জীবনের চরাচরে

আন্জুমান রোজী
প্রবাসী লেখক

দিনের শুরুতে সূর্যতাপের অতিমাত্রাটা  বেশ বুঝা যাচ্ছে।।  ক’দিন ধরেই গরমের দাহে জনজীবন অতিষ্ট হয়ে আছে।  মানুষের  জীবিকার তাড়নায় চারদিকে রৌদ্রস্নাত দিন জেগে উঠছে । রাস্তায় বের হলেই দেখা যায় জীবনের গতি। কতটা গতি নিয়ে  মানুষ  ছুটে চলে তা রাস্তার মানুষের গতিবিধিতে বেশ বুঝা যায়। একখন্ড পোড়োজমির মত স্বপ্নজীবন নিয়ে  প্রতিনিয়ত শুধু ছুটে চলা। এই ছুটে চলার দৃশ্য দেখতেও এক ধরনের নেশা কাজ করে । ছুটির দিনে যখনই সময় পায় তখনই জানালায় না হয় ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে প্রতিমা প্রায়ই বুদ হয়ে  চেয়ে থাকে মানুষের ছুটে চলা্র দিকে।  প্র্তিমাও ছুটছে এই মানুষের সঙ্গে। কিসের নেশায়, কি পাওয়ার আশায় ছুটছে তা প্রতিমা জানে না. জানে না ওই মানুষগুলিও। কেমন এক অন্ধ-ছুটে চলা !

নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে কাজে যেতে হয়। আজও তার ব্যাত্যয় ঘটেনি। কাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গ্রীষ্মের  এক কোমল সকালে এলোমেলো অনুভূতি নিয়ে প্রতিমা হাঁটতে শুরু করে। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এসেছে। মাঝেমাঝে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কখনো বরফে পা গলিয়ে দিয়ে কাজে যায় প্রতিমা । যেদিন হাঁটতে খুব ইচ্ছে করে সেদিন আর গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করে না। পায়ে হেঁটে বেশ কিছুদুর এগিয়ে  গিয়ে বাসে চড়ে কাজে যায়। আবার কাজ থেকে ফিরে আসার সময়েও ঠিক একই কাজ করে । আজ ইচ্ছে করেই  গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বের করেনি। কিছু সময় নিজের মতো করে পেতে চায় বলেই এমন করে প্রতিমা। কাজে যাওয়া আসার দু’ঘন্টা সময় তার একান্ত নিজের। ঠিক তখনই ভাবনাগুলো নিশ্চিন্তে চড়ে বসে। একলা চলার এ এক মহা যন্ত্রণা। পুরোটা অতীত যেন প্রতিমাকে গিলে খেতে চায়, এগিয়ে যাওয়ার সমস্ত শক্তি রহিত হয়ে আসে।  তবুও প্রতিমা এগিয়ে যায় নিজ ইচ্ছায় ,নিজ উদ্যমে, শুধু মানবিক জীবনযাপনের তাগিদে, জীবনকে  বাঁচিয়ে রাখার  সন্ধানে ।

প্রশান্তের সঙ্গে সম্পর্কটা  দিনে দিনে খারাপের দিকেই যাচ্ছে। সম্পর্কের টানাপোড়নে  সময়গুলো কেমন বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠছে। প্রশান্তের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার্থে মন, বিবেক , শরীর; বলতে গেলে  প্রতিমার পুরো অস্তিত্ব  এখন চরম প্রতিবাদী হয়ে ওঠছে। এমন অপমানের, এমন ধিক্কার জীবন প্রতিমা আর চায় না। মাঝে মাঝে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে চলে যেতে ইচ্ছে করে এই নশ্বর পৃথিবী থেকে । কিন্তু মৃত্যুতেই যে সব সমস্যার  সমাধান নয় তা প্রতিমা বেশ বুঝতে পারে; তাই তো জীবনের প্রতিটা বাঁকেবাঁকে খুঁজে ফিরছে জীবন নামের রহস্যময়তাকে । এ রহস্য যেন বেঁচে থাকার এক আলোকবর্তিকা, শুধু টেনে নিয়ে যায়, টেনে নিয়ে যায় কোনো এক সুদূরে !

