান,  হিহি, রক এন্ড রোল এই জায়গা থেকে আমাদের এক সম্পর্ক তৈরি হয়। এবং আমরা বিয়ে করে ফেলি খুব অল্প বয়সে। এই আমাদের যোগাযোগ। তারপর থেকে ও পড়িয়েছে, নাটক করেছে আমার সঙ্গে, ওর জগত চলেছে, আমার জগত চলেছে এবং আমরা দুজন দুজনকে স্পেস দিয়েছি আমরা।এবার অন্জন দত্ত  ছন্দার কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, বাট অনেক ছুটতে হয়েছে আমাকে, অনেক জায়গায় যেতে হয়েছে। মানে আমি ঠিক সংসার, আমি করতে পারিনি। ছন্দা সে দায়িত্বটা নিয়ে সংসারটাকে ধরে রেখেছে, ছেলেমেয়েগুলিকে মানুষ করেছে, পড়িয়েছে, নীলকে গিটার শিখিয়েছে, আমি শেখাই নি। জার্মানি চলে গেলাম তিন বছর, বিয়ে করার পরেই। তিন বছর ছিলাম না তারপর আবার ফিরে এলাম, নীল জন্মালো। আমেরিকা চলে গেলাম এক বছর, আরও পরে নাইনটি ওয়ান থেকে নাইনটি টু। এইযে নানা রকম কিছু। ফিরে এসে নাইনটি ফোরে গান করলাম।  একটা আনসারটেইন সময় গেছে। তো এই সংসারটাকে ধরে রাখা, আমাদের, বাচ্চাদেরকে এবং আমাকে নিয়ে ধরে রাখাটা ছন্দার। এয়ারহোস্টেস হবার ইচ্ছে ছিলো ওর। হয়তো হয়নি আমার জন্যই।

আমি অভিনয়  করতে চেয়েছি, সিনেমা করতে পেরেছি, গানটা চলে এসছে, আমি কিন্তু একটা ক্রিয়েটিভ শিল্পী হতে চেয়েছি, আমি কখনও তেমন একটা নিজেকে বিকিয়ে দেইনি। বিজ্ঞাপনের চাকরি টাকরি ও করেছি কিন্তু আমি কর্পোরেট লাইফ কখনও চাইনি। সেটার জন্যে কষ্ট করতে হয়েছে আমাকে, অনেক। একসময় মা সোয়েটার বুনে দিতো আমি গিয়ে ওটা বিক্রি করে আসতাম। বাবার অবস্থা খুব খারাপ । খুব বড়লোক ফ্যামিলির ছেলে আমি, কিন্তু সেই ফ্যামিলিটা সত্তরের দশক থেকে হুড়মুড় হুড়মুড় করে পড়ে গেলো। মানে কলাপস করে বসলো, দত্ত ভার্সেস দত্ত আমার জীবনের খুব কাছের গল্প।

যখন স্ট্রাগল করেছি, নাটক করেছি, ছন্দার বিয়ের গয়না বিক্রি করতে হয়েছে। কারণ আমি চেয়েছি এ রাস্তাটা। আমি চেয়েছি এটা করবো, আমি জানতাম আমি এটা করতে পারবো। সেটা করেছিও। আজ অব্দি ছন্দাতো আফসোস করে না যে গয়নাটা চলে গেলো। ও দিয়েছে, না দিতেই পারতো, বলতে পারতো আমার বিয়ের গয়না আমি  তোমায় দেবো কেন?  কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো যে, দিয়ে দাও আমি আর পারছি না আমাকে, গিভ মি টাইম। আরেকটা বিষয় হলো আমার শরীর ।শরীরের প্রতি নজর দিতে গিয়ে সারাদিন ধরে আমি স্যালাড খেয়ে, জিম করে আর দই খেয়ে একটা বোকা লোক হয়ে যেতে আমি রাজি নই । আমার যদি রাত্তির বেলা রোজ দু পেগ করে হুইস্কি খেতে হয়, আমি খাবো, আই এনজয় দ্যাট । সে রকম একটা ভালো গান শুনবো, একটা ভালো বই পড়বো ।ব্যাস. ..আর কি আছে  বলুন !

শীলা চৌধুরী (কলকাতা প্রতিনিধি)

ছবি:গুগল

 

  • আমি গায়ক অঞ্জন এর ভক্ত। অবাক হলাম শুনে গানের আগে অভিনয় শুরু করেছিলেন!!