আলী সাহেব ও রবীন্দ্রনাথ

সৈয়দ মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহচর্যে ছিলেন, সরাসরি। ছিলেন তাঁর শিষ্য। সুতরাং তাঁর লেখায় কবিগুরুর হাস্যরস বোধও প্রকাশ পেয়েছে। মুজতবা আলীর ‘চতুরঙ্গ’ বই থেকে দুটি হাসির কান্ড প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য পুনঃমুদ্রণ করা হলো।

(১) ভালই হল টাকা ধারের কথা মনে পড়ল।

‘দেহলী’র উপরে থাকতেন তিনি, নীচের তলায় তাঁর নাতি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ওরফে দিনুবাবু।
তাঁরই বারান্দায় বসে আশ-কথা-পাশ-কথা নানা কথা হচ্ছে। হতে হতে টাকা ধার নেওয়ার কথা উঠলো। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বুঝলি, দিনু, আমার কাছ থেকে একবার একজন লোক দশ টাকা ধার নিয়ে গদগদ কন্ঠে বললে, “আপনার কাছে আমি চিরঋণী হয়ে রইলুম”। সভায় যাঁরা ছিলেন তাঁরা পয়েন্টটা ঠিক কি বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলেন। আফ্টার অল্, গুরুদেবের পক্ষেও কালে-কস্মিনে কাঁচা রসিকতা করা অসম্ভব নাও হতে পারে।
খানিকক্ষণ পরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে গুরুদেব বললেন, ‘লোকটার শত-দোষ থাকলেও একটা গুণ ছিল। লোকটা সত্যভাষী। কথা ঠিক রেখেছিল। চিরঋণী হয়েই রইল’।
শ্রীযুত বিধুশেখর শাস্ত্রী, নেপালচন্দ্র রায়, ইত্যাদি মুরব্বীরা অট্টহাস্য করেছিলেন। আমরা, অর্থাৎ চ্যাংড়ারা, থামের আড়ালে ফিক্ ফিক্ করেছিলুম।

(২) ‘ভান্ডারে-গুরুদেব’ কাহিনী

রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে প্রচলিত গল্পের ভিতর আমার সবচেয়ে ভালো লাগে ‘গুরুদেব-ভান্ডারে’ কাহিনী। অবশ্য আমার মনে হয়, গল্পটির নাম ‘ভান্ডারে-গুরুদেব’ কাহিনী দিলে ভালো হয়, কারণ কাহিনীটি সম্পুর্ণ নির্ভর করছে, ভান্ডারের একটি সৎকর্মের উপর।
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ইংরেজ পছন্দ করতো না বলে শান্তিনিকেতন আশ্রমটিকে নষ্ট করার জন্য ইংরেজ একটি সূক্ষ্ম গুজব বাজারে ছড়ায়-শান্তিনিকেতনের ইস্কুল আসলে রিফরমেটরি। অন্তত এই আমার বিশ্বাস।
খুব সম্ভব তারই ফলে আশ্রমে মারাঠী ছেলে ভান্ডারের উদয়।
ইস্কুলের মধ্য বিভাগে বীথিকা-ঘরে ভান্ডারে সীট পেল। এ ঘরটি এখন আর নেই তবে ভিতটি স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। তারই সম্মুখ দিয়ে শাল বীথি। তারই এক প্রান্তে লাইব্রেরি, অন্য প্রান্তে দেহলী। গুরুদেব তখন থাকতেন দেহলীতে।
দেহলী থেকে বেরিয়ে, শালবীথি হয়ে গুরুদেব চলেছেন লাইব্রেরীর দিকে। পরনে লম্বা জোব্বা, মাথায় কালো টুপি। ভান্ডারে দেখামাত্রই ছুটলো তাঁর দিকে। আর সব ছেলেরা অবাক। ছোকরা আশ্রমে এসেছে দশ মিনিট হয় কিনা হয়। এরই মধ্যে কাউকে কিছু ভালো-মন্দ না শুধিয়ে ছুটলো গুরুদেবের দিকে।
আড়াল থেকে সবাই দেখলে ভান্ডারে গুরুদেবকে কি যেন একটা বললে। গুরুদেব মৃদু হাস্য করলেন। মনে হল যেন অল্প অল্প আপত্তি জানাচ্ছেন। ভান্ডারে চাপ দিচ্ছে। শেষটায় ভান্ডারে গুরুদেবের হাতে কি একটা গুঁজে দিলে। গুরুদেব আবার মৃদু হাস্য করে জোব্বার নিচে হাত চালিয়ে ভিতরের জেবে সেটি রেখে দিলেন। ভান্ডারে এক গাল হেসে ডরমিটরিতে ফিরে এল। প্রণাম না, নমস্কার পর্যন্ত না।
সবাই শুধালে, ‘গুরুদেবকে কি দিলি?’
ভান্ডারে তার মারাঠী-হিন্দীতে বললে, ‘গুরুদেব কৌন্? ওহ্ তো দরবেশ হৈ’।
‘বলিস কি রে ও তো গুরুদেব হ্যায়’!
‘ক্যা “গুরুদেব” “গুরুদেব” করতা হৈ। হম্ উসকো এক অঠন্নী দিয়া’।
বলে কি? মাথা খারাপ না বদ্ধ পাগল? গুরুদেবকে আধুলি দিয়েছে!
জিজ্ঞেসাবাদ করে জানা গেল, দেশ ছাড়ার সময় ভান্ডারের ঠাকুরমা তাকে নাকি উপদেশ দিয়েছেন, সন্ন্যাসী দরবেশকে দানদক্ষিণা করতে। ভান্ডারে তাঁরই কথামত দরবেশকে একটি আধুলি দিয়েছে। তবে হ্যাঁ, দরবেশ বাবাজী প্রথমটায় একটু আপত্তি জানিয়েছিল বটে, কিন্তু ভান্ডারে চালাক ছোকরা, সহজে দমে না চালাকি নয়, বাবা, একটি পুরী অঠন্নী!
চল্লিশ বছরের আগের কথা। অঠন্নী সামান্য পয়সা, এ-কথা কেউ বলেনি। কিন্তু ভান্ডারকে এটা কিছুতেই বোঝানো গেল না যে তার দানের পাত্র দরবেশ নয়, স্বয়ং গুরুদেব।
ভান্ডারের ভুল ভাঙ্গতে কতদিন লেগেছিল আশ্রম পুরাণ এ-বিষয়ে নীরব। কিন্তু সেটা এ-স্থলে অবান্তর।
ইতিমধ্যে ভান্ডারে তার স্বরূপ প্রকাশ করেছে। ছেলেরা অস্থির, মাস্টাররা জ্বালাতন, চতুর্দিকে পরিত্রাহি আর্তরব।
হেড মাস্টার জগদানন্দবাবু এককালে রবীন্দ্রনাথের জমিদারী-সেরেস্তায় কাজ করেছিলেন। লেঠেল ঠ্যাঙ্গানো ছিল তাঁর প্রধান কর্ম। তিনি পর্যন্ত এই দুঁদে ছেলের সামনে হার মেনে গুরুদেবকে জানালেন।
আশ্রম-স্মৃতি বলেন, গুরুদেব ভান্ডারেকে ডেকে পাঠিয়ে বললে, ‘হ্যাঁ রে, ভান্ডারে, একি কথা শুনি?’
ভান্ডারে চুপ।
গুরুদেব নাকি কাতর নয়নে বললেন, ‘হ্যাঁ রে ভান্ডারে, শেষ পর্যন্ত তুই এসব আরম্ভ করলি? তোর মত ভালো ছেলে আমি আজ পর্যন্ত দেখি নি। আর তুই এখন আরম্ভ করলি এমন সব জিনিস যার জন্য সক্কলের সামনে আমাকে মাথা নিচু করতে হচ্ছে। মনে আছে, তুই যখন প্রথম এলি তখন কি রকম ভালো ছেলে ছিলি? মনে নেই, তুই দান-খয়রাত পর্যন্ত করতিস? আমাকে পর্যন্ত তুই একটি পুরো আধুলি দিয়েছিলে? আজ পর্যন্ত কত ছাত্র এল গেল কেউ আমাকে একটি পয়সা পর্যন্ত দেয়নি। সেই আধুলিটি আমি কত যত্নে তুলে রেখেছি। দেখবি?’

সংকলিত
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল