ইস্টেশনের রেলগাড়িটা…

কাকলী পৈত

(কলকাতা থেকে): উপেক্ষার মতো যন্ত্রণা আর অপেক্ষার মত বেদনা বুঝি আর নেই।একটি স্টেশনচত্বর কত উপেক্ষা, অপেক্ষা আর পাওয়া না পাওয়ার দোলাচলে দিনযাপন করে।
হুড়মুড় করে যাত্রীরা আসেন হাজার ব্যাস্ততা নিয়ে।হৈ-হৈ করে মাতিয়ে রাখেন স্টেশনচত্বর, ট্রেনের বগি।
কলহাস্যে, বেদনার অশ্রুজলে ভিজে, সমস্যার বোঝায়
বুক টনটন করা যন্ত্রণা নিয়ে উষ্ণতার উষ্ণীষ পরে আড়মোড়া ভেঙে  এগিয়ে চলে লৌহশকট।পেছনে পড়ে থাকে নিঃসঙ্গ স্টেশন।মানুষের জীবনের কত জমানো
কথা , কত সুখদুঃখের লেনদেন, কত দেশ বিদেশের কত প্রেম বিরহ ,কত বালক বিস্ময় কত অজানা গল্প ,বন্ধুত্ব
জমে ওঠে ট্রেনের কামরায়।মানুষের স্মৃতি আর কবি সাহিত্যিকদের মনস্চক্ষু ছাড়া আর কোথাও  তা ধরা পড়ে না।
গত শতকের পাঁচ এর দশকে যখন  এদেশে এই বিশালদেহী যন্ত্রশকট টি চালু হয় তখন কবিতায় লেখকদের মধ্যে তার নানারকম প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।
শোনা যায় বঙ্কিমচন্দ্র এই রেলগাড়িতে চড়ে তার বিবাহিত স্ত্রী কে নিয়ে কর্মক্ষেত্রে যাচ্ছিলেন। স্টেশনে তার সুন্দরী  স্ত্রীর আশপাশে ঘুরে বেড়ানো কোন যুবককে খুব বকাঝকা করেছিলেন।অন্যদিকে অক্ষয়কুমার দত্ত  ‘বাষ্পীয় রথারোহীদের প্রতি উপদেশ ও বাষ্পীয় রথারোহন বিধি ‘ নামে একটি বই লিখে ফেলেছিলেন।যাতে বাঙালি আনকোরা যাত্রীরা ট্রেনে চড়ার  ওঠানামার নানা বিধিনিষেধ গুলো জানতে পারেন। জর্জ স্টিফনসনের সেই বাষ্পীয় শকট প্রযুক্তিতে বহুদুর এগিয়ে গেলে ও অপেক্ষা আর উপেক্ষার সুর আজ ও বদলায়নি। অপু দুর্গার  ট্রেন আর ট্রেনলাইন দেখতে ছোটার অপার বিস্ময় আজ ও অনেক বালক বালিকার শৈশবে বর্তমান।কারণ ট্রেন কখনো অন্য সব যানবাহনের মত নয়।প্লাটফর্ম,রেললাইন,বগি,স্টেশন,যাত্রাপথ সব কিছুই স্বতন্ত্র, রোমাঞ্চভরা।
এদেশে ট্রেন চালু হবার পর থেকে বাংলা কবিতাতে নানাভাবে ট্রেনের কথা এসেছে। বিচিত্র মানুষের মত সেইসব ট্রেনকাব্য শতসহস্রমুখী জীবনচিত্র হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু কবিতায় ট্রেনের প্রসঙ্গএসেছে।  ‘ইস্টেশন,ফাঁকি,হঠাৎ দেখা,রাতের গাড়ি  এসব উল্লেখযোগ্য।কবি বলেন’ সকাল বিকাল ইস্টেশন আসি চেয়ে চেয়ে দেখতে ভালবাসি ‘।
হঠাৎ দেখা কবিতায় রবীন্দ্রনাথ এক বিরহী প্রেমিকের চিত্র রেলগাড়ির কামরায় খুব সুন্দর চিত্রকল্পের মধ্যে তুলে ধরেছেন।সাম্যবাদী কবি নজরুল ও কবিতায় ট্রেনকে বাদ দিতে পারেননি। জীবনানন্দের কবিতায় ট্রেনের উপস্থিতি একেবারেই নেই।ট্রেনের গতির সঙ্গে দু’পাশের গাছপালা ,ঘরবাড়ি,মাঠ,লালমেঘ,সবুজ ভুট্টার ক্ষেতে হরিয়াল সবটুকু দেখে নিতে বলেন কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।কারণ ‘সমস্ত পৃথিবী এসে   দাঁড়িয়েছে ট্রেনের জানালায়’।আল মাহমুদের কবিতায় দেখা যায় তিনি কিভাবে ট্রেন ফেল করে কুয়াশায় ভিজে ভিজে বাড়ি ফেরার বেদনায় মুহ্যমান।রবীন্দ্রনাথ মনে করেন মানুষ গাড়ি ফেল করে ‘শেষ মিনিটের দোষে’।এই অদ্ভুত অনুভূতিগুলো আজ আর নেই। ট্রেনের নিত্যযাত্রীদের অনেক ঝক্কি ঝামেলা অনেক অপেক্ষা, বিরক্তি অবসাদ ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়।
তবুও কিছু অন্যরকম, ভীড় ঠাসাঠাসি ট্রেনের কামরায়
জানালা দিয়ে কিছু অস্থির সৌন্দর্য, স্টেশনে স্টেশনে লোকজনের ওঠানামা ,গতিময়তায় এগিয়ে চলা ,এক অনন্য অনুভূতি। ফিরে দেখার সুযোগ নেই  কোথাও।

ছবি: গুগল