পাকিস্তানিরা আমাকে মারতে পারবে না। আমি মরবো না-কর্ণেল তাহের

বাংলাদেশের উত্তরে শেরপুর জেলার সীমান্ত গারো পাহাড়ের গা ঘেঁষে সীমান্তবর্তী কামালপুর শত্রুঘাঁটি। কামালপুর থেকে সোজা দক্ষিণে সড়ক চলে গেছে বকশীগঞ্জ হয়ে শেরপুরে। তাহের বললেন, এ সড়ক ধরে জামালপুর-টাঙ্গাইল হয়ে দ্রুততম সময়ে ঢাকায় পেঁৗছানো সম্ভব

কর্ণেল তাহের

ওয়াকিটকিতে যুদ্ধের খবর ভেসে আসছিল, যা শুরু হয়েছিল রাত ৩টা থেকে, অর্থাৎ ১৪ নভেম্বর। আমাদের তীব্র আক্রমণে পাকসেনাদের একজন মেজরসহ দুটি কোম্পানি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়

১৯৭১ সালের জুলাই মাস। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সান্ধ্য খবরে জানা গেল, পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্ত অতিক্রম করে চারজন বাঙালি সেনানায়ক ভারতে প্রবেশ করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। আমরা তখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছি। যদিও ইতিমধ্যেই দলে দলে বহু যুবক ভারতে চলে গেছে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। স্বাধীন বাংলা বেতারের খবরটি শুনে কেন জানি মনে হলো, সুদূর পশ্চিম পাকিস্তানের শিয়ালকোটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত আমাদের ভাই মেজর আবু তাহের নিশ্চয়ই সেই চারজনের মধ্যে আছেন। সে ভাবনার কারণও ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ারও বহু আগে থেকেই তাহের ভাই যখনই ছুটিতে দেশে আসতেন, তখনই আমাদের শেখাতেন গেরিলা যুদ্ধের নানা কৌশল, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির নানা বিষয়। বস্তুত ১৯৬৭ সাল থেকেই আমরা জানতাম, একটি প্রলম্বিত গেরিলা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হবে।
১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি সেনারা গণহত্যা শুরু করল, তখন থেকেই আমরা উন্মুখ হয়েছিলাম_ কখন আমরা মেজর তাহেরের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের খবরটি পাব। যদিও সে কাজটি ছিল খুবই দুরূহ এবং বিপজ্জনক। তারপরও পাকিস্তানের দুর্ধর্ষ এলিট কমান্ড বাহিনীর অত্যন্ত নামকরা সেনানী আমাদের এ ভাইটি যে সেই অসাধ্য কাজটি সম্ভব করবে, তা আমরা বিশ্বাস করতাম। জুলাই মাসের আগেই তাহের ভাই আমার আব্বা-আম্মাকে উদ্দেশ করে একটি চিঠিও পাঠিয়ে ছিলেন। ‘৭১-এর চিঠি সংকলন গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত সেই চিঠিতে সুকৌশলে তাহের ভাই আমাদের করণীয় সম্পর্কেও বলেছিলেন। আমাদের ধারণা সত্য প্রমাণিত হলো যখন এক রাতে চারজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা আমাদের গ্রামের বাড়িতে উপস্থিত হলেন। তারা এসেছেন আমাদের সবাইকে ১১ নম্বর সেক্টরে নিয়ে যেতে। যার অধিনায়কত্ব গ্রহণ করেছেন মেজর তাহের। সে যাত্রায় সেজভাবী লুৎফা তাহের ও আমাদের কয়েক ভাইবোন উত্তর সীমান্ত অতিক্রম করে মুক্তিযুদ্ধের ঘাঁটিতে পেঁৗছেছে। আমি যাই তার পরে আগস্টে। তাহের ভাই আমাকে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে অপারেশন অফিসারের দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন। আমার কাজ ছিল, অপারেশন কক্ষে বিভিন্ন যুদ্ধ-ম্যাপ সাজিয়ে রাখা, বিভিন্ন যুদ্ধ অভিযানে সেক্টর কমান্ডারের সঙ্গে থাকা এবং একটি বিরল সৌভাগ্য হিসেবে তার অস্ত্রটি বহন করা। আরও একটি কাজ ছিল, প্রতিদিন রাতে আমাদের ফিল্ড ওয়ারলেস ব্যবস্থার মাধ্যমে সিচুয়েশন রিপোর্ট প্রেরণ করা, যা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে বাংলার অবরুদ্ধ মানুষ জানতে পারত। সেসব রিপোর্টে থাকত আমাদের নানা অভিযানের কথা। শত্রু সৈন্যের হতাহতের কথা। যুদ্ধে বাঙালি গেরিলাদের অবিস্মরণীয় সাহস ও আত্মত্যাগের কথা। এসব রিপোর্টে যে নামটি বারবার উচ্চারিত হতো তা হলো কামালপুর শত্রুঘাঁটি। মনে পড়ে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে পেঁৗছার