ভোরের বাসে কলকাতায় ফেরা

রাহুল পন্ডা

(কলকাতা থেকে): ভোরের বাসে কলকাতা ফেরার বেশ কিছু ঝঞ্ঝাট আছে। প্রথমত আপনি সারারাত ঘুমোতে পারবেন না। কেননা যতই চেষ্টা করুন রাতে কিছুতেই আপনার দু’চোখের পাতা এক হবে না। বরং চোখ বুজলেই দুঃস্বপ্ন ঘনিয়ে আসবে, ‘অ-এ অজগর আসছে তেড়ে/ বাসটি আমার গেল ছেড়ে।’ আর কে না জানে পাড়া-গাঁয় একবার সকালের বাস ছুটে গেলে কী পরিমান ভোগান্তি পোহাতে হয়। ফলে চিন্তায় চিন্তায় না ঘুমিয়ে যখন আপনি সক্কাল সক্কাল স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াবেন, তখন আপনার দিকে আর তাকানো যায় না। মুখ-টুখ শুকিয়ে পাকানো আমসির মতো চেহারা, লালচোখ, রাজ্যের ক্লান্তি আর অস্বস্তি চেপে বসেছে দুই ভুরুর ভাঁজে।

দ্বিতীয়ত, আপনি বাসে উঠেও ঘুমোতে পারবেন না। কেননা আপনার ঠিক পাশের সিটটিতেই উঠে বসবে একটি বেহায়া মেয়ে, যে কিনা গাড়িতে উঠেই কানে হেডফোন গুঁজে হাঁ করে ঘুমিয়ে পড়বে। হাঁ মানে আক্ষরিকভাবে হাঁ এবং কিছুক্ষণ বাদেই তার ঘাড় বিপজ্জনকভাবে নেমে আসবে আপনার দিকে। এরপর আপনিও যদি ঘুমোতে চেষ্টা করেন, ঘাড় হেলিয়ে দেন, বেশ একটা অসামাজিক নিষিদ্ধ ব্যাপার তৈরি হবে, যেটা দেখে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছোটলোক আম-আদমিরা দাঁত বের করে হাসবে, তাদের চোখের কোনে খেলে যাবে চটুল ইঙ্গিত, আঙ্গুলের মুদ্রায় অশ্লীলতা, যার মর্মার্থ, ‘কী দাদা, দীঘা থেকে ফুর্তি লুটে ফিরছেন নাকি? বৌদিকে তো মোটে ঘুমোতে দেননি দেখছি।’ স্বাভাবতই চড়াক করে ব্রহ্মতালু অব্দি জ্বলে যাবে আপনার। আপনি দাঁতে দাঁত চেপে শপথ নেবেন, কোন না কোনদিন ঠিক ভোটে জিতে হাওড়া-দীঘা রাস্তাগুলো মাঝামাঝি খুঁড়ে দেবেন গাঁইতি দিয়ে, যাতে একটিও মদ্যপ লম্পট ট্যুরিস্ট বগলে মেয়ে আর হাতে বোতল দুলিয়ে দীঘা না ঢুকতে পারে, এবং তাদের কলঙ্ক আপনাকে না পোহাতে হয়। এরপর কীভাবে ভোটে জেতা যায় সেটা ভাবতে ভাবতে আপনি মশগুল হয়ে যাবেন, যথারীতি ঘুমের দফারফা।

