রানুর আকাশ

সুলতানা শিরীন সাজি

( অটোয়া থেকে): অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হচ্ছেনা। বিদেশ জীবনের অদ্ভুত কিছু নিয়ম আছে। আমরা যারা প্রথম জেনারেশন প্রবাসী মানুষ , জীবন যেমনি চলুক ,কিছু সেভিংস করি শুধু দেশে যাবার চিন্তায়। আমাদের সন্তানদের সেই চিন্তা নেই। ওরা যতদিন ছোট থাকে,বাবামায়ের সাথে দেশে যায়। হাইস্কুলে ওঠার পর বন্ধ হয়ে যায় এই যাওয়া।এর পর ইউনিভার্সিটি।এরপর কাজের জীবন।

ইচ্ছা ছিল রাশীক এর ইউনিভার্সিটি শেষ হলে মা আর ছেলে মিলে দেশে যাবো। আমার মায়ের কাছে যাবো আমি। রাশীক ওর স্মৃতির জায়গাগুলো ঘুরবে। এবং তা অবশ্যই লালমনিরহাটে। ঢাকায় দাদাবাড়ির মানুষ গুলো ছাড়া ঢাকা শহরের তেমন কোন স্মৃতি ওর মনে নেই। ও কে বলছিলাম তোর জন্য লালমনিরহাট থেকে একটা বউ খুজবো,শুনে ও হেসেই অস্থির। রাইয়ান এর বাংলাদেশ এর কিছু মনে নেই। খুব ছোট্ট ছিল। তবে ও খুব যেতে চাইছিল নানীকে দেখতে।

দুই ছেলে ও বরের সঙ্গে

রাশীক এখনো কোন তরকারী রান্না করলে বলে, মামমা এই গন্ধটা নানীবাড়িতে পেতাম।
আমাদের থানাপাড়ার সেই বাড়িটায় রাশীক গেছিল যখন, কত ছোট ছিল,অথচ কি জানি গল্প শুনে নাকি ছবি দেখে অনেক স্মৃতিচারণ করে।ভাইজান কোথা থেকে একটা বানরওয়ালা ধরে এনে ,ওকে বানরখেলা দেখিয়েছিল।ভাবী রুগীর সিজারিয়ান করার সময় দাঁড়িয়ে দেখেছিল বলে ভাইজান রাশীক কে সাহসীকতার জন্য টাকা দিয়েছিল আর বলেছিল দেখিস ও ডাক্তার হবে। নাহ রাশীক গ্রেড ইলেভেন এ বুঝে ফেলে ওর ডাক্তার হওয়া হবেনা। রক্ত দেখলে ওর মাথা ঘুরতো।

রাশীক এর সাথে দেশে যাওয়া আর হলোনা। মা চলে যাবার পর দেশের যাবার প্রত্যাশা যেনো চোখের দৃশ্যপট ,মনের দৃশ্যপট থেকে এক লহমায় আরো দূর সরে গেলো। এমন যে হয়,এমন যে হবে কখনো ভাবিনি। হয়েছে।
গত দশটা মাস প্রতিদিন উপলদ্ধি করেছি, মাথার উপর রাখা সার্বক্ষনীক হাতটা যেনো কোথায় হারিয়ে গেছে। প্রার্থনায় কতবার যে বলে ফেলি ,মায়ের শরীর ভালো রেখো।
চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। কেঁদে মন হালকা হয় ভেবে কাঁদি। কিন্তু মন ভারী হয়েই থাকে।

রাশীক ক্রিসমাসের ছুটিতে বন্ধুদের সাথে জাপানে বেড়াতে যাবে। দিন গোনে। ওর ছোটবেলার স্বপ্নের দেশ জাপান এ যাবে ও। আমি বসে বসে ওর গল্প শুনি। কোন ট্রেন এ করে কোথায় যাবে। ইন্টারনেট এর সুবাদে সব কিছু ঠিকঠাক। দুইদিন আগেই বলছিল তুমি আর বাবা কোথাও ঘুরে আসো। বললাম,তুই আগে ঘুরে আয় ।তারপর দেখা যাবে।

শীত এসে গেছে। রাস্তায় বেশিক্ষন হাঁটা যায়না। তবু মাঝে মাঝে হাঁটতে থাকি। ঠান্ডা বাতাসে চোখে পানি এসে যায়। Ogilvie ধরে সোজা যেয়ে Aviation parkway তে বায়ে গেলে Montreal Rd পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার পথ আছে। দুই পাশে অজস্র গাছ। বেশিরভাগই ম্যাপেল। ম্যাপেলেই যে কত রকম আছে। যদিও এখন পাতাহীন বেশিরভাগই গাছ।শুধু পাইন ছাড়া।কত রকম যে পাইন গাছে আছে !

