কেমন করে ভুলে যাবো মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী

লীনা পারভীন

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমার আব্বারা তিনভাই ছিলেন। একদম বড় জ্যাঠার নাম ছিলো আব্দুল মতিন মজুমদার। তিনি কুমিল্লা ওয়াপদায় চাকরী করতেন। শ্রমিক নেতা ছিলেন। তিনি আর শ্রমিক নেতা আবুল বাশার একসঙ্গেই নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে আমার জ্যাঠা চলে গেলেন ইন্ডিয়ায়। সেখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন কুমিল্লা অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের দলে। ময়দান থেকে যুদ্ধ শেষে ফিরেও এসেছিলেন। আমার জ্যাঠার সবচেয়ে কাছের এবং বিশ্বাসের ছিলো তাঁরই এক ভাতিজা। নিজের ছেলে ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলো ছোট বয়সে। নাম রেখেছিলেন আজাদ। এই আজাদ নামের পিছনেও ছিলো উনার চেতনার প্রকাশ। ছেলেকে হারিয়ে তিন মেয়েকে নয় হাতের লাঠি করে নিয়েছিলেন সেই ভাতিজাকে আর সেই ভাতিজাকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু হৃদিয়বিদারক ঘটনা হচ্ছে আমার চাচা ফিরে এসে যখন স্বাভাবিক জীবনে পা দিচ্ছিলেন ঠিক সেই সময়েই তাঁর সেই হাতের লাঠি মুক্তিযোদ্ধা ভাতিজা হয়ে গেলো বিশ্বাসঘাতক। এক কালোরাতে ভাতিজার কাক্কু ডাক শুনে আমার ঘুমন্ত জ্যাঠা হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলে বেড়িয়ে এলেন। দেখলেন ভাতিজার সঙ্গে আরও দুইজন চাঁদর মোড়ানো অবস্থায়। সম্ভবত শীতের রাত ছিলো। বিজয়ের কয়েকদিন পরের এই ঘটনা। ভেবেছিলেন ভাতিজা কোন বিপদে কি না। তাছাড়া তিনি শ্রমিক নেতা হিসাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় এমন রাত বিরাতে গ্রামের অনেকেই আসতেন সমস্যা নিয়ে। তিনি হয়তো ঘুনাক্ষরেও ভাবতে পারেন নি তাঁরই আদরের ভাতিজাই হতে পারে তাঁর ঘাতক।

বারান্দায় ডেকে নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে প্রাপ্ত সেই অস্ত্র দিয়ে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিলো আমার বড় জ্যাঠার বুক। হাতে গোনা তিন/চারটা বুলেটের গর্ত এখনও সেই ঘরের বারান্দায় রয়ে গেছে। আমরা বুঝতে শিখে সেটা হাত দিয়ে ধরে ধরে হারানো জ্যাঠার অস্তিত্বকে অনুভব করতে চাইতাম আর খুনীর বিরুদ্ধে জমে উঠতো ক্ষোভ। সেই থেকে পলাতক ছিলো আমার সেই খুনী চাচাতো ভাই। এখনও সেই পরিবারের সঙ্গে আমরা স্বাভাবিক হতে পারিনি। জীবনে একদিন মাত্র দেখেছিলাম তাকে সেটাও অনেক বছর পর কোন এক কারণে সে বাড়ীতে গিয়েছিলো কিন্তু ঘর থেকে বের হয়নি। আমার দাদার বংশে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তিনজন। এর মধ্যে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কোন বিবেকে রাজাকার হয়েছিলো সেই হিসাব আমরা আজও পাইনি। তিনি অবশ্য বাড়ীর বাইরেই থাকেন। গ্রামে যান না বা যাবার সাহস পান না এখনও পর্যন্ত। এমনিতে রাজনীতি করা ছেলে সবসময় বাইরে বাইরেই থাকতো জ্যাঠা। আদরের বড় ছেলেকে হারানোর শোকে শেষ বয়সে আমার দাদী স্মৃতিভ্রস্ট হয়ে গিয়েছিলেন। দাদাও শোকে তাপে আগেই চলে গিয়েছিলেন দুনিয়া ছেড়ে। দাদাকে দেখার সৌভাগ্য না হলেও দাদীকে সামান্য মনে আছে। কিন্তু সেই স্মৃতি বড় বেদনার। তিনি কাউকেই চিনতেন না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজে নিজেই কথা বলতেন। দাদীর আদর পাইনি কখনও।

আমি নিশ্চিত এমন ঘটনা বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পাওয়া যাবে। সেই জ্যাঠা ছিলেন আমার দাদার পরে গ্রামের মাথা। সেই মাথাকে হারানোর ক্ষতি আমাদের পরিবার বা গ্রাম আজও পূরণ করতে পারে নি। তাই আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে আমার জ্যাঠাকে হারানো ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া পরিবার। আমার বাবার চোখেমুখে শোক। আমার বড় জেঠির অল্পবয়সে তিনটি মেয়ে নিয়ে গ্রামে অপদস্ত হবার কাহিনী। আপন রক্তের বেঈমান হয়ে যাওয়ার কাহিনী। চোখে না দেখলেও বুঝতে পারি মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানীরা আর তাদের দোসরেরা এমন করেই ধ্বংস করে দিয়েছিলো একেকটি পরিবারকে। কেমন করে ক্ষমা করবো তাদের? কেমন করে ভুলে যাবো মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী? কেমন করে ভুলে যাবো পাকিস্তানীদের আর তাদের এদেশীর রাজাকার বন্ধুদের? অসম্ভব। তাই আমি এই একটা প্রশ্নে কারও কাছে মাথা নত করি না, পারবো না। যে যাই বলুক, আমি আপোষহীন।

ছবি: গুগল