সেদিন টিএসসিতে…

কাওসার চৌধুরী

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

ক’দিন আগে টিএসসিতে কি একটা কারনে জানি মিলেছিলাম আমাদের কয়েকজন! কাজ শেষে পুরনো স্মৃতি খুঁজতে গিয়ে সবাই ঢুকে পড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির সুইমিং-পুল প্রাঙ্গনে।

এই প্রাঙ্গনে কয়েকটি ‘মঠ’ (?) আছে অনেক প্রাচীন! 
এক সময়ে ওখানে বসে নাটকের মহড়া থেকে শুরু করে প্রেমের মহড়া সবই দিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে! এতদিন পরে সেই ‘পিলে-কাঁপানো’ জায়গাটি দেখে অনেক স্মৃতিকাতর হয়ে গিয়েছিলাম।

ইচ্ছে হল ওসব স্মৃতিছড়ানো জায়গাগুলোতে চুপচাপ বসে থাকি কিছুক্ষণ!
কিন্তু বিধি বাম। সঙ্গে যাঁরা ছিলেন তারা প্রায় সবাই ঠোঁটকাটা স্বভাবের আর ‘ঝানু-মোহন্ত’! একটু এদিক ওদিক হলেই বুঝে ফেলবেন আমার ঝারিঝুরি! তাই আর রিস্ক নিলাম না! বরং ওঁদেরকে ডেকে বলি- আসুন আপনাদের কিছু ছবি তুলে রাখি ‘পুরনো-স্মৃতির’ এই জায়গাটাতে!

উনারাও তো কম যান না!
আমার ছবি তোলা শেষে অন্যজনের হাতে আমার ক্যামেরাটা দিয়ে বললেন- ‘আসুন, আপনিই বা বাদ যাবেন কেনো। এখানে চাষাবাদ আপনিও তো কম করেন নি’! আমি সুবোধ বালকের মত তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াই।

এরমাঝে শাহীন ভাই, ঝুনা ভাই, কামাল পাশা চৌধুরী, মুকুল, আকলিমা সুলতানা (মুকুলের সহধর্মীনি), শাহীন, মিজান ভাইয়ের অর্ধাঙ্গিনীসহ আরো ক’জন বন্ধু ছিলেন। আমাদের ছবি তোলার ফাঁকে মুকুল আর তার অর্ধাঙ্গিনীকে বললাম সুইমিং পুলের পাশে বসতে। ওখানে বেশ ক’টা রোমান্টিক ছবির জন্য ‘পোজ’ দিলেন তাঁরা!

টিএসসির সামনে গিয়ে দেখা পেলাম সিরাজ ভাইয়ের (সিরাজুম মুনীর সিরাজ)। সিরাজ ভাই ১৯৭৯-এ সূর্য সেন হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। ওই সময়ে আতাউর রহমান ডিউক ছিলেন এই সংসদের সাধারণ সম্পাদক।

এই ছবি তোলাতুলি শেষে আমরা ক’জন আবার গিয়েছিলাম ময়না ভাইয়ের (মহিউজ্জামান চৌধুরী ময়না) সাথে দেখা করতে। উনি এখন টিএসসির পরিচালক। এই ময়না ভাই ছিলেন ১৯৮০-’৮১ সময়ের ডাকসু’র সাংস্কৃতিক সম্পাদক। উনার কামরায় বসে শাহীন ভাই, কামাল পাশা চৌধুরী, শাহীন, সিরাজ ভাইসহ চুটিয়ে আড্ডা দিয়েছি গরম সিঙ্গাড়া আর চা পান করতে করতে। বিট লবন দিয়ে ছোট সাইজের সিঙ্গাড়া সত্যিই উপাদেয় ছিল বটে!

একদম সামনের দিকে সিরাজ ভাই আর কামাল পাশা চৌধুরীর ছবি তুলতে গিয়ে টিএসসির দেয়ালে কিছু ঐতিহাসিক ছবি নজরে এলো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাহান্নর শহীদ, মুক্তিযুদ্ধের বীর শ্রেষ্ঠগণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পনসহ আরো কিছু ছবি। একটু দূরেই ছিল প্রয়াত গায়ক-সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরীর ছবি!

এই টিএসসি নিয়ে সম্ভবত কয়েক হাজার পৃষ্ঠা লেখার মত কাহিনী আমার কাছে সঞ্চিত আছে। যদি তেমন সময় পাই, লিখে যাবো কোনদিন।

আমি যখন ’৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে টিএসসির ‘ফুল-টাইম সংস্কৃতি কর্মী’ হয়ে গেলাম, তখন এই টিএসসি ছিল- নির্জন একটি এলাকা! এ মাথা থেকে কারো নাম ধরে ডাক দিলে ও মাথায় গিয়ে সে নাম ধ্বণি-প্রতিধ্বণি হত। হাকিম মিয়ার চায়ের দোকান থেকে আধা কেতলি চা এনে আমরা কয়েক-দল নাট্যকর্মী পালা করে পান করতাম। সঙ্গে একটি টোস্ট বিস্কুট থাকলে তো ভালো নইলে ওই খালি-চা শেষে পুনরায় মহড়ায় মন দিতাম। এক একটি নাট্যদল এক একদিন চায়ের দাম পরিশোধ করতো। তখন আমাদের আন্তরিকতা ছিল এখনকার তুলনায় ইর্ষনীয়!

আরণ্যক, পদাতিক নাট্য সংসদ (ঢাকা পদাতিক তখনো হয়নি), নাট্যচক্র, কালান্তর, সমষ্টি, বহুবচন, কালেভদ্রে ঢাকা থিয়েটার এবং কখনো-সখনো মানু (মইদুল ইসলাম মানু) ভাইয়ের দলটি টিএসসিতে নাটকের মহড়া করতো।

টিএসসি ছিল তখন অর্ধেক।
জনতা ব্যাংকের মাঝবরাবর খুব খেয়াল করে দেখলে একটি জোড়া দেখতে পাবেন! ওই জোড়ার পরের অংশটি নির্মিত হয়েছে ‘সেই সময়ের’ অনেক পরে। নির্মাণাধীন জায়গাটি টিন দিয়ে ঘেরা ছিল। ……সে অনেক কাহিনী! আজ এ পর্যন্তই থাক।

তবে শেষ করার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রস্তাব করতে চাই বিনয়ের সঙ্গে। টিএসসির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জামান স্যার (আহমেদ জামান খান) এই টিএসসির উন্নতিকল্পে যা করেছেন তা আমার পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন হবে। এই জামান স্যারের কাছে সময়ানুবর্তিতা, সততা, আন্তরিকতা, দেশপ্রেম আর মানবতা বিষয়গুলোর ওপরে বিশেষ তালিম পেয়েছিলাম।

আমার বিনীত প্রস্তাব-
টিএসসির দৃশ্যমান কোন একটি স্থানে জামান স্যারের একটি আবক্ষ ভাষ্কর্য স্থাপন করা হোক। এই ভাষ্কর্যের পাশে কিংবা পেছেনে একটি দেয়ালে লিপিবদ্ধ থাকুক জামান স্যারের অনন্য সব ‘কল্যাণকর কর্মকাণ্ডগুলোর’ কথা! যেখান থেকে আজকের প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীরা জামান স্যারের কল্যাণকর বিষয়গুলো নিজেদের মাঝে ধারণ করতে আগ্রহী হতে পারে! আমার এই বিনীত প্রস্তাবটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিলে বাধিত হবো।

ছবি: লেখক