কেন জানি আজকাল কোন কিছুই স্বাভাবিকভাবে নিতে চায় না প্রশান্ত। সব কিছুতে তেড়ে বেগে উঠে জবাব দেওয়াটাই তার স্বভাবে পরিণত হচ্ছে । সেটা ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত বুঝাটাও এ্কটা বিপদে দাঁড়িয়েছে। কোনোকিছু জিজ্ঞাসা করলে মাথার উপর খড়গ ঝুলতে থাকে আবার না জিজ্ঞাসা করে চুপচাপ থাকলে সেখানেও মহা বিপদ। তখন প্রতিমাকে নিয়ে প্রশান্তের ভাবনা চলতে থাকে অন্যখাতে । নিশ্চয়ই প্রতিমা অন্যকিছু বা অন্য কাউকে নিয়ে  ব্যস্ত হয়ে পড়েছে । প্রশান্তের প্রতি প্রতিমার এমন নির্জীবতায় সন্দেহের বিষক্রিয়া ঘনীভূত হতেহতে  সংসার জীবনে জ্বলতে থাকে অশান্তির  আগুন। প্রতিমার হয়েছে শাখের করাত, আসতেও কাটে যেতেও কাটে। কো্নো উপায়ন্তর না পেয়ে প্রতিমা আজকাল পূর্ণ নীরবতা পালন পালন করে যায়।  এই নীরবতাই এখন প্রতিমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের উপর এত ঝড় বয়ে যাচ্ছে যে  আর যেনো টাল সামলাতে পারছে না।সারাক্ষণ মাথায় চেপে থাকে  রাজ্যের  যত দুঃশ্চিন্তা।  হঠাৎ মুঠোফোনটা বেজে উঠলো। অপর প্রান্তে গুরু গম্ভীর এক পুরুষ কন্ঠ শুনতে পেলো প্রতিমা ।

-হ্যালো !

-হ্যালো , আমি অমল বলছি।

– অমল ! কি খবর ? এই সাত সকালে ফোন কল ! সব ঠিকঠাক আছে তো ?

-হা, সব ঠিক আছে।  আপনার কথা খুব মনে পড়ছিলো তাই ফোন করলাম।

-শুনে ধন্য হলাম ; কেউ আমার কথা মনে করে ! কন্ঠে কৃত্রিমতার সুর এনে বললো প্রতিমা।

-আমি  লাঞ্চ টাইমে  আবার ফোন করবো । কোন সমস্যা নেই তো? অপর প্রান্তে উৎসুক কন্ঠ  অমলের।

-অবশ্যই করবেন। তবে আমি যদি ফ্রী থাকি , তাহলে কথা হবে।

-ওকে , তাই হবে, ভাল থাকুন । বলেই ফোনটা রেখে দিলো অমল ।

অমলকে প্রতিমা চিনে বছর দুই হবে। দেখা হয়েছিল টরেন্টর  বই মেলায়। একই স্টল থেকে বই কিনতে গিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল দু’জন ; কথা হয়েছিল হুমায়ুন আজাদের লেখা নিয়ে । সেই সময় পরিচয় পর্বে একে অপরের সঙ্গে ফোন নাম্বার আদান প্রদান  করেছিল।  কালেভদ্রে ফোন করে  অমল । তাই যখনই অমল  ফোন করে প্রতিমা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কন্ঠস্বরটি।   প্রাণবন্ত উচ্ছ্বল, চঞ্চল প্রকৃতির  অমলের সঙ্গে কথা বলতে প্রতিমার বেশ ভালই লাগে । এমন গুরু গম্ভীর কণ্ঠে কিছু্টা স্বস্তি,  কিছুটা নি;শ্বাস ফেলার আশ্রয় যেনো খুঁজে পায় প্রতিমা। যতটুকু জানে অমল সম্পর্কে , তা হলো , অমল এক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীতে  চাকরী করে। নীরবে নিভৃতে থেকে জীবন পার করছে ।  এদিকে প্রতিমা ডেন্টাল এসিস্ট্যান্ট  হিসাবে ডিপ্লোমা কোর্স করে   চাকরি করছে এক ডেন্টাল অফিসে । স্বামী প্রশান্ত একজন ব্যাংকার,  আর একমাত্র কন্যাসন্তান অনুষাকে নিয়ে প্রমিতার সংসার জীবন ।

