ঘুরেফিরে থার্ড অপশান…

অদিতি বসু রায়

( কলকাতা থেকে ): এইসব বাবা-মায়েরা কোন ইস্কুলে পড়েন? যেখানে তাঁরা নাকি বুঝতে পারেন না মেয়ের ওপর এমন অত্যাচার হচ্ছে যার ফলে সে নিজেকে শেষ করে দেবে বা শ্বশুড়বাড়িই উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপারটা ঘটাবে? গত দুদিন ধরে যে মেয়েটির আত্মহত্যা শিরোণামে তাঁর শিক্ষক বাবা মেয়ের টাকার দরকার জেনে হাতখরচের পরিমাণ বাড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জানার প্রয়োজন মনে করলেন না কেন মেয়ের টাকার দরকার বাড়ছে। আজ শোনা যাচ্ছে, তিনি ‘বোঝেন নি’। এঁরা বোঝেন না। সব কটি এই ধরনের হত্যা বা আত্মহত্যার পর, জানা যায় বাবা-মা বোঝেন নি মেয়ের অসহায় দশা। আর ইলেকট্রিক চুল্লিতে নিজের রক্ত-মাংস ও আত্মার অংশকে শেষবারের মতো পুরে দিয়ে এসে তাঁরা নরক-যন্ত্রণার ভাগিদার হন আজীবনের কারাদণ্ড পাওয়া আসামীর মতো।
খুব জানতে মন চায়, কি করলে এঁরা বুঝবেন যে সন্তান সেই ধূসর অঞ্চলে পৌঁছে গেছে যেখানে নিজের জীবনও আর তার কাছে বাঁচার যোগ্য মনে হচ্ছে না বা শ্বশুড়বাড়ি থেকে তাকে জ্বালিয়ে বা ঝুলিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি-পর্ব চলছে! তাঁরা কি আশা করেন মেয়ে ফোন করে বলবে, বিষের প্যাকেট এবার গলায় ঢাললাম কিংবা এখুনি সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়ব, বুঝতে পারছি না দড়িটা খুলে পড়ে যাবে কিনা! নাকি এঁরা ভেবে থাকেন, জামাই এস এম এস করবে, কেরোসিন এনে রেখেছি মা। আপনার মেয়েকে জ্বালাতে ক’লিটার তেল লাগবে বলুন তো? নাহ! এ সারল্যের তুলনা নেই। যে পরিবার মেয়ের বিয়েতে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করতে দ্বিধা করেন না, তাঁরা কি পারেন না ভেবে দেখতে যাদের ভিক্ষা-প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিয়ে মেয়ের ‘সুখ কিনতে’ যাচ্ছেন, তারা আসলে মানুষ-ই নয়। যারা হাত পেতে থাকে, তারা কিভাবে হাত উলটে মেয়েটিকে আপন করে নেবে? কোন শিক্ষায় এই ‘পণপ্রথা’কে তাঁরা সমর্থন করে করে সন্তানকে কতগুলো শয়তানের বাড়িতে তুলে দিয়ে আসেন? এতই কি সরল, নাদান এঁরা?
আসলে, ব্যাপারটা দাঁড়াল এই যে, এত টাকা দিয়ে মেয়েকে লেখাপড়া(?) শেখান হল- বিয়ে দেওয়া হল- তারপর তাকে আবার ফিরিয়ে আনা যাবে কোন মুখে! পাড়া-প্রতিবেশি-আত্মীয় স্বজন কি ভাববে ? তার ওপর আবার মেয়ের ‘ভবিষ্যতে’র জন্যে চিন্তা! তার থেকে বরং খরগোশ জন্ম নিয়ে নেওয়াই ভাল। নিজের বিবরে মুখ গুঁজে নির্বিকার যাপন। আর সেই স্তোকবাক্যে নিজেকে ভুলিয়ে আর দিশেহারা মেয়েটিকে ‘ওসব এক্টু-আধটু সব শ্বশুড়বাড়িতেই হয়। মানিয়ে নে’ বলে বলে বুঝিয়ে ছাড়া তার অভিভাবকরা দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন- সুতরাং তার অপশান থার্ড রেল, সিলিং ফ্যান কিংবা ঘুমের বড়ি।

ছবি: গুগল