ফিরে ফিরে আসি

rumapranerbangla

রুমা মোদক: প্রিয় শহর হবিগঞ্জ নিয়ে লেখাটা ঠিক কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। সেই শৈশবে দেখা নিস্তরঙ্গ নিশ্চুপ নিরিবিলি শহর থেকে নাকি এই বর্তমানের হৈ-হল্লার ব্যস্ত শহর থেকে? যেখান থেকেই লিখি ৪ দশক ধরে এর বিবর্তনের সাথে স্মৃতি সত্তা নিয়ে জড়িয়ে আছি রোদ-বৃষ্টির মতো অনিবার্য সংশ্লিষ্টতায় ; পালাতে চাই না বললে আত্মপ্রতারণা হয়, খুব চাই। পারি না। কেনো চাই, তা অনুক্ত থাক কিন্তু এই অনুক্ত চাওয়ার অন্তরালে সত্যটাও আছে যে।

শুধু এটুকু জানি এই শহর আমাকে ছাড়ে না। বারবার টেনে রাখে। জড়িয়ে রাখে নানা কর্মতৎপরতায়, নানা দায়বদ্ধতায়। প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে যখন হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম, তৃতীয় শ্রেণীতে শহরে একমাত্র সরকারি বালিকা বিদ্যালয় বি কে জি সি সরকারি বলিকা উচ্চ বিদ্যালয়।  তখন বাস্তবিক অর্থে আমার শহর দেখা, হবিগঞ্জ শহর। বাড়ির লাগোয়া প্রাইমারি স্কুল। লক্ষন গন্ডি ছিলো স্কুল থেকে বাসা, বাসা থেকে স্কুল। বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরকারি স্কুল…। কখনো হেঁটে কখনো রিক্সায় যাত্তয়া। সাড়ে ছ বছর বয়সে তখন আমার শহর দেখা। রাস্তার দুপাশে টিনের ছাউনি দেয়া দোকান আর মাঝখান দিয়ে রাস্তা। মা কি ভীষণ চিন্তিত ছিলেন, পথ চিনবো তো, চিনে যেতে পারবো তো? তখন তো আর আমাদের মায়েদের ¯স্নেহকে নাগরিক উৎকন্ঠা কিংবা অত্যুৎসাহী আদিখ্যেতা গ্রাস করে নি। প্রথাও ছিল না সঙ্গেঁ যাবেন। প্রথম শহর দর্শনের দিনই মনে হলো, আরে না চেনার কী আছে? এত সোজা রাস্তা। কোন গলি-বাঁক নেই। যদিও একা যাওয়া হয়নি এরপর বেশ কতোকাল। তবু এক রাস্তার শহর দেখা ফুরায় নি আমার…। সেই যে শুরু তা চলছে এখনো।   চোখের সামনে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, বদলে গেছে চেনা শহরটার চেহারা।habiganj2pranerbanglaA2

সন্ধ্যা হতইে ঝুপ করে রাত নেমে আসতো শহরটায়। খুব মনে পড়ে এইতো সেদিন ও। সন্ধ্যার পর কোথাও থেকে যদি বাড়ি ফিরতাম কোনো অনিবার্য কারণে, নিজেকে চলতি রাস্তায় বোধ হত অনাহুত কোন ভীনগ্রহের মানুষ। একটু বড় হতে হতে জানা হলো শহরটাকে বলে পাজামা শহর। দুই রাস্তা সামনে পিছনে। সেই দুই রাস্তাকে রেখে কেন্দ্রে শহরের বৃত্ত এখন ঘূর্ণায়মান শহর ছেড়ে আরো অনেক দূর…। গলি ঘুপচিতে ভরে গেছে, টিনের চাল দখল করে নিয়েছে হাই রাইজ বিল্ডিং। শুধু কি বিল্ডিং আমাদের প্রিয় শহরের জীবনটাই বদলে গেছে আমূল।

যে শহরে এইতো বছর বিশেক আগেও রাস্তায় বের হলে সবাই চিনে নিতো  ওতো অমুকের মেয়ে তমুকের ভাতিজি, আর এখন শহর জুড়ে মানুষে গিজগিজ, কিন্তু কেউ চিনে না কাউকে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে অনেক পুত্রসম বালকই সিগারেট লুকায় না। পায়ের উপরে পা তুলে বসে থাকে, ইজি বাইকের সিটে। না, মোটেও একে ঔদ্ধত্য হিসেবে দেখছি না। দেখছি সাংস্কৃতিক বিবর্তন হিসেবে, চেনা নিস্তরঙ্গ নিরিবিলি শহরটার ব্যস্ত অচেনা মাল্টিকালার হয়ে উঠা। ভালো লাগুক বা না লাগুক, এ পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, এ পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য।