কখন যে হাঁটতে হাঁটতে বাসে চড়ে কাজের জায়গায় চলে এসেছে প্রতিমা বুঝতে পারেনি । কাজের মধ্যে ঢুকে যাওয়া মানে পৃথিবী থেকে পুরোদমে  আট নয় ঘন্টা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা । দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানা ব্যস্ততার মধ্যে কখন যে সময় গড়িয়ে যায় বোঝা যায় না । যখন কাজ থেকে বের হয়ে আসে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।  কাজ শেষে প্রতিমা মুঠোফোনটা চেক করে দেখে পাঁচটি মিস কল। যার সব কটাই অমলের নাম্বার থেকে আসা । হঠাৎ করে অমলের কি হল , এভাবে ফোন করছে কেনো? প্রশ্নটা প্রতিমা নিজেকে নিজে করে । বিষয়টাকে একেবারে পাত্তা না দিয়ে  প্রতিমা  ঘরে ফিরার জন্যে পা বাড়ালো । ঘরে ফিরে লেগে গেলো সংসারধর্মে। রাতের খাবারের ব্যাবস্থা সেই সঙ্গে কন্যা অনুষার তদারকি, টুকটাক কাজ করতে করতে প্রতিমার শরীরের উপর রাজ্যের ক্লান্তি এসে ভর করে । রুটিন মাফিক প্রতিদিন সংসারধর্ম পালন করতে গিয়ে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা ধরে যাচ্ছে । তার উপর প্রশান্তের অমানসিক উত্যক্ত আর যেনো নিতে পারছে না । সব কাজ শেষ করে  ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দেয়  আরাম কেদারায় আর সেই সঙ্গে লেপটপটা তুলে নেয় কোলের উপর।   প্রশান্ত তখনো ঘরে ফিরেনি। এই ফাঁকে ই-মেইলটা চেক করে নেওয়া যাক । ই-মেইলের মাধ্যমেই দূর-দূরান্তের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে প্রতিমা । ই-মেইলের আদান প্রদানেই জেনে নেয়  কে কোথায় কিভাবে আছে,  আর সুখ দঃখের অনুভূতি। অরুন্ধতীর ই-মেইলটা ওপেন করতেই দেখলো একটি কবিতা । অরুন্ধতী বেশ কবিতা লিখে । সেই ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকে দেখে আসছে তার কাব্যচর্চা প্রীতি । যখনই যা লেখে তা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমাকে পাঠিয়ে দেয় । যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রতিমাকে তার মনের অনুভূতি জানাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত অরুন্ধতী কেমন যেন এক অস্বস্তিতে ভুগতে থাকে। প্রতিমারও বিষয়টা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে । একই সিটিতে বসবাস করে প্রতিমা আর অরুন্ধতী , অথচ দেখা হয় কালেভদ্রে । যোগাযোগটা এই ই-মেইলের মাধ্যমেই বেশী হয় । কবিতা তো নয় যেন এক পরাবাস্তবতা । জীবন ঘনিষ্ট কিছুকথা।

কবিতাটি পড়তে পড়তে দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে । কবিতার মধ্যে ডুবে গিয়ে দেখতে পেলো কঠিন বাস্তব চিত্রের রূপ । মাতৃত্বেই নারীত্বের পূর্ণতা লাভ করে ।  সন্তানদের সুখ দুঃখের আমেজ  নিয়ে এক মায়ের অস্তিত্বের প্রকাশ ।  অরুন্ধতী হচ্ছে  সেরকম একজন  , মাতৃত্বের মোহমায়ায় জড়িয়ে আছে  সারাক্ষণ । নিজ মেধাকে বলী দিলো স্বামী সন্তানদের দেখ-ভাল করতে করতে । ভুলে গেল নিজ  সত্তাকে । তারপরেও বুকের ভেতরের আলোড়নকে যখন আর দমন করতে পারে না, তখনই দু’কলম লিখতে বসে যায় । বিদেশ বিভুঁয়ে  জীবন সত্যই ভেসে থাকা এক সাবমেরিন জীবন ।  কোন কিছুর নিশ্চয়তা নেই এখানে ।  চড়াই উৎরাই করে জীবন পাড়ি দিতে হচ্ছে।  অরুন্ধতীর অবস্থাও করুণ দশা । চারদেয়ালের মাঝে এক বন্দি জীবন । স্বামী, সন্তান, সংসারের ঘানি টানতে টানতে জীবন আজ ফানা-ফানা । অরুন্ধতীর জন্য ভীষন কষ্ট হয় । বুকের ভেতরে টনটনে ব্যথা অনুভব করতে থাকে। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ছেড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকলো। এরই মধ্যে প্রশান্ত ঘরে ফিরে। প্রতিমা উঠে প্রশান্তকে টেবিলে খাবার সাজিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো তার খাওয়া শেষ হওয়ার জন্য । প্রতিদিনের মতই ভারিক্কিভাব নিয়ে প্রশান্ত খেতে বসলো। মুখে কোনো কথা নেই। এভাবেই চলছে তাদের দাম্পত্য জীবন গত কয়েক বছর ধরে ।  প্রতিমা শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক সব দিক থেকে পুরোটাই দিয়ে দিচ্ছে এই সংসারের পিছনে । বলতে গেলে প্রশান্তই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে । ভেবেছিল কানাডাতে আসলে হয়ত প্রশান্তের একটু পরিবর্তন হবে । পরিবর্তন একটুও হয়নি, বরঞ্চ পুরনো ধ্যান ধারণার রক্ষণশীল মানসিকতা যেন আরো গেড়ে বসেছে। খাওয়া শেষ করে প্রশান্ত বিছানায় চলে গেলো একটা বাংলা পেপার হাতে নিয়ে । বাকী কাজ শেষ করে প্রতিমা পরের দিন কাজের যাওয়ার সবরকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বিছানায়  চলে গেলো ঘুমোতে । (চলবে)

ছবি: গুগল