প্রথম দিনেই আমাদের অধিনায়ক মেজর তাহের অপারেশন কক্ষে একটি ম্যাপে কামালপুর শত্রুঘাঁটি দখলের গুরুত্ব আমাকে বুঝিয়ে ছিলেন। বাংলাদেশের উত্তরে শেরপুর জেলার সীমান্ত গারো পাহাড়ের গা ঘেঁষে সীমান্তবর্তী কামালপুর শত্রুঘাঁটি। কামালপুর থেকে সোজা দক্ষিণে সড়ক চলে গেছে বকশীগঞ্জ হয়ে শেরপুরে। কর্ণেল তাহের(তৎকালে মেজর) বললেন, এ সড়ক ধরে জামালপুর-টাঙ্গাইল হয়ে দ্রুততম সময়ে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব। তিনি আমাকে আরও জানালেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে যখন তিনি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের সদর দফতরে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল (পরে জেনারেল) ওসমানীর কাছে উপস্থিত হলেন, তখন তিনি গেরিলা সমরবিশারদ তাহেরকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সবক’টি সেক্টর ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে। তাহের প্রথমেই এসেছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের এই এলাকায়। তিনি বললেন, অন্যান্য সেক্টর পরিদর্শনে সময় নষ্ট না করে তিনি স্থির করেছিলেন, এখানে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে নেমে পড়বেন। সেভাবেই ১১ নম্বর সেক্টর গঠন এবং তাহেরকে এর অধিনায়কত্ব প্রদান করা হয়। বৃহত্তর ময়মনসিংহ ছাড়াও বৃহত্তর রংপুরের রৌমারী অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল এ সেক্টর। বস্তুত বাংলাদেশে এটাই ছিল সর্ববৃহৎ সেক্টর।
১১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের একেবারে শুরু থেকেই কামালপুর শত্রুঘাঁটির গুরুত্ব আমিও বুঝে ফেলি। পরে প্রখ্যাত মার্কিন সমরবিষয়ক সাংবাদিক অ্যান্ডারসন তার রিপোর্টে (যা অ্যান্ডারসন রিপোর্টে আছে) ঢাকার প্রবেশদ্বার হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। আগেই বলেছি তাহের ভাইয়ের কাছ থেকে প্রথম এ কথাটি শুনেছিলাম। এবারে কামালপুর শত্রুঘাঁটির ওপর একটি আক্রমণের বিবরণ দেব, যা তাহের ভাইয়ের জন্মদিন ১৪ নভেম্বর সংঘটিত হয়েছিল। সেই যুদ্ধের আগেও বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল শত্রুঘাঁটিতে। যেখানে বহু পাকিস্তানি সেনা হতাহতও হয়েছিল। বস্তুত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কামালপুর শত্রুঘাঁটিতে অবস্থানরত শত্রু বাহিনীর প্রতিনিয়ত অবিরাম গোলাগুলি চলতো। মহেন্দ্রগঞ্জে অবস্থিত আমাদের সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে কামালপুর শত্রুঘাঁটির দূরত্ব ছিল প্রায় ৮০০ গজ, যা ছিল শত্রু আর্টিলারি রেঞ্জের মধ্যে। তাহের ভাই ১৪ নভেম্বরকে বেছে নিয়েছিলেন কামালপুর শত্রুঘাঁটি দখল করে সেখানে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়াতে। সে পতাকাও তৈরি ছিল। তাহের জানতেন, সামনের ডিসেম্বরেই সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। বাংলাদেশের সব সীমান্ত থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যাবে ঢাকা অভিমুখে। পাকিস্তানিরাও সম্ভবত তা জানত। তাই তারা সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য প্রবেশপথগুলো বন্ধ করার জন্য সীমান্তে তাদের ঘাঁটিগুলোকে দুর্ভেদ্য করে গড়ে তোলায় মনোযোগ দেয়। তারা ব্যাপকভাবে কাঁটাতারের বেড়া ও মাইন ব্যবহার করে। ঘাঁটিগুলোর ভেতর মাটির নিচে মজবুত বাঙ্কার তৈরি করে তারা। যার ওপর ছিল উঁচু মাটির টিবি, যা তাদের কামানের ঘোলা থেকেও বাঁচাতে পারে।
বকশীগঞ্জে পাকিস্তানি অপর যুদ্ধঘাঁটি থেকে ১২০ মিমি মর্টারের গোলা তারা নিক্ষেপ করত নিজ ঘাঁটি কামালপুরের ওপর। সেখানকার শত্রুসেনারা মজবুত বাঙ্কারের ভেতরে থাকত বলে এই আক্রমণে তাদের কোনো ক্ষতি হতো না। অন্যদিকে কামালপুরের ওপর আক্রমণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষতি হতো।
