আমাদের বাড়ী…

লুতফুন নাহার লতা

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আমি তখন ১৩। ছোট বোনের সঙ্গে।

বেশ আগের কথা বলছি! তখন খুলনা শহর ছিল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রান কেন্দ্র। বাগেরহাট, মোল্লার হাট, রামপাল, গোপালগঞ্জ, তেরখাদা এদিকে – যশোর, সাতক্ষীরা এসব জায়গা থেকে চাকুরী উপলক্ষে খুলনায় লোক সমাগম ছিল অনেক। আমার বাবা মা, তাদের মিলিত জীবনের শুরুতে ভাড়া থাকতেন খুলনার প্রখ্যাত জাঁদরেল উকিল এবং ব্যবসায়ী সায়েম কাজীর বাড়ীতে। খুলনা থেকে মাত্র দশ মাইল দূরে আমার নানাবাড়ী ও দাদাবাড়ীর দুটি গ্রামই তৎকালীন সময়ের হিন্দু অধ্যুষিত উন্নত সুন্দর গ্রাম ছিল। স্কুল, কলেজ, থানা, সরকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্র সবই ছিল সে গ্রামে তবু বাবা কর্মোপলক্ষ্যে খুলনায় চলে এলেন।
একদিন সায়েম কাজী সাহেব মধ্যাহ্ন ভোজের পরে ভাত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটল নির্জন পুকুরে আমার মায়ের সাঁতরানোর শব্দে। রাগে তিনি বন্দুক নিয়ে ছুটে এলেন, এই অসময়ে পুকুরে নেমেছে কে! আমার মা তখন মাত্র ১৮ /১৯ বছরের ছিপছিপে গড়নের সুন্দরী এক মেয়ে, সারা গায়ে তার কাঁচা সোনার আভা! মাকে দেখে সায়েম কাজীর বন্দুক তো থামল কিন্তু মেজাজ গেলো আরো চড়ে, ‘কী আমার ভাড়াটিয়া বউয়ের এতো সাহস আমার পুকুরে সাঁতার কাটে! ঘর ভাড়া দিয়েছি মেয়ে পুকুর ভাড়া দেই নি কো !’ মা তো ভয়ে ভয়ে বাড়ীর অন্য মা চাচীদের সহায়তায় উঠে এলেন কিন্তু সেই দিন থেকে আমার বাবাকে সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন ভাড়া বাড়িতে আর তিনি থাকবেন না!
আমার বাবা চিরকালের শান্ত শিষ্ট, পড়ুয়া গোছের মানুষ। তেমন বৈষয়িক না বলে আজীবন অভাবের সাথে লড়েছেন। তিনি মনে মনে পরমাদ গুনলেন! দু’একদিন পরে মা আড়ঙের মেলায় গিয়ে কিনে আনলেন মাটির ভাঁড়ের ব্যাংক। সেই ব্যাংকে প্রতিদিন কিছু খুচরা পয়সা আমার মায়ের অনেক বড় স্বপ্ন হয়ে টুপটাপ পড়তে থাকল। সংসারের নানা দিকের খরচ কমিয়ে, নিজের সখের কিছুই না কিনে, একবেলার খরচে দুই বেলা চালিয়ে মা টাকা জমাতে লাগলেন।
আরো কিছুদিন পরে মা উকিল সাহেবকে গিয়ে বললেন ‘ বাবা আমার কাছে কিছু টাকা জমেছে, আপনি আমাকে একটু জমি কিনে দেন। কড়া উকিল সাহেব আমার মাকে দিলেন এক ধমক – ‘মেয়ে তোমার আক্কেল আছে? বাড়ী কিনতে কি লাগে জানো! পাগল আর কাকে বলে!’ মা তবু তাঁকে ছাড়ে না, অবশেষে তার এক বন্ধু নাজির হোসেনকে ডেকে বললেন টুটপাড়ায় খোলা জায়গা টায়গা থাকলে এই জেদী মেয়েটাকে দেখাও। উকিল নানার কথায়, আমাদের নাজির নানা মা’কে জায়গা দেখাতে শুরু করলেন। টুটপাড়া কবরখানার সামনে জায়গা দেখান হল, মা বেঁকে বসলেন, কবরখানার সামনে বাড়ী! নাহ কিছুতেই না। সকাল বিকেল এই জীবন মৃত্যুর পালা দেখতে রাজী হলেন না মা। অবশেষে সরকার পাড়া রোডে এসে বাড়ীর সামনে খোলা মাঠ দেখে মা’র বেশ পছন্দ হল। একসাথে অনেক জমি কিন্তু টাকা! মার মাটির ব্যাংকে মাত্র ৩০০ টাকা। টাকা পয়সা ধারটার করে প্রথমে মাত্র তিন কাঠা জমি কেনা হল। উকিল সাহেব মাকে টাকা ধার দিলেন, সেই উকিল সাহেব!
এই সব গল্প মায়ের কাছে কত শতবার যে শুনেছি তার শেষ নেই। বলতে বলতে মা থামতেন, আর মনে হত তাঁর চোখ ভেসে যেত স্মৃতির জ্যোৎস্নায়।

