মেঘের শহর দার্জিলিং…

শহেরের ব্যাস্ত জীবন ছেড়ে মাঝে মাঝেই চলে যেতে ইচ্ছে করে দূরে কোথাও। ইচ্ছে থেকেই তখন মানুষ বেরিয়ে পরে দেশে বিদেশে। আর্থিক সংগতির সঙ্গে সমন্বয় করেই ঘুরে আপনি ঘুরে আসুন আপনার পছন্দের জায়গা। যারা বিলাসবহুল জীবনযাপন যারা করেন তারা একটু আভিজাত্যের ছাপ রেখেই দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে বেড়ান। কিন্তু সবার আর্থিক অবস্থা তো এক রকম নয়। কিন্তু তাই বলে ঘরে বসে থাকলে তো চলবে না। ইচ্ছে থাকলে নিজের সঙ্গতির সঙ্গে সমন্বয় গটিয়েই বেড়িয়ে পড়ুন।চারদিক থেকে নিজের আভিজাত্যকে একটু কাটছাঁট করে নিলেই তা সম্ভব। স্বল্প খরচে, অল্প আরামে মনটাকে মানিয়ে নিতে পারলেই আমাদের চোখের সামনে খুলে যাবে সৃষ্টির অনেক অজানা দুয়ার।খুব বেশী দূর নয় কাছের দেশ থেকেই শুরু করতে পারেন।চলে যান মেঘের কোল ঘেষা শহর দার্জিলিংয়ে। তবে মনে রাখবেন, কোথাও গেলে সবার আগে যে যে তথ্যটা প্রয়োজন তা হল কিভাবে যাব? তাই প্রথমেই করে নেই এ সম্যার সমাধান।darjeeing1

চলুন যাই
পাহাড়ে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব চিরহরিৎ ভূমির দার্জিলিং।ঢাকা থেকে স্থলপথে  সরাসরি দার্জিলিং যেতে চাইলে উত্তরবঙ্গের বুড়িমারি সীমান্ত অতিক্রম করে যাওয়াটাই বুদ্বিমানের কাজ। এবং সুবিধাজনক। প্রতিদিন ঢাকার গাবতলী  অসংখ্য যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে উত্তরবঙ্গের বুড়িমারী সীমান্তের উদ্দেশে। ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস থেকে পাসপোর্টে নির্দিষ্ট সময়ের ভিসা নিয়ে রাত ১০টার সুপার সেলুন চেয়ার কোচে উঠে পড়ুন বুড়িমারীর উদ্দেশে। ভাড়া  সামর্থের মধ্যেই।
ভোর ৭টায় পৌঁছে যাবেন বুড়িমারী চেকপোস্টে। ইমিগ্রেশন অফিসের কাছেই সব বাস থামে। প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করে ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পন্ন করে নিন ভ্রমণ কর ও কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া। অবশ্য আপনি চাইলে ঢাকা থেকেই ভ্রমণ কর প্রদান করে যেতে পারেন সোনালী ব্যাংকের যে কোন শাখায়। বুড়িমারী অতিক্রম করে ওপারে চ্যাংড়াবান্দা সীমান্তে পৌঁছে একইভাবে সম্পন্ন করে নিন আপনার ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া। তারপর আপনার কাছে থাকা ইউএস ডলার চ্যাংড়াবান্দায় অবস্থিত সরকার অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকেই ভারতীয় মুদ্রায় পরিবর্তন করে নেবেন।নাহলে  ডলার চেন্জের ব্যাপারে সমস্যায় পড়তে পারেন।darjeelingpranerbanglaA1db
চ্যাংড়াবান্দা থেকে বাস বা সুমো ধরে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন  শিলিগুড়ি জিপ স্টেশনে। ভাড়া জনপ্রতি ৭০ ভারতীয় রুপি। তবে দলবলে গেলে জিপ বাড়াও করে নিতে পারেন। সেখান থেকে ঝটপট ১২০ ভারতীয় রুপির বিনিময়ে সংগ্রহ করে নিন দার্জিলিংগামী কমান্ডার জিপের টিকিট। দলবলে গেলে এবারও জিপ ভাড়া করে নিতে পারেন   হাতে শীতের পোশাক নিতে ভুলবেন না।গাড়ি যত উপরের দিকে উঠবে ততোই ঠান্ডা অনুভূত হবে। ওখান থেকে মাত্র আড়াই থেকে তিন ঘণ্টায় আপনি পৌঁছে যাবেন মেঘের দেশ  দার্জিলিংয়ে।
তবে কলকাতা থেকে যেতে চাইলে আপনাকে শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটের দার্জিলিং মেল ধরতে হবে। টিকেট টুরিস্টদের জন্য নির্ধারিত কাউন্টার ফেয়ারলি প্যালেস থেকে সংগ্রহ করবেন। এবং ১৪ ঘণ্টার এক ট্রেন ভ্রমণ করে পরদিন সকাল ১০টা নাগাদ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছে যাবেন। স্টেশন থেকে প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করে রিকশাযোগে চলে আসুন শিলিগুড়ি জিপ স্টেশনে। ১০-১২ রুপি ভাড়া পড়বে। সেখান থেকে জিপে যাত্রা শুরু।

হোটেল মোটেল
দার্জিলিং শহরে আছে ছোটবড় অসংখ্য হোটেল আবাসিক হোটেল।মোটামুটি ভালো ভাবে থাকতে চাইলে প্রতিদিনের থাকা এবং খাওয়াসহ জনপ্রতি ভাড়া  পড়বে প্রায়  ৮৫০-১২০০ রুপি করে। প্রায় প্রতিটি হোটেলেই রয়েছে দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরে বেড়ানোর জন্য আকর্ষণীয় জিপ, সার্বক্ষণিক গরম পানির ব্যবস্থা, ঠাণ্ডা প্রতিরোধে ওষুধসহ যে কোন মুহূর্তে যে কোন সমস্যার তাৎক্ষণিক সেবা।pranerbanlaA1aa

ভুরি ভোজ
ট্যুরিস্টদের জন্য হোটেলগুলোতে সব ধরনের খাবারের থাকে। সুতরাঙ খাবার নিয়ে ভাবনার কিছু নাই। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অসংখ্য ট্যুরিস্টের আগমনের ফলে এখানকার হোটেল মালিকরা বাংলাদেশীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় একেবারে বাঙালি রুচিসম্মত খাবার-দাবারের জোগান দিয়ে থাকেন। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এবং ডিনার ছাড়াও হোটেল কর্তৃপক্ষ ভোরবেলায় বেড-টি এবং ডিনারের আগে ইভনিং-টি’র ব্যবস্থাও করে থাকেন।

ঘুরে দেখুন
ছোট বড় মিলিয়ে বেড়ানোর জন্য প্রায় ১৭টি আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে দার্জিলিং জুড়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত রেলওয়ে স্টেশন ‘ঘুম’ ছাড়াও আরও যেসব দর্শনীয় স্থান দেখে আপনার আনন্দময় অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে তা হচ্ছে; সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে অপূর্ব সুন্দর সূর্যোদয় দেখা। পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা-স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি। ছবির মতো অপূর্ব সুন্দর স্মৃতিসৌধ বাতাসিয়া লুপ বিলুপ্ত-প্রায় পাহাড়ি বাঘ Snow Lupard খ্যাত দার্জিলিং চিড়িয়াখানা। পাহাড়ে অভিযান শিক্ষাকেন্দ্র ‘হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট’।
সর্বপ্রথম এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং-রক- এর স্মৃতিস্তম্ভ। কেবল কারে করে প্রায় ১৬ কিলোমিটার এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ভ্রমণ।হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে বসে তাৎক্ষণিকভাবে পৃথিবীখ্যাত ব্ল্যাক টি পানের অপূর্ব অভিজ্ঞতা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী কেন্দ্র তিব্বতিয়ান সেলফ হেলপ্ সেন্টার। সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত মনোরম খেলাধুলার স্থান দার্জিলিং গোরখা স্টেডিয়াম।
নেপালি জাতির স্বাক্ষর বহনকারী দার্জিলিং মিউজিয়াম। পৃথিবীর বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার জাপানিজ টেম্পল ব্রিটিশ আমলের সরকারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র কাউন্সিল হাউস ‘লাল কুঠির’ অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শন খ্যাত ‘আভা আর্ট গ্যালারি’। শতবর্ষের প্রাচীন মন্দির ‘দিরদাহাম টেম্পল’।
এসব নিদর্শন ছাড়াও আপনার মনের জগতকে শুধু আনন্দময় নয়, এক নতুন জীবনের যাত্রা শুরু করাতে চলে যেতে পারেন পাথর কেটে তৈরি ‘রক গার্ডেন’ এবং গঙ্গামায়া পার্কে উপরোল্লিখিত দর্শনীয় স্থানগুলো ছাড়াও আপনার হদয় গহিন থেকে রোমাঞ্চিত করবে মহান সৃষ্টিকর্তার বিশাল উপহার হিমালয় কন্যা ‘কাঞ্চন-জংঘা’, বিশুদ্ধ পানির অবিরাম ঝর্ণাধারা ‘ভিক্টোরিয়া ফলস্’ এবং মেঘের দেশে বসবাসরত এক সুসভ্য জাতির সংস্কৃতি।08

