কবে বুঝব যে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে

স্নিগ্ধা চক্রবর্তী

(কলকাতা থেকে): আজকের এই ইন্টারনেটের যুগে আমরা সব কিছু যেমন অতি অল্প সময়ের মধ্যে জেনে যাচ্ছি আবার আমরা ক্রমশ reactionary হয়ে যাচ্ছি। প্রতিবাদ-ও তাই অনেক টাই সীমিত হয়ে যাচ্ছে সোশিয়াল মিডিয়া-তে। আমরা আবার আমাদের জীবনের হাসি, ঠাট্টা, আনন্দ, উপভোগের মধ্যে খুব তাড়াতাড়িই ফিরে যেতে পারছি। আসলে এই ক’দিন ধরে সোশিয়াল মিডিয়া এবং অনান্য মিডিয়া তে কলকাতার জি ডি বিড়লা স্কুলের শিশুর শিক্ষকের হাতে যৌন হেনস্তার শিকার হবার খবর শুনে এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা এবং প্রতিবাদের খবর দেখে এটাই বার বার মনে হচ্ছিল। ঘটনাটা যে নেক্কারজনক এবং এর বিচার হওয়া উচিত তাতে দ্বিমত নেই। কিন্তু আমরা কি এতদিন জানতাম না যে শিশুদের যৌন হেনস্তা/নির্যাতন আমাদের সমাজে, পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে (সামাজিক, শিক্ষা, রাজনৈতিক বা ধার্মিক) অহরহ ঘটছে? তার মধ্যে আবার অনেক শিশুই আছে প্রতিবন্ধী যারা আরোই অসহায়। এই আমরাই যখন আমাদের পরিবারের কোন শিশু পরিবারেরই কারোর কাছে যৌন হেনস্থার শিকার হয়, তখন শিশুকে বলে বুঝিয়ে চুপ করে থাকতে বলি এবং নিজেরাও চুপ করে যাই। কারন সমাজকে ভয়!!! আমাদের সেই বস্তা পচা চার দেওয়ালের মধ্যে গজিয়ে উঠা সম্মান তা হারনোর ভয়।
এই তো এই সেদিন আমরা সকলে #me too campaign এ হ্যাশট্যাগ করে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম যে আমরা প্রত্যেকেই জীবনে কখনো না কখনো যৌন হেনস্থার শিকার – যেটা এক অপ্রিয় সত্য! আশারাম, রাম রহিম নিয়ে তুলকালাম হয়ে গেল। গত ২০১২ সালের ৭ই মে, হরিয়ানার রোহতাক জেলায় আপনা ঘর আবাসিক হোমে তিনটি মেয়ে কি ভাবে পালিয়ে গিয়ে জানিয়েছিল যে কি ভাবে প্রতিটি টিন-এজার/শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। ওই প্রতিষ্ঠান খুব নামকরা প্রতিষ্ঠান ছিল। তার যিনি প্রধান তিনি এই মহৎ কাজের জন্য সরকার দ্বারা পুরস্কারও পেয়েছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবন্ধী হোমের খবরও আমরা অহরহ পাই।
শিশুদের যৌন নির্যাতন আমাদের দেশে ধারাবাহিক ভাবে সামাজিক/পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামোর মধ্যেই হয়ে আসছে। শিশুদের যৌন নির্যাতনের খবর জানতে চাইলে আমরা রোজ পাবো। ২০০৭ সালের ভারত সরকার দ্বারা ১২,৫০০ শিশু কে ১৩টি রাজ্যে এক সার্ভে শিশু যৌন নির্যাতনের এর ব্যাপকতা নিয়ে তথ্য সহকারে বলা হয়েছিল। শিশু যৌন নির্যাতন যারা করেন তাদের বেশীর ভাগ তাদের পরিচিত, আত্মীয় বা নিজের পরিবারের প্রাথমিক সদস্যের কেউ। অর্থাৎ যাকে সে সব থেকে বেশী বিশ্বাস করে তারাই অহরহ এই কাজ করে যাচ্ছেন। শুধু এর রকমফের আলাদা এবং নীরবে এই অপরাধ চালিয়ে যাওয়া যায় কারন শিশুরা তো প্রতিবাদ করতে পারবে না বা জানে না। তাই এই রকম ঘটনাকে পাশবিক বা এরা পশুর চেয়েও অধম এই সব তকমা দিয়ে বেঁধে দিয়ে এর বাড়বাড়ন্ত আটকানো যাবে না।