পরিবর্তন কাম্য। পরিবর্তন আধুনিক। কিন্তু শহরের এই পরিবর্তন অপরিকল্পিত বলেই, ইতিবাচকতায় গ্রহণে কুন্ঠা জাগে। খুব সুখী করে না আলোকোজ্জ্বল শপিংমল গুলো।না করে না। একদা পুকুর আর দীঘির শহর হবিগঞ্জের থৈ থৈ পানি এখন ইটকাঠ পাথরের নিচে। খুঁজেও মিলে না কোনো জলাধার। সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় শহর। পুকুরের শহর হবিগঞ্জ এখন ইট কাঠ পাথরের নির্দয় শহরে পরিণত হয়েছে।

জন্ম থেকে এই পরিণত বয়সে, এই শহরে আছি বলেই শহরের ভালো-মন্দটা পুলকিত করে, আহত করে, আনন্দিত করে, আঘাত করে। বুঝি বা অনেককাল বাইরে থেকে ফিরে এলে এই বদলে যাওয়া শহরটা দেখে, উন্নয়ন দেখে, চাকচিক্য দেখে মোহিত-মুগ্ধ বিষ্ময়ে অবিভূত হতাম। কিন্তু এই শহর যে ছাড়ে না আমাকে, জড়িয়ে রাখে গভীর ভালবাসার বন্ধনে। তাইতো গভীর থেকে দেখি আমি, দেখি অতল তল থেকে। দেখি আর আনন্দ-বেদনার মিশ্রণে দ্রবীভূত হয়ে আরো মিশে যেতে থাকি এর আলো হাওয়ার জলে।

হ্যাঁ উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে শহরে, ঝা চকচকে রাস্তাঘাট শপিং কমপ্লেক্স, নতুন নতুন বিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, ডায়াবেটিক হাসপাতাল, নার্সিং ইন্সটিটিউট অনেক লম্বা উন্নয়নের তালিকা। সরকারি স্কুল গুলো চাহিদার সঙ্গে মিলে দু শিফট হয়েছে। হয়েছে আধুনিক রেস্তোঁরা-কফি শপ, ব্রান্ডেড পন্যের দোকান কী নয়। রাস্তার দীর্ঘ যানজটে এখন ব্যাক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নেহাত কম নয়। যে বাজার সওদার জন্য কয়েক বছর আগেও রাজধানী কিংবা নিদেন পক্ষে বিভাগীয় শহর সিলেট যেতে হতো, এখন এই ছোট্ট শহরটাতেই সব হাতের মুঠোয়। আনন্দের বিষয় বটে।  বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বেড়াতে আসা বন্ধুরা হাসাহাসি করত এই শহরে গাড়ি নাই, রাস্তায় নারী নাই, মোহন সিনেমায় নতুন সিনেমা আসার বিজ্ঞাপন হয় শহর জুড়ে ব্যান্ড বাজিয়ে, গরু জবাই হয় মাইকিং করে। কি মরমের কথা। এখন তাদের একবার বড় ডেকে আনার সাধ হয় এই হবিগঞ্জে, দেখে যাও, দেখে যাও কত বদলে গেছে শহর আমার। এখন গলি পথেও গাড়ি নিয়ে ঢুকে যাওয়া যায় অনায়াসে। ভীষণ আনন্দেরও এই পরিবর্তন।

habigonj3pranerbanglaA2কিন্তু অন্তরালে অপার বেদনা গাঁথাও যে থাকে না গোপন। মোড়ে মোড়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিন্তু শুক্রবার ছাড়া ডাক্তার নেই, জরুরী চিকিৎসা সেবা নেই। মোড়ে মোড়ে কিন্ডারগার্টেন, প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার কিন্তু শিশুকিশোরদেও নিরাপদে হেঁটে যাওয়ার মতো কোনো ফুটপাথ নেই। শিশুদের বিনোদনের কোনো পার্ক নেই। খেলার মাঠগুলো বেদখল, বড় উপেক্ষায় বাড়ছে প্রজন্ম। পাবলিক লাইব্রেরীটি পড়ে আছে অবহেলায়। শুনেছি সেখানকার দূর্লভ বইগুলি দূর্লভ হয়ে গেছে।

