চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে…

নারীর চুল আর চোখের গভীরতায় যুগ যুগ ধরে ডুবেছে পুরুষের মন। এই সুন্দরের হাতছানি ইতিহাসের পাতায় রেখেছে রক্তচিহ্ন, ডুবেছে হাজার রণতরী, পতন ঘটিয়েছে সাম্রাজ্যের। কিন্তু নারীর পদযুগল? সে নিয়েও তো স্তুতিবাক্যের শেষ নেই। এখনকার পৃথিবীতে সৌন্দর্যের কারবারীরা বলছেন, রূপের হাটে এগিয়ে আছে নারীর পা।

পা নিয়ে আলোচনা নারীর পদযুগল দিয়েই সূচনা করলাম। কারণ দুনিয়া জুড়ে পুরুষের পা নিয়ে তো তেমন কোনো বন্দনা শুনতে পাওয়া যায় না। তবে পা নানা কারণেই গুরুত্ব বহন করে। গবেষকরা বলছেন, মানুষের মুখ যেমন তার মনের আয়না হিসেবে কাজ করে তেমনি নারী পুরুষ নির্বিশেষে পা শরীর আর মনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশে ভূমিকা রাখে। পায়েরও ভাষা আছে। দাঁড়ানো অথবা চলার ভঙ্গীর মাঝে সে ভাষা প্রকাশিত হয়।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন পদযুগলের নানা কথা নিয়ে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর হৈমন্তী গল্পে পায়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘‘বাঁকা পাড়ের নিচেকার দু’খানি খালি পা আমার হৃদয়কে আপন পদ্মাসন করিয়া লইল’’। গানে লিখেছেন ‘‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে, নিও না সরায়ে’’। তাহলে বলা যেতে পারে পায়ের সঙ্গে ভালোবাসারও একটা সম্পর্ক আছে। শ্রী চরণ বলে কথা। মনোবিজ্ঞানের গবেষকরা বলছেন, প্রেম নিবেদন করার সময়ে যদি একটি মেয়ে দুই পা এক না করে রেখে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখে (প্রসারিত করে রাখে) তাহলে বুঝতে হবে প্রণয় প্রস্তাবে তার সম্মতি আছে। কিন্তু যদি সে নিবেদনের সময় পা ক্রস করে বসে বা দাঁড়ায়, সেই মেয়ের আশা ছেড়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। গবেষণা বলছে এভাবে পা ক্রস করে দাঁড়ানোর পেছনে অবচেতন মনের ভাবনা হচেছ সে প্রেমিককে খোলা মনে গ্রহণ করতে পারছে না। অনেক সময় এরকম অবস্থানে বসা বা দাঁড়ানোর সময় মেয়েরা বুকের উপর দুই হাত জড়ো করে রাখে। গবেষকরা বলছেন, এ ধরণের পজিশন বা ভঙ্গীকে তারা বলছেন ‘রক্ষণাত্নক ভঙ্গী’। এতে বুঝে নিতে হবে তার মনের মধ্যে দ্বিতীয় কোনো চিন্তা আছে। শুধু ভালোবাসা নয় পায়ের নানা ভঙ্গিমা আর মানুষের মনের বিচিত্র ভাবনার প্রকাশ নিয়েও গবেষণায় কাঠখড় কম পোড়াননি মনোচিকিৎসকরা।

দু’পায়ের প্রাণীদের মধ্যে অট্রিচ অন্যতম দ্রুত গতির। মানুষও দু’পায়ের। আর আমাদের পরিচিত প্রাণী গরু,ছাগল,ভেড়া,বাঘ,সিংহ ইত্যাদি চার পায়ের। অর্থোপোডদের ভেতর ৪,৬ জোড়া পা দেখা যায়। আর কীটদের ভেতর ৮,১২ ,১৪ জোড়া পা দেখা যায়। শতপদী এবং সহস্র পদী পা বিশিষ্ট কীটও দেখা যায়। মানবদেহে হাঁটুর নিচ থেকে পা এর শুরু।পা হাড় মাংশ আর চামড়ার সমন্বয়ে গঠিত।দু’পায়ের প্রাণী ব্যতিত অন্যান্য প্রাণীদের সামনের পা হাতের মতও কাজ করে। সাধারণ ভাবে পা এর কথা উঠলে আমরা মানব দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকেই বুঝি। সাধারণত মায়ের গর্ভে থাকাকালীন ১০ সপ্তাহের ভেতরই শিশুর পা পূর্নাঙ্গতা পেয়ে যায়। পা মানুষ ও অন্য প্রাণীদের বেলায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পাদন করে। পা শরীরের ভার বহন করে।