আমার কাকিমা,আমার মা।

বাড়ী কিনে মা বাড়ীতে উঠলেন, মায়ের পেটে আমার বয়স চারমাস। নতুন ঘর তোলা হল, উঠোন লেপা হল, চারিদিকে গাছ লাগিয়ে বাড়ীর দেয়ালের কাজ হল, নতুন বাড়ীতে আরো কয়েক মাস পরে তখন খুলনা শহরের একমাত্র মহিলা ডাক্তার শামসুন নাহার আর নার্স কুঞ্জবালার হাতে এক কালীপূজোর রাতে আমার জন্ম হল।
বাড়ীতে তখন বাবার বন্ধু সাতক্ষীরার সোরমান কাকা। যিনি ভালোবেসে হিন্দু ধর্মের মেয়ে বিয়ে করেছেন বলে বাড়ী থেকে বিতাড়িত হয়ে এসে আমাদের বাড়ীতে থাকতেন। জন্মলগ্নেই আমার মায়া কাকীমা আমায় কোলে নিয়ে নাম দিলেন অঞ্জলি। আমার নানী, আমার খালা, আমার নানীর বোন আমার সেজবু, আর তার স্বামী ফকির আব্দুর রহমান, আমার ফকির নানা, আমার মায়ের মামাতো খালাতো ভাই বোনেরা, আমার সালেহা খালা আর হাজেরা খালা-ওদের সবার আদরে ওই বাড়ীর ধুলো মাটি কিছু খেয়ে কিছু গায়ে মাথায় মেখে আমি বড় হলাম!
আমার নাম কিন্তু সেই অঞ্জলি আর রইল না। পাড়ার লোকের কথায় হিন্দুয়ানী নাম হয়ে যাবে সেই ভয়ে বদলে গেল আমার নাম। কিন্তু আমার মায়া কাকীমা তা কিছুতেই মানলেন না! বড় হয়ে শুনেছি তাঁর দেয়া নাম রাখা হল না বলে তিনি অনেক কেঁদেছিলেন তবে তিনিও হেরে যাবার পাত্রী নন, আর তাই আমি ছিলাম চিরদিন আমার মায়া কাকীমার অতি আদরের অঞ্জলি। আমার নাম বদলে গিয়ে মা খালার নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে নাম হল। সেই নামের সাথে আদর সোহাগ মাখামাখি হয়ে তা লুতু হয়ে উঠল। লুতু মানেই ছিঁচকাঁদুনী, নাটুকে, মায়াবতী, চঞ্চলা, কবিতা গানে ভরপুর আর পড়াশোনায় একটু আধটু ভালো মেয়েটির কথা ভাবে সবাই, কিন্তু আসলে সে ছিল বোকা। আবেগের মানুষ। পাগল মানুষ।