আজকে ২০১৭ সাল শেষ করে ২০১৮ তে আমরা পা দিচ্ছি। ২০১২-র ওই ঘটনার পর এই প্রতিবাদ কি চালিয়ে গেয়েছিলাম? আমরা যারা সেদিন শিউরে উঠেছিলাম, তারাই আবার আজকেও শিউরে উঠছি। আর কত কাল, আর কি হবার বাকি আছে যে এখনো আমরা বলতে পারছি না “ আমাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে!”
অভিবাবকরা প্রতিবাদ করবেন না কারন তাহলে সমাজে নিজের মুখ দেখানো যাবে না বা শিশু সঠিক নম্বর পাবে না বা প্রতিবাদ করে কি হবে এমন মানসিকতার শিকার তারা। তারা স্কুল ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কোন রকমের বিতর্কে যান না। পিটিএ নামক এক অলঙ্কার বিশেষ করে প্রাইভেট স্কুল গুলি তে আছে বটে কিন্তু তা শুধুই বাচ্চা কেন সঠিক নম্বর পাচ্ছে না, হোমওয়ার্ক করলো কি না বা কি কি নিয়ম ভঙ্গ এই সব আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ঠিক তেমনি শিক্ষক-শিক্ষিকারাও যারা একটু সচেতন, তারা অনেক কিছু জেনে ও বলেন না কারন তাহলে চাকরী রাখা দায় হবে বা তারাও আবার অন্য রকম হেনস্থার শিকার হবেন। পরিবারে শিশু যৌন হেনস্তার বিরুদ্ধে তো কোন আওয়াজই নেই। আইনী বিচার আর স্কুলে CCTV লাগিয়ে এবং নিরাপত্তার চেকলিষ্ঠ দিয়ে হয়ত দুই একটা ঘটনাই বন্ধ করতে পারা যাবে কিন্তু পরিবার, সমাজ আর রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সিস্টেমিক ভাবে হওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনকে বন্ধ করা যাবে না। এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে গেলে ধারবাহিকতা ও সাহস লাগবে। পিটিএ- কে শিশুর গঠনমূলক কাজে নামতে হবে। পাশাপাশি স্কুলে সেক্স এডুকেশন চালু করার প্রয়োজন। তেমনি লিঙ্গ-ভেদ বা এর অসমতা কি এবং কেন, এর ব্যাপকতা কত দূর, তা নিজেরা আগে বুঝুন এবং নিজের পরিবারে ছেলে এবং মেয়েকে এই শিক্ষা দিন ছোটবেলা থেকে। মেয়েদেরকে হাতে পুতুল না দিয়ে, সুন্দরী হবার নেশায় না গড়ে তুলে, ছোটবেলা থেকেই শারিরীক শিক্ষা (যেমন কারাটে, ফুটবল, ভলিবল, ইত্যদি)দেওয়ার দরকার। অভিবাবক দের বুঝতে হবে যে প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করলে খুব একটা ক্ষতি হবে না, ইঁদুর দৌড় থেকে এই শিশুদের রক্ষা করে ওদের আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী করে তুলুন।
এ লড়াই সমাজের তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর বিরুদ্ধে – যে কাঠামো সকলের সমান অধিকার এবং মর্যাদা দেয় না তার বিরুদ্ধে এবং এর জন্যে প্রতিদিন কাজ করে যেতে হবে। সমাজকে আর পরিবারকে ভয় না পেয়ে এর রীতি রেওয়াজ বা তথাকথিত সংস্কৃতি যা সমাজের নারী এবং পুরুষের সমতা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা, তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে – নিজেদের মুখোশ পরে থাকলে আর চলবে না। দেওয়ালে সত্যি-ই পিঠ ঠেকে গেছে – এবার আমরা যে মেরুদন্ডহীন নই এর পরিচয় দেবার সময়!

ছবি: গুগল