আজো একটা ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন দেখি-মোরশেদুল ইসলাম

শবনম ফেরদৌসী

মোরশেদুল ইসলাম বাংলাদেশের খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মাঝে একজন । গত ১ ডিসেম্বর এই গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা ষাট বছরে পা দিলেন। সে উপলক্ষ্যে একাত্তর টেলিভিশনের পক্ষ থেকে তাঁর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেন আরেক চলচ্চিত্র নির্মাতা শবনম ফেরদৌসী। সাক্ষাৎকারটির কিছু অংশ একাত্তর টেলিভিশনে সম্প্রচারের পর এই কৃতি চলচ্চিত্র নির্মাতার আরো অনেক কথা পুনরায় উপস্থাপিত হলো প্রাণের বাংলায়।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই ভূমিকায় শবনম ফেরদৌসী বলেন, নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সেরা কাহিনীচিত্রের একটি ‘চাকা’। এ ছবির নির্মাতা শ্রদ্ধেয় মোরশেদুল ইসলামের জন্মদিন ছিলো ১ ডিসেম্বর। ৯৯’ সাল থেকে তাঁর সঙ্গে আমার ব্যাক্তি পর্যায়ে পরিচয়। নির্মাতা হিসেবে পরিচয় ঘটে স্কুল জীবনে তাঁর ‘আগামী’ ও ‘সূচনা’র মাধ্যমে।

৯৯’সালে আমরা টাঙ্গাইলে ‘টাঙ্গাইল ফিল্ম সোসাইটি’ করি। তার উদ্বোধন ঘটে ‘চাকা’র প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে।২০০৩ এ আমি যখন ‘ইচ্ছাবসন্ত’ তৈরী করলাম, তখন থেকেই আমি তাঁর অপত্য স্নেহের অংশীদার।তাঁর সঙ্গে যে আমার খুব একটা নৈকট্য বা উঠাবসা তা নয় একদম বরং তাঁর চেয়ে তাঁর জীবনসঙ্গী মুনিরা মোর্শেদ মুন্নী’র সঙ্গে আমার অধিক সখ্য।

কিন্তু, যখনই আমার কোন নতুন ছবির শো হবে, মোরশেদ ভাই তাঁর শত ব্যাস্ততার মাঝেও আসেন, মন দিয়ে ছবি দেখেন এবং তাঁর মতামত জানান।

আমার কাজ নিয়ে বরাবর তিনি উচ্ছ্বসিত।

এ আমার পরম পাওয়া!

শুধু তিনি নন, আমার চলচ্চিত্রিক জীবনে এদেশের সকল অগ্রজ নির্মাতার স্নেহ আমি অকাতরে পেয়েছি। ফলে আমার না পাওয়া বোধ প্রায় অপ্রতুল।

মোরশেদ ভাইয়ের ৬০ হয়ে গেল। কিন্তু, তাঁর মাঝে এখনো যেন সেই শুরুর দিককার ১৬ বছরের কৈশোর বিরাজমান। এটা একজন নির্মাতার জন্যে অপরিহার্য গুণ বলেই আমি জানি। শিশু হতে না পারলে সবকিছুর উর্ধে ওঠা যায় না।

এজন্যে অবশ্য আমি মুন্নী ভাবীর ধন্যবাদ প্রাপ্তির ঝোলা ভারী করবো। তাঁর মত জীবনসঙ্গী সকল নির্মাতার জন্যে ভীষণ জরুরী।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নিন মোরশেদ ভাই! আর ‘চাকা’র মত আরো ঢের ঢের ছবি আমাদের উপহার দিন…

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই মোরশেদুল ইসলাম জানালেন, তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের পেছনে প্রখ্যাত নির্মাতা সত্যজিৎ রায় এবং আকিরা কুরশাওয়ার প্রভাব গভীর ভাবে কাজ করেছে। সিনেমার দর্শক তিনি ছাত্র জীবন থেকেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে ১৯৮১ সালে চলচ্চিত্রের ওপর একটি কোর্স করার পর সিনেমার ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টে যায়। ওই ছাত্র অবস্থা থেকেই তিনি  তাঁর ‘আগামী’ ছবি নিয়ে কাজ শুরু করেন। তবে এই সিনেমাটির কাজ শেষ করার পর তৎকালীন সেন্সর বোর্ড জয় বাংলা শ্লোগান থাকার কারণে ছবিটি আটকে দিয়েছিলো।

‘চাকা’ ছবিটি তৈরীর সময় যথেষ্ট ঝামেলা পোহাতে হয়েছিলো তাকে। শ্যুটিং করার জন্য যে গ্রামটি বেছে নেয়া হয়েছিলো সেখানে অভিনেতা-অভিনেত্রী আর কলাকুশলীদের থাকার জায়গার অভাব ছিলো। ইউনিয়ন পরিষদের টিনের তৈরী অফিস ঘরে তাদের সবাইকে থাকতে হতো। শীতের রাতে শ্যুটিং শেষ করে ফিরে গোসল করতে হতো পুকুরে।