মায়ের সঙ্গে সাজি

হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় পথের শেষ যদি আমাদের মিশন মোড় এ হতো। ছুটতে ছুটতে দোয়েল নাম এর বাড়িটায় যেতাম। মা চারতলার জানালায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমি ছুটতে ছুটতে উপরে উঠতাম আর হাফাতে হাফাতে ভাইজানকে বলতাম , সোনালী পার্কে একটা একতলা বাড়ি বানাতে। আমরা সবাই ওখানে থাকবো একসাথে। ছোটবেলার মত।ভাইজান,ভাবী ,আপা, আপু ,তিবুদা ,আমি আর রাশীকের বাবা। ছেলেমেয়েরা যে যেখানে আছে থাকুক,ওরা মাঝে মাঝে দেখে যাবে আমাদের।
একদম কানাডার বাড়ি গুলোর মত খুব কমপ্যাক্ট। আমরা সবাই সবার খুব কাছে থাকবো।
সেদিনই আপা বলছিল ,চারতলায় উঠতে আজকাল ভাইজান হাফিয়ে যায় রে। বোনরা যেভাবে ভাইদের দেখে, ভালোবাসে। সারাজীবন ধরে মায়ার চোখ পড়ে থাকে। ভাই রা কি ওভাবে দেখে?
কি জানি!

প্রথম কানাডা আসার পর সবাই অনেক চিঠি লিখতো। চিঠি থেকে ফোন এর পর ই-মেইল ,এরপর স্কাইপ,ফেইসটাইম,ফেইসবুব মেসেঞ্জার ,আরো কতকিছু!
কিন্তু যোগাযোগ গুলো যেনো হালকা থেকে হালকা হয়ে মিশে যাচ্ছে।
ভুলে যাচ্ছি কত কিছু। স্মৃতিভ্রষ্ট হবার অনেক কষ্ট। অন্ততঃ কাছের মানুষ গুলোকে এত মনে পড়ে এত। তবে বয়স যত বাড়ছে। অভিমান ও বাড়ছে। রাশীকের বাবা প্রায়ই বলে , কথা বলোনা কেনো। যে কথা সারাজীবন ধরে আমি ওকে বলেছি, ফোন নং ঘুরিয়ে হাতে দিয়ে বলেছি ,কথা বলো। আজ আমার কথাই ও আজ আমাকে বলে।
বলি ইচ্ছা করেনা।

মা,ভাই,বোনের সঙ্গে

ও অবাক হয়ে যায়। আমি ওর সামনে থেকে সরে যাই।
বলতে ইচ্ছা করে আমারো খুব ইচ্ছা করে , আমার খোঁজ নিক তারা।
বলুক,কেমন আছিস সাজি? আর আমি কাবুলিওয়ালার মিনির মত অনেক অনেক কথা বলি। বলি আমার রাশীক রাইয়ান এর কথা। বলি,শীত এসে গেছে। সামনের বাড়িতে কি সুন্দর লাইট লাগিয়েছে।বলি এই প্রথম আমার এক বন্ধুর, রাইয়ানকে দেয়া উপহার, একটা ক্রীসমাস ট্রী সাজিয়েছি ঘরে। রাইয়ান এর পছন্দের স্টার আর অনেক সুন্দর ক্রীসমাস ট্রী garland আর ornaments কিনেছি লাগানোর জন্য। বলি, আজ কি কি রান্না করেছি। আমার বন্ধুদের কথা বলি। আনন্দর কথা বলি। দুঃখ বলি। বলি, আমাদের এখানে কয়েকটা কাঠবিড়ালী আছে,যাদের বলি,রাশীকের বাবার বান্ধবী। রাশীকের বাবাকে দরজার কাছে দেখলে ওরা ছুটতে ছুটতে আসে। আর ও ওদের বাদাম দেয়। একদম পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়ে ওরা বাদাম খায়।

ভাইজান অনেক বছর আগে একটা চিঠিতে লিখেছিল ,তোরা হচ্ছিস Lost Generation.
২৫ বছর পার হয়ে গেলো। জানিনা আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছি! আসলেই কি হারিয়ে গেছি?
শুধু বলতে পারি,তোমরা আছো আমাদের সাথেই। আমার রাশীকের মুখের দিকে তাকিয়ে ভাইজান এর মুখ দেখি। রাইয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে আপুকে দেখি।কখনো ওর হাসিতে দেখি আপাকে। সারাজীবন শোনা বাবার মত দেখতে নিজের কপালের দিকে তাকিয়ে মাকে দেখি।
অথচ,
আমিই শুধু নেই। কোথাও কোনখানে!

ছবি:লেখকের ফেইসবুক থেকে।