আমার নানী

একবার পাড়ায় চোর ধরা পড়েছে , পাড়ার ছেলেরা তাকে বেদম পিটুনি দিচ্ছে, তাই দেখে এমন কান্না জুড়ে দিলাম, রাস্তায় গড়াগড়ি কান্না, চিৎকার শুনে বাবার দুপুরের ঘুম ভেঙ্গে গেল, পাড়ার ছেলেরা ভাবল চোর পেটানোর চেয়ে আরো ভয়ংকর কিছু ঘটেছে! কেঁদে কেটে বাবাকে দিয়ে চোর ছাড়ান গেলো কিন্তু চোরের গায়ে জামা নেই, পেটে খাবার নেই তার ব্যাবস্থা করতে মার সাহায্য প্রয়োজন হল। আবার একদফা কান্না জুড়ে দিলাম, যাহোক মা সে যাত্রা চোরকে ভাত খাইয়ে আর আমার দাদার গায়ের পুরনো জামা দিয়ে বিদায় করেছিলেন।
তা ঐ যে বললাম, আদরে আহ্লাদে সেই লুতু আমার চিরকালের বাড়ীর নাম হয়ে গেল। আমি মোটেই এই নাম পছন্দ করতাম না। কাউকে নাম বলতে লজ্জা পেতাম খুব, আর মা বলতেন এমন মধুর নাম নাকি আর হয় না। মা যখন ডাকতেন, তখন নামের সাথে একটি অ যুক্ত হয়ে তাঁর কন্ঠের সোহাগ ঝরে পড়ত।
( কতদিন সেই ডাক শুনিনি – অ লুতু! অ মা! বলে আর কেউ ডাকবে না কোনদিন )
আমার জেদী মা কিন্তু ঠিকই একটু একটু করে পুরো জমিটাই কিনেছিলেন, তবে তা আস্তে আস্তে আরো পরে। আমার নানী ওই বাড়ীর একধারে বেশ বড় সড় শব্জীর বাগান করেছিলেন আর এক ধারে আম, জাম , করমচা, কামরাঙা আর বেত গাছ লাগিয়ে ছিলেন। বাবার চাকরী উপলক্ষে আমরা তখন থাকতাম সাতক্ষীরা কালিগঞ্জে। একবার বাড়ীতে এসে দেখি আমাদের বাগান ভর্তি কাওনের ধান লাগান হয়েছে। সেই প্রথম দেখলাম কাওন নামে এক ধরনের দীর্ঘ ঝাড়ের মাথায় গোল গোল সাবুদানার মত ধান হয়। ভাঙানোর পরে সেই গোল গোল চালের পায়েস রাঁধতেন আমার নানী।
যত দিন বেঁচে ছিলেন, মা ঐ বাড়ী ছেড়ে কোথাও যেতে চাইতেন না। উৎসবে, পালা পার্বনে আমরাই যেতাম খুলনায়। ডাক্তার দেখাতে হলেও ঢাকায় তাঁকে আনার জন্যে আমার ভাই মানিককে নানা রকম ফন্দি ফিকির করতে হত। যেমন ‘ মা তোমারে দেখতে ইচ্ছে করছে কিন্তু অফিস থেকে ছুটি দেবে না, অথবা তোমার হাতের রান্না খাই না কতদিন।’ মা আসতেন , কিন্তু এসেই বলতেন যাই!
২০১০ এ মা চলে গেলেন কিন্তু তাঁর মধুর স্মৃতি মাখা আমাদের ওই বাড়ী তার নীরব আগমনের আকাঙ্ক্ষায় প্রহর জাগে। পশ্চিমের নিম গাছটা আঙুরের মত জলসবুজ রঙের ফল বুকে নিয়ে শাখা দোলায়। দক্ষিণ পশ্চিম কোনায় পাঁচিল ঘেঁষে সজনের ফুল ঝরে পড়ে। ওদের গায়ে গায়ে মা হাত বুলতেন। বাবা যখন দেহ রাখলেন, ধীরে ধীরে আমরা যখন বাড়ী ছেলে সবাই চলে এলাম, মা একা একা বাড়িময় হেটে বেড়াতেন, বাড়ীর বুকের তলায় কান পেতে কি মা’র সেই দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় না! আমি হাজার হাজার মাইল দূর থেকেও ঘোরের মধ্যে দেখি মা’র নরম সুন্দর পা দুখানি আমাদের সারা বাড়ীর মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মা’কে দেখি আমি আমার অন্তরলোকে। আমার সকল প্রভাতের প্রথম আলোয়।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে