রেমন্ড শ্যান্ডলারের লুকিয়ে রাখা গল্প

রেমন্ড শ্যান্ডলার গল্প লিখেছিলেন একটা। গল্পের নাম ‘ইট‘স অল রাইট-হি অনলি ডাইড’। জেনারেল হাসপাতালের অ্যাডমিটিং ক্লার্ক আইরিস কুক, হাসপাতালের করিডরে রাখা স্ট্রেচারে শোয়ানো লোকটার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকিয়ে ছিল। নোংরা একটা লোক, মুখে হুইস্কির গন্ধ বের হচ্ছে। ট্রাক ধাক্কা মেরেছে। অন-ডিউটি ডাক্তারেরও সন্দেহ, একেবারে গরীব এক রুগী।

হামফ্রে বোগার্ট

চেহারাসুরত দেখে মনে হচ্ছে না, পকেটে পয়সা আছে। নিস্পৃহ গলায় তাই জানিয়ে দেওয়া হয়, এখানে কড়া নিয়ম, ভর্তি হতে গেলে ৫০ ডলার ফি দাও, নইলে মরো। এ ভাবেই শুরু গল্পটা। লেখক রেমন্ড শ্যান্ডলার। পাল্প ফিকশন আর ক্রাইম স্টোরি যাঁর কলমে বের হতো ঝর্ণাধারার মতো সেই শ্যান্ডলার!

হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘ডাবল ইনডেমনিটি’-এর সহচিত্রনাট্যকার ১৯৪০ সালেই দু’বার অস্কার মনোনয়ন পেয়েছেন এই ডিটেকটিভ-গল্পলেখক। ওয়াশিংটন পোস্ট যাকে ‘দ্য মোস্ট লিরিক্যাল অব দ্য মেজর ক্রাইম রাইটার্স’! বলে তকমা লাগিয়ে দিয়েছিলো। সেই লেখক যে এরকম একটি গল্প লিখতে পারেন, কে জানত!
আসলে জানেনি কেই-ই। ৬০ বছর গল্পের পান্ডুলিপি ঘুমিয়ে ছিল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বোডলেয়ান লাইব্রেরির আর্কাইভে, একটা জুতোর বাক্সের মধ্যে। সম্প্রতি সেই গল্প খুঁজে বের করেছেন ‘স্ট্র্যান্ড’ ম্যাগাজিনের ম্যানেজিং এডিটর এন্ড্রু গালি। যে ম্যাগাজিন একদা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে আর্থার কোনান ডয়েল থেকে আগাথা ক্রিস্টির একের পর এক গল্প, যার পাতায় ‘দ্য হাউন্ড অব দ্য বাস্কারভিলস’ ধারাবাহিক ভাবে বেরনোর সময় দফতরের বাইরে লম্বা লাইন পড়তো, তার বর্তমান সম্পাদকের হাতেই তো এই আবিষ্কার মানায়।
রেমন্ড শ্যান্ডলারকে ইতিহাস এতোদিন জেনেছে তাঁরই লেখা দিয়ে। তিনি গোয়েন্দা-চরিত্র ফিলিপ মার্লোর স্রষ্টা, রুপোলি পর্দায় যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন হামফ্রি বোগার্ট-এর মতো অভিনেতা। ফিলিপ দ্রুত গতিতে গাড়ি চালায়, মেয়েদের সঙ্গে ফ্লার্ট করে, অপরাধীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে দু’পেগ হুইস্কি উড়িয়ে দেয়! আর স্রষ্টা রেমন্ড শ্যান্ডলার তখনকার হলিউডে বিলি ওয়াইল্ডার-

সোনিয়া অরওয়েল

এর সঙ্গে স্ক্রিপ্ট লেখেন, আলফ্রেড হিচককের সঙ্গে বানান ‘স্ট্রেঞ্জার্স অন আ ট্রেন’, আমেরিকার ‘মিস্ট্রি রাইটার্স’দের সংগঠনের প্রেসিডেন্ট পদে বসেন, প্রেম করেন কখনও জর্জ অরওয়েল-এর বিধবা স্ত্রী সোনিয়া অরওয়েলের সঙ্গে, কখনও কবি-ঔপন্যাসিক স্টিভেন স্পেন্ডার-এর বউ নাতাশা স্পেন্ডার-এর সঙ্গে। তাঁর কলমে মুচমুচে চানাচুরের মতো হয়ে ওঠে খুন-ষড়যন্ত্র-প্রেম। পাঠক নড়েচড়ে বসেন। তাঁর কলম ক্রাইম-কাহিনিতেও ঝরায় কবিতা: মৃতরা ভাঙা হৃদয়ের চেয়েও ভারী। ‘ডেড মেন আর হেভিয়ার দ্যান ব্রোকেন হার্টস’!

প্রায় ৬০ বছর পর আলো-দেখা এই গল্পে (অনুমান, এটা শ্যান্ডলার লিখেছিলেন ১৯৫৯ সালে তাঁর মৃত্যুর বছর দুয়েক আগে) পাওয়া যাচ্ছে অন্য এক লেখককে। ১৯৫০-এর দশকের আমেরিকায় হাসপাতাল রুগীকে মাপছে তার টাকা দিয়ে। ব্যাংক ব্যালান্স আছে? তবে চিকিৎসা পাবে, আর টাকা না থাকলে চলে যাও।

ক্রাইম-লেখক রেমন্ড শ্যান্ডলার এই গল্প কোনও প্রকাশককে ছাপতে দেননি। চুপচাপ গুঁজে রেখেছিলেন অন্য লেখার স্তূপে।

নাতাশা স্পেন্ডার স্বামীর সঙ্গে

হয়তো ভেবেছিলেন তার লেখার ধরণের সঙ্গে এই গল্প একেবারেই মাননসই নয়। শ্যান্ডলার-বিশেষজ্ঞরাও অবশ্য মনে করছেন, তির্যক শ্লেষ পাওয়া যায় তাঁর এই গল্পের লেখায় ছত্রে ছত্রে, কিন্তু ‘ইট’স অল রাইট…’ গল্পে লেখকের যেন এক অন্য চেহারায় আবির্ভূত হয়েছেন। সমাজে টাকার গরম দেখানো মানুষগুলোর প্রতি তাঁর বিদ্রুপের চাবুক আছড়ে পড়ছে, গলার স্বর হয়ে উঠেছে বিরক্ত।
মেজাজি এই লেখক সারা জীবন কাটিয়েছেন নিজ নিয়মে। সিভিল সার্ভিসে পরীক্ষা দিয়ে চাকরি করেছেন, করেছেন সাংবাদিকতা। অংশ নিয়েছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। হিচককের সঙ্গে পটেনি বলে ‘ফ্যাট বাস্টার্ড’ বলে গাল দিয়েছিলেন বলেও শোনা যায়। তাঁর মেজাজ এমনি ছিলো যে, হলিউডের এক দামী প্রযোজক যখন তাঁর কাছে স্ক্রিপ্টের শেষটা কেনো লেখেননি জানতে চান তখন শ্যান্ডলার রেগে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘মদ খেয়ে তবেই লিখবো।’ এই মানুষটাই আবার স্ত্রীর মৃত্যুর পর এক বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, পুলিশকে খবর দিয়ে! ১৯৫৯-এ তিনি মৃত্যুবরণ করেন সেই হাসপাতালেই। সেই সময়ের রোগ-অভিজ্ঞতাই হয়তো লিখিয়ে নিয়েছিল সেই গল্প, আজও যা প্রাসঙ্গিক।

রায়হান হাসান
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল