স্থপতি জাহা হাদিদের গৌরব

বিশ্ববরেণ্য আর্কিটেক্ট জাহা হাদিদ মারা গিয়েছেন ৩১ মার্চ ২০১৬। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ইরাকে জন্ম নেয়া এই আর্কিটেক্ট হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামির একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।
৩১শে অক্টোবর, ১৯৫০ সালে বাগদাদে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই বিখ্যাত স্থপতি দামে যাহা হাদিদ। তিনি লেবাননের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের উপর পড়ালেখা শেষ করে ১৯৭২ সালে লন্ডনে চলে যান। সেখানে তিনি আর্কিটেকচারাল এসোসিয়েশন স্কুল অব আর্কিটেকচার থেকে স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ালেখা শেষ করে ১৯৭৭ সালে ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে যাহা হাদিদ আর্কিটেক্টস নামে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি শুধু একজন স্থপতি ছিলেন না , একজন ডিজাইনারও ছিলেন।  শৈশবকাল থেকে তিনি স্পেস আর ফর্ম, ফ্যাশন আর ফার্নিচার-এর সঙ্গে গবেষণা করছিলেন।
zaha-hadid-architecture-lifetime-projects-pinterest-board-dezeen-sq
স্থাপত্যকলায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছরেই যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের স্বর্ণপদক অর্জন করেন জাহা হাদিদ। ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ রয়্যাল ইনস্টিটিউটের পদক নেয়ার সময় হাদিদ বলেন, ‘নারী স্থপতিদের প্রথম হিসেবে নিজের অধিকার অর্জন করে নিতে পেরে আমি গর্বিত। বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত নারী স্থপতির সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। তার মানে এই নয়, নারীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনো নারীদের কোথাও কোথাও প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হতে হয়।

তার প্রথম আন্তর্জাতিক কাজ ছিল জার্মানির ভিতরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, যা ১৯৯৩ সালে উন্মুক্ত হয়। তার অসংখ্য উল্লখেযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে, আজারবাইজানের বাকুতে অবস্থিত হায়দার আলীয়েভ সংস্কৃতি কেন্দ্র, স্কটল্যান্ডের রিভারসাইড যাদুঘর, বিএমডব্লিউ -র প্রধাণ কার্যালয়, আবুধাবীর শেখ যায়েদ ব্রিজ, চীনের গুয়াংজু অপেরা হাউজ, লন্ডের এ্যকুয়াটিক সেন্টার ( ২০১২ -র লন্ডন অলিম্পিকে ব্যবহৃত হয়), ২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় কাতার বিশ্বকাপের জন্য আল ওয়াকরাহ স্টেডিয়াম ইত্যাদি।

২০০৪ সালে হাদিদ প্রথম নারী এবং প্রথম মুসলিম হিসেবে আর্কিটেকচারের জন্য নোবেল  প্রাইজ Pritzker Architecture Prize পান। ২০১৫ সালে তিনি British Muslim Awards -এর জন্য মনোনীত হোন। অতি সম্প্রতি তিনি লন্ডনের Royal Institute of British Architects থেকে Royal Gold Medal এ ভূষিত হোন।

জাহা হাদিদ আর্কিটেকটসে বর্তমানে ৩০০-এর বেশিকর্মী কাজ করছেন। বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বস-এর সেরা ১০০ ক্ষমতাশালী নারীর তালিকায় নাম আছে জাহা হাদিদের। ২০০৯ সালে তিনি বিবিসির রেডিও সংবাদভিত্তিক অনুষ্ঠান টুডের অতিথি সম্পাদক হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার নিজস্ব আর্কিটেকচার ফার্ম যাহা হাদিদ আর্কিটেক্টস  লন্ডনের ক্লার্কেনওয়েলে অবস্থিত। প্রায় ৪০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা এবং কর্মচারী সেখানে কাজ করে, বিশ্বের ৪৪ টি দেশে ৯৫০ টির মত প্রকল্পে তিনি কাজ করেছেন। তার সর্বসাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য নির্মিত প্রকল্প হচ্ছে আজারবাইজানের বাকুতে অবস্থিত হায়দার আলীয়েভ সংস্কৃতি কেন্দ্র। এছাড়া আছে বিএমডব্লিউএর সদর দপ্তর, আবুধাবীর শেখ যায়েদ ব্রিজ, স্কটল্যান্ডের রিভারসাইড যাদুঘরর মত প্রায় দুই ডজনের মত বিশ্বখ্যাত নকশা তারই করা।  সৌদি আরবের কিং আব্দুল্লাহ পেট্রোলিয়াম স্টাডিস এন্ড রিসার্চ সেন্টার এর পরামর্শক এবং নকশা তারই তত্ত্বাবধানে হচ্ছে। এছাড়া জাপানের জাতীয় স্টেডিয়াম এবং ২০২২ সালে অনুষ্ঠেয় কাতারের স্টেডিয়ামসহ ইরাকের সংসদ ভবনের নকশা ও তার । তার সাম্প্রতিক আলোচিত প্রকল্প হচ্ছে আজারবাইজানের হায়দার আলীয়েভ সংস্কৃতি কেন্দ্র। প্রায় ৭৪ মিটার উচ্চুতা বিশিষ্ট এই সেন্টারটি ২০০৭ সাল থেকে নির্মাণ শুরু হয় এবং ২০১২ সালে নির্মাণ শেষ হয়। এই প্রকল্পে সাগর স্রোতের  একটি রুপকল্প আনা হয়েছে । স্রোত এই ধরণী থেকে উচুতে উঠে আবার যেন আছড়ে পড়ছে ধরার বুকে। এটি সাগর স্রেতের  একটি চক্রধারা । এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – এখানে কোন সীমানা প্রাচীর রাখা হয়নি। এক উন্মুক্ততার মুগ্ধতায় আবিষ্ট হতে হয় স্থাপনাটি দেখলে। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি যেন সারা বিশ্বের জনগণকে আবাহন করছে এক উন্মুক্ততার উদারতায়। ১২০২৭টি ধাতব পাত যুক্ত করে কেন্দ্রটি তেরী করা, যা এক সংগে যুক্ত করলে ৯০ কিমি লম্বা হবে।   এছাড়া সেখানে পুল সহ বিশাল লেক রয়েছে। এর বাইরে তার নকশা করা যে সকল স্থাপত্য নেটে দেখা যায়, সব কিছুর মধ্যেই রয়েছে বিশালতা, উন্মুক্ততা এবং বিস্তৃতির বিহ্বলতায় আকীর্ণ ।
http://www.zaha-hadid.com/ সাইটে ভিজিট করলে তার কর্ম এবং প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

5000

জুলফিকার সুমন