তাহের বলেছিলেন, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে এ রণকৌশলের কথা চিন্তা করে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তা ব্যাপকভাবে কাজে লাগায়। ১৩ নভেম্বর রাতে মুক্তি বাহিনীর ৩টি কোম্পানি ক্যাপ্টেন মান্নান, সেকেন্ড লে. মিজান এবং আমার অপর ভাই আবু সাঈদের নেতৃত্বে কামালপুর যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেয়। সঙ্গে ছিল ভারতীয় ৯৫ মাউন্ট ব্রিগেডের দুটি কোম্পানি। পেছন থেকে ভারতীয় আর্টিলারিও আমাদের সাহায্য করে। ওয়াকিটকিতে যুদ্ধের খবর ভেসে আসছিল, যা শুরু হয়েছিল রাত ৩টা থেকে। অর্থাৎ ১৪ নভেম্বর। আমাদের তীব্র আক্রমণে পাকসেনাদের একজন মেজরসহ দুটি কোম্পানি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বকশীগঞ্জ থেকে অবরুদ্ধ পাকিস্তানিদের সাহায্যে এগিয়ে আসা একটি পাকিস্তানি কলাম ওতপেতে থাকা আমাদের এম্বুসে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ভোরের দিকে স্পষ্ট হয়ে এলো শত্রুঘাঁটির পতন আসন্ন। আমাদের একটি অগ্রবর্তী কোম্পানির অধিনায়ক, সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত সেকেন্ড লে. মিজানের খবর পাচ্ছিলেন না তাহের। তাই আমাদের দুই ভাই বাহার ও বেলাল আরও কয়েকজন স্কাউটকে সঙ্গে নিয়ে তাহের নিজেই এগিয়ে যান মিজানের খোঁজে। ওয়কিটকিতে শুনতে পাই তারা একটি বাঙ্কার দখল করেছেন। অগ্রবর্তী মুক্তিযোদ্ধা দলটিরও সন্ধান মিলেছে। পাকিস্তানিদের ছেড়ে যাওয়া একটি মেশিনগান পোস্ট থেকে গুলির চেইন অধিনায়ক তাহেরের গলায় পরানো হয়েছে জন্মদিনের উপহার হিসেবে। তারা সবাই শত্রুঘাঁটির দোরগোড়ায়। পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘাঁটি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে। বিভিন্ন অবস্থানের মুক্তিযোদ্ধারা জন্মদিনের অভিনন্দন বার্তা পাঠাচ্ছে ওয়ারলেস সেটে। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যেও একটা খুশির আমেজ আমিও টের পাচ্ছিলাম।
এর মধ্যেই সকাল হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই ওয়ারলেস সেটে বাহার বেলালের চিৎকার শুনলাম_ অধিনায়ক মারা গেছে। আমি ডালিয়াকে রেখে দৌড়ে চললাম। একটি ক্ষেতের বেড়ার ওপর শায়িত দেখলাম তাহেরকে। হাঁটুর ওপর থেকে তার বাম পাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শত্রুগোলার আঘাতে আহত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা ওই বেড়ার ওপর শুইয়ে প্রচণ্ড গোলাবৃষ্টির মধ্যেও তাকে টেনে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। আমি তার দিকে তাকালাম। প্রচুর রক্তক্ষরণে চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তারপরও তিনি হাসিটি ধরে রেখেছেন। পানি চাইলেন। আমি ফ্লাস্ক থেকে তার মুখে পানি দিতে চাইলাম, তিনি মাথা একটু উঁচু করে নিজের হাতেই পানির মগটি নিলেন। বললেন, আমার হাত তো ঠিক আছে। উদ্ধারকারী মুক্তিযোদ্ধাদের সারা শরীরে রক্ত। চিৎকার করে কাঁদছিল সবাই। তাহের বললেন, ‘তোমাদের আমি বলতাম না, পাকিস্তানিরা আমাকে মারতে পারবে না। আমি মরব না। তোমরা ফ্রন্টে ফিরে যাও। চারদিকে খবর পাঠাও আমার কিছুই হয়নি। আমি তোমাদের ছেড়ে হাসপাতাল যাচ্ছি; কিন্তু ফিরে এসে যেন দেখি কামালপুর দখল হয়েছে। আর ঢাকার রাস্তা পরিষ্কার।’ কান্না-শোক ভুলে আমরা তখনই এগিয়ে চললাম শত্রুঘাঁটি অভিমুখে।
অধিনায়কের আহত হওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাসপাতালে যাওয়ার কারণে সেদিন কামালপুর শত্রুঘাঁটি আর দখলে এলো না। কারণ ওয়ারলেস বার্তায় পাকিস্তানিরাও টের পেয়ে গিয়েছিল, তাহের আর যুদ্ধক্ষেত্রে নেই। তাই তারা আরও বিপুল সৈন্য পাঠিয়েছিল কামালপুর শত্রুঘাঁটিতে। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কামালপুর শত্রুঘাঁটি আমাদের দখলে এসেছিল। তখন সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

তথ্যসূত্রঃ লেখক :ড. আনোয়ার হোসেন,(অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় )

ছবিঃ গুগল