মোরশেদুল ইসলামের ৬টি ছবির গল্প মুক্তিযুদ্ধ নির্ভর। মুক্তিযুদ্ধ কি তাকে এতোটাই প্রভাবিত করেছিলো এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাকে মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করেছে। যুদ্ধের সময় আমি ছিলাম অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। তখন বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি যখন ঢাকায় অপারেশনে আসতেন তখন তার অস্ত্র থাকতো আমার আর বড় দুই বোনের কাছে। যুদ্ধটা তখন থেকেই আমার কাছে ছিলো ভীষণ অনুপ্রেরণার।

তাহলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় ক্যানভাসের ছবি কেন করেন নি মোরশেদুল ইসলাম? তিনি জানালেন, বড় ক্যানভাসের ছবির জন্য প্রয়োজন বড় বাজেট। তবে একটি যুদ্ধ, যুদ্ধের ইতিহাসকে নানা ভাবে তুলে ধরা যায়। অনিল বাগচীর একদিন অথবা খেলাঘরে সেভাবেই যুদ্ধকে তিনি দেখানোর চেষ্টা করেছেন।

রাজনীতি শিল্পকে দিন শেষে প্রভাবিত করে। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক চেতনা এই নির্মাতাকে প্রভাবিত করেছিলো কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশেষ রাজনৈতিক চেতনার কথা বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের কথাই বলতে হয়। এই চেতনাই আমাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রভাবিত করেছে।

এখন পর্যন্ত নিজের তৈরী কোন ছবিটি তাঁর বিশেষ প্রিয়? মোরওেশদুল ইসলাম এক কথায় উত্তর দিলেন, ‘খেলাঘর’।

খেলাঘর ছবিতে প্রেম একটি ভূমিকা পালন করেছে কিন্তু তাঁর অন্য ছবিতে প্রেম একেবারেই অনুপস্থিত কেন? এমন প্রশ্নে চলচ্চিত্রকার স্বীকার করে নিলেন তাঁর সিনেমায় প্রেম আসলেই অনুপস্থিত। তবে তিনি জানালেন, ভবিষ্যতে একেবারে প্রেম নির্ভর একটি ছবি বানানোর পরিকল্পনা আছে তাঁর।

পরিচালক মোরশেদুল ইসলামের জীবনে কোনো স্ক্যান্ডাল নেই কেনো এমন প্রশ্নে হাসলেন তিনি। তারপর বললেন, সততা বিষয়টি তাঁর কাছেগুরুত্বপূর্ণ। সৎ চলচ্চিত্রের কথা মুখে বলে ব্যক্তি জীবনে সৎ না থাকার ব্যাপারটা তিনি মেনে নিতে পারেন না। তবে পাশাপাশি এও জানালেন, ভবিষ্যতে কোনোদিন প্রেমে পড়বেন না এমন গ্যারান্টি তিনি দিতে পারেন না। সেক্ষেত্রে সেই প্রেমের প্রতিই বিশ্বস্থ থাকতে চান তিনি। তখন যার সঙ্গে প্রেম থাকবে না, সম্পর্কটা হবে শুধু আইনের সে সম্পর্ক নিজেই চুকিয়ে দেবেন।

শিল্পীর দায় প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি খোলামেলা ভাবেই জানালেন, শিল্প ও শিল্পীকে এখনকার কর্পোরেট জগত দখল করতে চাইবেই। সে চেষ্টা চলছে। হয়তো কেউ কেউ সে প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকেও পড়েছেন। তবে অনেকেই আছেন যারা নিজস্ব সত্ত্বা নিয়ে লড়াই করছেন।

বাংলাদেশের সিনেমায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন । এতোগুলো বছর পেরিয়ে নিজেকে কোথায় দেখতে চান বা দেখেন তিনি? উত্তরে বললেন, এখনো তেমনকিছুই করা যায় নি। ছোট ছোট কিছু চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। তবে আমি বিশ্বাস করি, জীবনে একেবারে কিছু না করার চাইতে কিছু একটা তো করা গেলো।

আজো একটা ভালো ছবি নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন তিনি। একজন নির্মাতার এটাই স্বপ্ন হয়ে থাকে। তবে সেই স্বপ্নের ছবি হয়তো তার তৈরী করা হয় না কখনও।

 

বিনোদন ডেস্ক

ছবিঃ সংগ্রহ                                               নির্মাতা শবনম ফেরদৌসীর সাক্ষাৎকারের কিছু অংশের ভিডিও লিংক দেওয়া হলো।