কোথায় কিনবেন
লাডেন-লা রোডে রয়েছে অনেক ছোট-বড় মার্কেট। প্রায় সব কিছুই আপনি পেয়ে যাবেন আপনার ক্রয়- ক্ষমতার মধ্যে।  হাতমোজা, কানটুপি, মাফলার, সোয়েটারসহ যে কোন প্রকারের লেদার জ্যাকেট পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দমতো মূল্যে। তাছাড়া ১০০ থেকে ৫০০ রুপির মধ্যে পেয়ে যাবেন অসাধারণ কাজ করা নেপালি শাল এবং শাড়ি যা আপনার পছন্দ হতে বাধ্য।
প্রিয়জনকে উপহার দিতে  ২০ রুপি থেকে ২৫০ রুপির মধ্যে পেয়ে যাবেন বিভিন্ন অ্যান্টিক্স ও নানাবিধ গিফট আইটেম,।। তাছাড়া আকর্ষণীয় লেদার সু আর বাহারি সানগ্লাস তো আছেই।হোটেলগুলোতে কিছু নেপালি তরুণ-তরুণী  ফেরি করে শাল, শাড়ি বিক্রয় করে থাকে। তাদের কাছ থেকেও ইচ্ছে করলে কিনতে পারেন।

আছে কিছু ঝুটঝামেলা
মানুষের জীবনটাই একটা বড় ঝুঁকি। তার পরেও সাবধানতা অবলম্বন করে ঝুঁকি এড়িয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার প্রয়াস পেয়েছে মানুষ দীর্ঘকাল। দার্জিলিং ভ্রমণেও ছোটখাটো কিছু ঝুঁকি রয়েছে। মাঝে-মাঝেই পাহাড়ি অঞ্চলে ছোটখাটো ধস নামে। তবে সেটা বেশি হয় বর্ষা মৌসুমে। শীত বা গরমে সে ঝুঁকিটা একেবারেই নেই। আর গরম জামাকাপড় ব্যবহারে অবহেলা না করলে ঠাণ্ডা লাগার ঝুঁকিটাও কমে যায় একেবারেই। তাছাড়া হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সবরকম বিষয়ে পরামর্শ করে চলাফেরা করলে স্থানীয় দালাল বা হারিয়ে যাওয়ার আশংকা থেকেও আপনি পেয়ে যাবেন পুরোপুরি মুক্তি।

ট্যুর আয়োজন
স্বল্প খরচে, আশেপাশে ঘুরতে চাইলে আমাদের এখানে রয়েছে অসংখ্য ট্যুরিজম কোম্পানি, যারা দার্জিলিংসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্যাকেজ ট্যুরের আয়োজন করে থাকে।তাদের সঙে্গ যোগাযোগ করলেও আপনি নিঃশ্চিন্তে ঘুরে আসতে পারবেন পছন্দের জায়গা। অনেক সময় ভিসার ব্যপারেও তারা সহোযোগীতা করে থাকে।

আরো কোথাও
দার্জিলিং শহর থেকে কিছুটা দূরে নেপাল শহরের নিকটবর্তীতে অবস্থান করছে মিরিক লেক ও পশুপতি মার্কেট। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টার মধ্যে জনপ্রতি ৪৫০ রুপি ভাড়ার মধ্যে আকর্ষণীয় জিপে ঘুরে আসতে পারেন। সেজন্য অবশ্য আরও একটি দিন বেশি অতিবাহিত করতে হবে দার্জিলিং শহরে। তবুও যাত্রার দিন থেকে নিয়ে সর্বমোট ৫ দিনেই সবকিছু ঘুরে-ফিরে আসতে পারবেন।darjeeling3pranerbanglaA1

সম্রাট