খুব মনে পড়ে এই শহরে প্রথম যুবতী বেলায় পুুরুষ প্রেমে মগ্ন না হয়ে ডুবে ছিলাম সমরেশ বসু-সমরেশ মজুমদারে। প্রজাপতি-বিবর-কালবেলা-কালপুরুষে। রফিক আজাদ-হেলাল হাফিজে। চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া-এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় এ। এ সব জেনেছি অগ্রজ অগ্রজাদের হাত ধরে। শব্দশিল্পী নামের এক বলিষ্ঠ সংগঠন একদা এই শহরে তৈরী করে দিয়েছে এই নগন্য মেয়েটির সাহিত্যপাঠ আর চর্চার রুচি। এই শহর থেকে প্রকাশিত একের পর এক লিটল ম্যাগে লিখে হাত পাকিয়েছি।

এখন এই শহর থেকে কোনো লিটল ম্যাগ হয় না, কোনো সাহিত্য আড্ডা নেই।নইে কোনো সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা ।  দ্বায়িত্ব নিয়ে বলছি নেই। আছে বিশেষ উপলক্ষে এক এবং একমাত্র চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগীতা। দলে দলে অংশগ্রহনকারী, দলে দলে পুরস্কার। সংগীত আর নৃত্য চর্চা হয় যৎসামান্য। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করার মতো কিছুই নয়। আবৃত্তি চর্চার কোনো বালাই নেই। ৯৬ সালের দিকে পড়াশোনা শেষ করে হবিগঞ্জে ফিরলে তোফাজ্জল সোহেল আমাকে কেন্দ্র করে একটি আবৃত্তি সংগঠন দাড় করিয়েছিলেন। পদক্ষেপ আবৃত্তি পরিষদ। বেশ কয়েকটি প্রোগ্রাম করেছিলাম তখন। এসবের কিছুই এখন নেই আর। আছে, শর্টফিল্ম নামের মানহীন কিছু মিডিয়া নির্ভর কাজের হুজুগ। একটি প্রিমিয়ারের পরেই যার আবেদন শেষ। খুশি হতাম যদি এর একটিও জাতীয় পর্যায়ে হবিগঞ্জের প্রতিনিধিত্ব করত। শিশু নাট্যসংগঠন সুন্দরম এখনো শিশুদের নিয়ে নাটক করে। দেশে-দেশের বাইরে প্রতি বছর প্রদর্শনী করে। খুশি হই, আরো খুশি হতাম যদি এ প্রদর্শনী নিয়মিত হতো।

নানাবিধ প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করে নাটক নিয়ে দেশময় ঘুরে বেড়াই আমরা জীবন সংকেত। দেশের নাট্যাঙ্গনে জীবন সংকেত এখন হবিগঞ্জের, শুধু হবিগঞ্জের কেন পুরো সিলেট বিভাগের প্রতিনিধিত্বশীল দল। নিজেদেও মেধায় এ অবস্থান তৈরী করে নিয়েছি আমরা। শংকায় আছি ঠিক কতদিন অব্যাহত থাকবে এ প্রচেষ্টা। নিজস্ব কার্যালয়ের অভাবে এই সেদিনও অরক্ষিত থেকে নষ্ট হয়েছে লক্ষ টাকার নাটকের প্রপস।

নাটক মঞ্চায়নের উপযুক্ত হল নেই এই শহরে। হ্যাঁ আঙুলে গোনা যায় বটে বেশ কয়েকটা। সাইফুর রহমান টাউন হল, কিবরিয়া মিলনায়তন, শিল্পকলা একাডেমি হল।  কিন্তু ভুক্তভোগী সবাই জানে, এর সবকটি  অপ্রস্তুত, অকেজো, অস্বাস্থ্যকর।

কেমন অসহিষ্ণু দীর্ঘ এক তালিকা। কি জানি হয়তোবা প্রত্যাশা বেশি বলে। হ্যাঁ, কিছু প্রত্যাশার মতই তো আমার এ শহর। যেখানে রাজনৈতিক হানাহানি নেই বললেই চলে, রাত একটায়ও শহরের রাস্তাগুলো নিরাপদ, ছিনতাইকারীর ভয় নেই, শহরময় হেঁটে গেলে এখনোতো আদাব-সালাম দেয় কত অনুজ । ভালবেসে ইফতারে-ঈদে ডাকে প্রিয় পরিজনেরা। দোকানগুলো বাকি দেয় হাজার টাকার পন্য। এত আপন আমায় কে ভাববে গোটা দুনিয়াময় আমার হবিগঞ্জ ছাড়া। যে আপন ভালবাসার আহবান আমি এড়াতে পারি না কোনকালে। ঢাকায় পড়াশোনা শেষে বন্ধুরা কেউ ফেরেনি নিজ শহরে। সবাই রাজধানীবাসী হয়েছে। কেবল আমি ফিরেছি। ফিরেছি প্রিয় শহর হবিগঞ্জে। যেখানে যাই, যত দূরে, বারবার এর কাছে ফেরার জন্য উতলা হই।habigonjpranerbanglaA2s