হয়তো এরপরেও কিছু ঘুম হতো, কিন্তু সে পথে আগেই থেকেই কাঁটা দিয়ে রেখেছেন আপনার মা। আপনি যখন ব্যাগ গুছোচ্ছিলেন, যুৎ করে ঢোকাচ্ছিলেন সুকুমার সেনের সাহিত্যের ইতিহাস আর শ্যামাপদ চক্রবর্তীর অলংকারের বই, তখন মা এসে আপনাকে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট ধরাবেন। ধরিয়ে বাধো বাধো মুখে বলবেন, ‘একটু চালমুড়ি আর কয়েকটা তিলের নাড়ু দিলাম, ব্যাগে নিয়ে নে।’ শুনে আপনার খেয়াল হবে পুজোর সময় বাড়ি ফিরে প্রথম এই আবদারটিই জানিয়েছিলেন মাকে, মা মনে রেখেছেন। আপনার মনে প্রচণ্ড একটা আনন্দ মুচড়ে উঠবে, আহ্লাদে আটখানা হয়ে মার হাত থেকে প্যাকেটটি প্রায় ছিনিয়ে নেবেন আপনি এবং জোর করে ব্যাগে ঢোকাতে চেষ্টা করবেন। কিন্তু সেটি ঢুকবে না, কেননা গ্যাঁড়াকল সুকুমার সেন ততক্ষণে জায়গা জুড়ে বসেছেন। এই পরিস্থিতিতে বিচক্ষণ পুরুষ যা করে, আপনি তা করবেন না, বরং তুমুল আক্রোশে টেনে বের করবেন সু সেনের পাঁচ খণ্ড এবং অবহেলায় ছুঁড়ে মারবেন আলমারির অনির্দিষ্ট কোনে, যাতে অন্তত কয়েক দশক সেগুলি না সূর্যের আলো দেখে। এরপর ব্যাগটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা হয়ে যাবে, একদিকে শীর্ণ শ্যামাপদের চটি বইখানি, অন্যদিকে অনন্ত খাদ্যাদি, চমৎকার সহাবস্থান তৈরি হবে। সেই সঙ্গে আপনি এই ভেবে পুলকিতও হবেন যে শ্যামাপদবাবুকে নতুন একটা সমস্যা ঠুকে দেওয়া গেল, ‘বল তো বাপু, মুড়ির হাতে তিলের নাড়ু / কে কার অলংকার?’

কিন্তু বাসে উঠে এই আপ্লুত ভাবটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। উল্লাস মিলিয়ে গিয়ে আপনার মনে উদয় ঘটবে অসহায়তার। কেননা খাওয়ার ব্যাগটা আপনি তুলে দিয়েছেন বাংকারে। এই রাস্তায় ব্যাগপ্পত্তর চুরি যাওয়ার বিলক্ষণ সম্ভাবনা আছে। আপনি সারাক্ষণ ঘাড় উঁচু করে পাহারা দিতে পারেন না। লোলুপ চোরের জন্য মুহূর্তের অন্যমনস্কতাই যথেষ্ট। ফলে থেকে থেকেই আপনি চঞ্চল হয়ে উঠবেন, ভেতরে অস্থিরতা পাক মারতে শুরু করবে। যতই হোক, পেটুক বামুন আপনি, সব ছাড়তে পারেন, নিজের পেট নয়। শেষে চার ঘন্টা চরম টানাটানির পর, পিত্ত যখন ছেড়ে যায় ছেড়ে যায় অবস্থা, ঠিক তক্ষুনি সেকেন্ড হুগলী সেতু পেরোনোর সময় আপনার মাথা বেমক্কা খুলে যাবে। ‘ইউরেকা’ বলে আপনি লাফিয়ে উঠবেন এবং এতক্ষণ কোলে চেপে রাখা হাফলাখি ল্যাপটপসহ ব্যাগটি অবহেলায় বাংকারে তুলে দিয়ে, সযত্নে খাবারের থলেটি নীচে নামিয়ে নিয়ে বসবেন। ব্যাস, সহজ সমাধান, সহজ শান্তি।

কিন্তু শান্তি একটা ইউটোপিয়া মাত্র, উত্তর-আধুনিকতা না জানা অসহায় মূঢ়জনকে ভরসা দেওয়ার জন্য নির্মিত। কার্যত আসল ভোগান্তি এরপরই শুরু হবে আপনার। কেননা এতক্ষণ যা ছিল অধরা, তাই গুটিগুটি হাজির হবে আপনার সামনে, একটা নিবিড়, অনায়াস ঘুম ঘনিয়ে আসবে আপনার আঁখিপল্লবে। যেভাবে পাল ভেঙে নাবিক হারিয়ে যায় দারুচিনি দ্বীপে ঠেকার আগে, ঠিক সেভাবে বাস ফোর্ট-উইলিয়াম ক্রস করার আগেই আপনি স্বপ্নের দেশে তলিয়ে যাবেন। ফল যা হওয়ার তাই, দীঘা-গড়িয়া স্টেটখানা এরপর একে একে ধর্মতলা, এক্সাইড, রাসবিহারী, গোলপার্ক, থানা হয়ে যাদবপুর ছাড়িয়ে যাবে, কিন্তু আপনার ঘুম ভাঙবে না। অচিন দেশে পরীদের সঙ্গে আপনি তখন লালজুতো পায় বেড়ু করছেন। বেড়ু করার পর যেই না এক লালপরীর হাত ধরতে যাবেন খপ করে, অমনি ধাক্কা। অভিঘাতে আপনার ঘুম ছুটে যাবে, দেখবেন সামনে কালান্তক যমসম দাঁড়িয়ে কন্ডাকটর। গাড়ি গড়িয়ায় ঠেকে গেছে, কন্ডাকটর আপনাকে ধাক্কিয়ে তুলছে। এরপর যা হয়, আপনি ধড়ফড় করে বাস থেকে নামবেন, রাস্তা পেরিয়ে অটোয় উঠবেন এবং ফিরতি পথে যাদবপুরের দিকে রওনা দেবেন।

দেবেন কিন্তু পৌঁছবেন না। কেননা নাটকের যবনিকা পড়ার আগে একখানা ফাইনাল ট্যুইস্ট বাকি আছে। অটো বাঘাযতীন ঠেকলে আপনার মনে পড়বে কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে, সর্বনাশের মাথায় অন্তত তিনবার বাড়ি, ল্যাপটপখানা বাসে ফেলে এসেছেন। তড়িঘড়িতে নামতে গিয়ে তখন গুবলেট হয়ে গেছে সব। এইবার খুব মজা হবে জানেন তো, প্রথমত জমজমাট বাঘাযতীন চৌমাথায় আপনার ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করবে, দ্বিতীয়ত ফিরতি পথে ঘোরতর নাস্তিক আপনি তেড়ে ঈশ্বরের নাম জপ করা শুরু করবেন, ‘ঠাকুর, এইবারটা সামলে নাও প্লিজ, বাবা জানলে এই বয়সেও উদোম ক্যালাবে, তুমি তো বোঝো সব ইত্যাদি’। যাইহোক, ঈশ্বরই শেষপর্যন্ত বাঁচাবেন আপনাকে। সেই কন্ডাকটর। তিনি ব্যাগটা গুছিয়ে রেখেছিলেন, আপনি গিয়ে দাঁড়াতেই ফেরত দিলেন। বোধহয় দাবড়ানি দিতেন, কিন্তু আপনার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে ছেড়ে দেবেন, শুধু অফিসঘর থেকে ব্যাগটা এনে দিতে দিতে বলবেন, ‘বাসে ওঠার সময়ই মাস্টারমশাই বলে দিয়েছিলেন তোমার দিকে নজর রাখতে। ঠিকই বলেছিলেন, খুব অন্যমনস্ক তুমি।’ বুঝবেন বাবার ছাত্র, ঈশ্বর হয়ে বাঁচিয়ে দিলেন এ যাত্রায়।

যাইহোক, আর চাপ হবে না, ফাঁড়া যা ছিল কেটে গেছে। এরপর ফের অটোর লাইন, লাটবহর নিয়ে সিএনজিতে গুছিয়ে বসা, যাদবপুর এলে নেমে পড়া, গুটি গুটি হেঁটে মেসে ফেরা। উল্লেখযোগ্য বলতে, এই পুরো দৌড়-ঝাঁপের সময়টায় খাবারের ব্যাগটি আপনি একবারও হাতছাড়া করেননি। সেই যে কোলে নিয়ে বসেছিলেন, তেমনিই রয়ে গেছে। আসলে কী করেই বা ছাড়বেন বলুন, যতই হোক মায়ের দেওয়া জিনিশ, আপনি ভোর সাড়ে চারটায় উঠেছেন, মা তারও একঘন্টা আগে উঠে এসব বানিয়েছে, খুবই সামান্য, তবু। অনাত্মীয় শহরে এটুকুই তো আগামী দু’মাস আপনাকে বাড়ির কথা মনে করাবে, তাই না?

ভালো থাকুন সবাই।

ছবি: গুগল