আচ্ছা, মানুষের পা নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের এতো চিন্তার কারণ কি? উত্তর একটাই, মানুষ তার মনের ভাব লুকাতে মুখের প্রতিক্রিয়ার ওপর পর্দা টেনে দিতে পারে, কিন্তু পা-ও যে তার মনের ভাব বলে দিতে পারে সেটা মানুষের মনেই থাকে না। পা মানুষ প্রধানত দুটি কাজে ব্যবহার করে। নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে অথবা সম্ভাব্য বিপদ থেকে ছুটে পালাতে। কিন্তু এর বাইরেও মানুষের পা আরো কিছু কাজ করে। যখন কোনো নারী অথবা পুরুষ দুই পা ফাঁক রেখে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় তখন ধরে নিতে হয় সে তার কাজের জায়গায় কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতেই এসেছে। এ ধরণের দাঁড়ানোর ভঙ্গী সাধারণত আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাঝেই দেখা যায়। অনেক সময় পুরুষদের দেখা যায় এক পা সামান্য ভাঁজ করে দেহের মাঝের অংশকে সামান্য এগিয়ে দিয়ে দাঁড়াতে। গবেষকরা বলছেন পায়ের এ ধরণের ভঙ্গী বলে দেয় সেই পুরুষ নিজের ভেতরের ‘টাফ গাই’ অবয়বকেই প্রকাশ করতে চায়।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে নারী অথবা পুরুষ এক পা সামনে এগিয়ে অন্য পা পেছনে রেখে দাঁড়ায়। এই ভঙ্গীটি বলে দেয় সে কোনো জায়গা থেকে বিদায় নিতে চাচ্ছে। সেক্ষেত্রে দেখা যাবে তার পায়ের অগ্রভাগ নিকটবর্তী দরজার দিকটিই নির্দেশ করছে।এক পা আরেক পায়ের ওপর আড়াআড়ি রেখে দাঁড়ানোকে গবেষণায় বলা হয়েছে ‘রক্ষণাত্ন’ মানসিকতার প্রকাশ বলে। এই ভঙ্গীকে বলা হয় ‘ক্রস লেগ’ পজিশন। প্রেমের সম্পর্কের বাইরে কোনো আলোচনা অথবা আড্ডায় সাধারণ স্বল্প পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় পা মানুষের নিজের অজান্তেই এরকম অবস্থানে চলে যায়। মেয়েদেরকেই বেশীরভাগ সময় এরকম ভঙ্গীতে দাঁড়াতে দেখা যায়।এই ভঙ্গী বলে দেয় ওই পায়ের মালিক একটি বন্ধ বই।

কেউ যদি চেয়ারে বসে এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে বসে সেটাকে বলা হয় ‘সাধারণ ক্রস লেগ’ অবস্থা। ইউরোপ, এশিয়ার মানুষরা এই ভঙ্গীতে বসতে অভ্যস্ত। এটি সবার জন্যই আরামদায়ক ভঙ্গী। কিন্তু মনোচিকিৎসকদের ভাষায়, যখনই কেউ এই ভঙ্গীতে বসে পায়ের অগ্রভাগ দিয়ে অদৃশ্য হাওয়াকে বারবার আঘাত করে যায় তখন বুঝতে হবে সে মানসিক অশান্তিতে আছে। তার অশান্ত পা মনের ভাবকেই প্রকাশ করছে নিজের অগোচরে।

‘ফিগার ফোর’ পায়ের আরেক বিশেষ ভঙ্গী। জরিপে দেখা গেছে আমেরিকার অধিবাসীদের পায়ের ভঙ্গীমা বেশীরভাগ সময় এরকম হয়। ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের মানুষদেরও এভাবে বসতে দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, যারা এভাবে এক পায়ের ওপর পা তুলে বসে তারা সাধারণত তর্ক করতে ভালোবাসে। নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতাও তাদের বেশী থাকে।বিজ্ঞানীরা একদল শিম্পাঞ্জির উপর গবেষণা চালিয়ে একই ফলাফল পেয়েছেন। তবে যারা রোজসিক ভঙ্ঘতে এক পায়ের উপর অন্য পা প্রায় আড়াআড়ি তুলে বসেন এবং দুই হাত শক্ত ভাবে স্থাপন করেন পায়ের উপর তারা সাধারণত শক্ত মনের অধিকারী হন। অন্যের মত প্রত্যাখ্যান করার প্রবণতা থাকে তাদের মধ্যে।

লম্বা পা সব সময়েই আকর্ষণীয়।আর সেটা যদি মেয়েদের হয় তাহলে তো কথাই নেই। তবে গবেষণায় এটাও দেখা গেছে, মেয়েরাও লম্বা পায়ের অধিকারী পুরুষদের বেশী পছন্দ করে। পা লম্বা দেখানোর জন্য মেয়েরা হাই হিল জুতো পরে। অন্যের চোখে লম্বা দেখানোটাই একমাত্র কারণ নয়। পুরুষের চোখ সেই পা বেশি টানে যা শরীরের অনুপাতে বড়। তাই হিল তোলা জুতো পরা মেয়ে দেখলেই বুঝবেন সে পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। শরীরবিদ্যা জানাচ্ছে লম্বা পা সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। ছোট পায়ের অধিকারী মানুষদের মধ্যে হার্টের রোগ এবং মোটা হওয়ার প্রবণতা বেশী থাকে।

প্রাচ্য দেশে মেয়েদের পায়ে আলতা এবং নুপূর সবসময়ই বিশেষ অর্থ বহন করে। অনেকে মনে করেন মেয়েরা আলতা পরে শুধু পায়ের পাতাকে রাঙিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন অন্য কথা। তাদের মতে, নূপুর পরা অথবা আলতা দেয়ার মধ্যে পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করারও একটা ব্যাপার থাকে। সেখানে লুকিয়ে থাকে মন পেরিয়ে শরীরে পৌঁছানোর প্রবণতাও।

ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রে একটি বিশেষ শাখা হচ্ছে ‘সামুদ্রিক শাস্ত্র’। ‘সামুদ্রিক’ অর্থাৎ মুদ্রা বা লক্ষণ দেখেই মানুষকে বিচার করা হতো এই শাস্ত্রের মাধ্যমে। এই শাস্ত্রের পৃষ্ঠা উল্টালে বোঝা যোয় প্রাচীন কালে শাস্ত্রকাররা কতটা গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন মানুষকে। এই শাস্ত্রে অনেক বিষয় আলোচনার মাঝে একটি অন্যতম বিষয় ছিলো মেয়েদের পা। তাদের ভাষায়, স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম নাকি পদপল্লবেই প্রস্ফূটিত।

  • যে নারীর পায়ের পাতা নরম, মোলায়েম, উষ্ণ, হালকা গোলাপি রঙের এবং ঘামহীন, তারা যৌনজীবনে সুখী। কিন্তু জীবনে দুর্দশাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের।
  • যে নারীর পায়ের পাতায় শঙ্খ, চক্র, পদ্ম, পতাকা বা মৎস্য চিহ্ন রয়েছে, তাদের রাজরানী হওয়ার যোগ রয়েছে। কিন্তু ইঁদুর, সাপ অথাবা কাক চিহ্নযুক্তাদের কপালে দারিদ্র্যযোগ রয়েছে।
  • যে নারীর পায়ের নখ গোলাপি রঙের, মেলায়েম এবং কিছুটা বেরিয়ে থাকা ও গোলাকৃতি, তাদের জীবনে সুখ ও সম্পদ অবশ্যম্ভাবী। কালো ও ভাঙা নখের মালকিনদের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা।
  • যে নারীর পায়ের বুড়ো আঙুল ছোট, তাদের আয়ু কম।
  • যে নারীর পায়ের পাতার তলদেশ এবড়ো-খেবড়ো, তারা জটিল চরিত্রের হয়ে থাকে।
  • যে নারীর পায়ের আঙুল একটি উপরে আর একটি চেপে থাকে, তাঁর বৈধব্যযোগ থাকতে পারে বলে জানাচ্ছে সামুদ্রিক শাস্ত্র।
  • যদি কোনও নারীর পায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুল মাটি স্পর্শ না করে, তাহলে তাঁর স্বামীর তাকে ত্যাগ করে অন্য নারীকে বিবাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
  • হাঁটার সময়ে যে নারীর পা থেকে ধুলো ছিটকে ওঠে তিনি পরিবারের লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেন।

এই শাস্ত্রের বিচারে নারীর পা নিয়ে শেষে বলা হয়েছে, যে নারীর পায়ের গোড়ালি দৃঢ়, তাকে আকাঙ্ক্ষা না করাই ভালো। যে নারীর গোড়ালি উঁচু, তার দুঃশ্চরিত্রা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রয়াত কবি ও কথাশিল্পী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর কবিতার বিখ্যাত রহস্যময় চরিত্র নীরার উদ্দেশ্যে কবিতায় লিখেছেন

রত্ন সিংহাসন আমি এ জন্মে দেখিনি একটাও

তবুও নারীর জন্য বৈদুর্যমণির সিংহাসন আমি

পেতে রাখি

যদি সে কখনো আসে, সেখানে সে বসবে না

জলে ভেজা একটি পা

শুধু তুলে দেবে!

মিথ্যে নয়,

নীরা তুমি দেখো, সে রকমই সাজানো রয়েছে।

পায়ের এতো ভাষা সত্যিই আছে কি না জানা নেই। কিন্তু আমাদের সাহিত্যে, গানে, কবিদের সুন্দরের অসহ্য প্রকাশে নারীর চরণের কাছে ভালোবাসার নৈবেদ্য এভাবেই সমর্পিত হয়েছে। কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে ‘‘তোমার চরণ ধূলায় ধূলায় ধূসর হবো’’ এই ধূলি তো প্রণয়ের ধূলি, সেই পথ তো ভালোবাসার পথ।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ সায়েন্স ম্যাগাজিন, গীতাঞ্জলী, হঠাৎ নীরার জন্য
ছবিঃ সংগ্রহ, গুগল