সিলেটের আদিবাসী সিলেটের গৌরব

Manipuriআবহমান কাল ধরে পাহাড় ও অরণ্য ঘিরেই গড়ে উঠেছে আদিবাসী মানুষের জীবনধারা। সিলেটের পাহাড় ও সমতলের অরন্যকে উপজীব্য করে এখানেও রয়েছে আদিবাসীদের বসতি । অনেকে এখানকার ভূমিপুত্র; আবার অনেকের পূর্বপুরু শত শত বছর আগে নিজ বাসভূম থেকে পরবাসী হয়ে জীবন ও জীবিকার তাগিদে এদেশে এসেছে । এখানকার জল-কাঁদার সঙ্গে একাত্ম হয়ে বংশ পরম্পরায় প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে তুলেছে হৃদিক সৌহার্দ এখানকার পাহাড়-অরণ্য-ঝরণা-নদী-পাথর-বৃক্ষ-জীবজন্তুর প্রতি এই অরণ্যচারী মানুষদের রয়েছে পরম মমত্ববোধ। এরা এখানকার প্রকৃত আদিবাসী কি-না, সেই তর্কের চেয়ে এই মানুষগুলোর জীবনধারার সাথে প্রকৃতি ও পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে মূলধারার নাগরিকদের প্রকৃত ধারনা থাকা জরুরী । ইংরেজিতে অ্যাবঅরিজিন, অ্যাবঅরিজিন্যালস ও ইন্ডিজেনাস শব্দগুলো নিয়ে নানা বাহাস। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার বছর ধরে সেদেশে বাস করছে আদিবাসীদের পরম উদাহরণ তারাই। একসময় অ্যাবঅরিজিনস বলতে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদেরই বোঝাত ।

‘ইন্ডিজেনাস’ পদটি বহু বছর ধরে একটা সাধারণ পদ হিসেবে চলে আসছে । কোনো কোনো দেশে ভিন্ন শব্দের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে। যেমন, জনজাতি, প্রথম জাতি, আদিবাসী, পাহাড়ি, যাযাবর ইত্যাদি । জাতিসংঘের মতে, আদিবাসীদের সংজ্ঞায়িত করার চেয়ে শনাক্তিকরণই হবে অধিকতর ফলপ্রদ দৃষ্টিভঙ্গি। মানবাধিকারের বিভিন্ন দলিলের ওপর ভিত্তিই হবে সেই স্ব-শনাক্তিকরণের নির্ণায়ক। সেই স্ব-শনাক্তিকরণে সিলেট অঞ্চল বাংলাদেশের মধ্যে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার জনগোষ্ঠীর বাসস্থান হিসাবে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

সিলেটের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার জনগোষ্ঠীর মাঝে খাসিয়া, মনিপুরী, পাত্র সম্প্রদায়সহ চা-বাগানে কর্মচারী একাধিক ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অবস্থান সিলেট ব্যতিত বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই। তাই খাসিয়া, মণিপুরী, পাত্র ও চা-শ্রমিকদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধীকার শুধুমাত্র সিলেটের । এইসব জনগোষ্ঠীর বাইরে সিলেট অঞ্চলে এখনো ওঁরাও, ত্রিপুরা, গারো, হাজং, সাঁওতাল, হালাম সহ হাতে গোনা দু-এক পরিবার লুসাই জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষ নানা বৈরিতার মাঝেও নিজেদের এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে।

১৯০১ সালের আদম শুমারীতে সিলেট অঞ্চলে কুকি, সিন্টেং, খাসিয়া, পাত্র (পাতর), গারো ও টিপরা (ত্রিপুরা) জনগোষ্ঠীকে এ অঞ্চলের পার্বত্য জাতি বা পার্বত্য আদিবাসী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বাইরে মণিপুরীদের ঔপনিবেশিক জাতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও মণিপুরীরা মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠীর পার্বত্য জাতিসত্ত্বার অর্ন্তভুক্ত। তথাপি কালের পরিক্রমায় মণিপুরীরা সিলেট অঞ্চলে পাহাড় ও অরণ্য থেকে দুরে অবস্থান করে বাঙ্গালী হিন্দুদের জীবন ধারায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে । তাঁদের একটি অংশ ইসলাম ধর্মগ্রহন করেছে । ১৯০১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী মণিপুরীদের সংখ্যা ১৬,০৪৩ জন। ১৯৯১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী মণিপুরীদের সংখ্যা ২৪,৮৮২ জন, যদিও মণিপুরী সম্প্রদায় মনে করে তাদের জনসংখ্যা প্রায় ৪০,০০০ জন। এছাড়া, ১৯০১ সালের আদম শুমারীতে লালুং নামীয় এক পার্বত্য জনগোষ্ঠীর কথা বলা হয়েছে, যাদের কোনো অস্তিত্ব ১৯৯১ সালের আদম শুমারীতে পাওয়া যায়নি।

১৮৫৪ সালে মালনীছড়া চা-বাগান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইংরেজ আমলে সিলেট অঞ্চলে ১৫৪ টি চা-বাগান এর পত্তন করা হয়। এই বাগানগুলোতে কাজ করানোর জন্য ইংরেজরা ভারতবর্র্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় ৫০,০০০ জন দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে সিলেট অঞ্চলে নিয়ে আসে। এর মধ্যে বঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল, ছোট নাগপুর, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে নিয়ে আসা প্রায় ৫৪ টি জাতিসত্ত্বার মানুষের সংখ্যা ১৯০১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী ১,৪৪,৮৭৬ জন। এই চা শ্রমিকরা নিজ বাসভূম থেকে পরবাসী হয়ে শত শত মাইল দূরবর্তী সিলেট অঞ্চলের প্রকৃতির সাথে নিজেদেরকে একাত্ম করে নিয়েছে। তাদের রক্ত পানি করা শ্রমে এই অঞ্চলের ছোট-বড় পাহাড় ও টিলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এইসব চা-বাগান। চা-শ্রমিকরা তাই আজ এই অঞ্চলের গর্ব হিসাবে চিহ্নিত এই সব চা-বাগানের প্রকৃত উত্তরাধীকারী। বংশ পরম্পরায় শতবর্ষী চা গাছগুলোর সাথে তাদের নাড়ীর সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। তাদের অক্লান্ত শ্রমেই চা-বাগানের দিগন্ত জুড়ে আজ সবুজের্র বিস্তিৃর্ন প্রান্তর। চা-শ্রমিকরা ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্ত্বার মানুষ হলেও বর্তমানে তাদের পরিচয় শুধুই ”চা-শ্রমিক”। শহুরে বাঙ্গালীদের কাছে তাদের সহজ পরিচয় ”বাগানের কুলি”। সিলেট বিভাগের চা-বাগানগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১ (এক) লক্ষ চা-শ্রমিক কাজ করে। তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে প্রায় ৬ (ছয়) লক্ষ মানুষ রোগ-ব্যাধি-জরায় আক্রান্ত হয়ে হাড্ডিসার শরীরে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এই জনগোষ্ঠীর ভেতরে বর্তমানে যে কয়টি পৃথক জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব খুজে পাওয়া গেছে, তারা হচ্ছে সান্তাল/ সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, মাহালি, বিন্দ, বাউরি, মাহাতো, বরাইক, গড়ঁ, দাল, কাহার, সাদ্রী, মালো ও আসামী। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুযোগ থেকে বঞ্চিত আধুনিক জীবন-ধারা থেকে বিচ্যুত এক নিদারুন জীবন নিয়ে এইসব চা-শ্রমিক’রা আমাদের চোখের সামনে বেঁচে আছে। প্রতিদিন অসংখ্য বার চা পানে অভ্যস্ত নাগরিকেরা কখনো এইসব চা-শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনের কথা কি ভেবেছি ? আমরা আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার এইসব মানুষকে নিয়ে ভাবিনা। আমাদের অনেক বড় বড় ভাবনা আছে। আমাদের ভাবনায় বন বিভাগের দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মকর্তারা আছেন। যাদের অঢেল বিত্ত ও বৈভব এদেশের অরণ্য থেকে আহরিত হয়। আমরা দুর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেই বন রক্ষার গুরুভার। আমাদের ভাবনায় আছে ইকো-পার্ক, রাবার বন, ন্যাশনাল পার্ক ও রিজার্ভ ফরেস্ট। এইসব ভাবনার সাথে বন বিভাগ সম্পৃক্ত থাকে, কিন্তু বনবাসী এইসব অরণ্যচারীরা থাকেনা। তাদেরকে সম্পৃক্ত রেখে তাদের আস্থা অর্জন করে এই দেশে পরিবেশের মঙ্গল চিন্তা কেউ করে না। কত সরকার আসে যায়, কিন্তু আদিবাসীদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর মতো কাউকে এদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রে দেখা যায় না। পৃথিবীর ৭০ টি দেশে প্রায় ৩০ কোটি আদিবাসী রয়েছে। দেশে দেশে আদিবাসীদের প্রতি অনেক বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। তবে, বর্তমানে অনেক দেশই তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। সম্প্রতি অষ্ট্রেলিয়ায় সে দেশের তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী পার্লামেন্টের মাধ্যমে আদিবাসীদের উপর সংগঠিত পূর্বেকার সকল বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য নৈতিক দায় স্বীকার করে আদিবাসীদের নিকট ক্ষমা চেয়েছেন ।pranerbanglaA2jjj

বাংলাদেশে সরকারী পর্যায়ে আদিবাসী নিয়ে ভাবনা পার্বত্য শান্তিচুক্তি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আদিবাসী নৃত্য প্রদর্শনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে আদিবাসী মানে মণিপুরী নৃত্য, সাঁওতালি মাদল, খাসিয়া পান, চোলাই মদ, রাখাইন মার্কেট, বৈসাবী উৎসব, বোমাং রাজার রাজ পূণ্যাহ, বেড়ানোর জন্য গারো পাহাড়, খাসিয়া পুঞ্জি, বোমপাড়া কিংবা চা-বাগানে দাঁড়িয়ে চা-শ্রমিকদের সাথে কয়েক মুহুর্তের ফটোসেশন বা আদিবাসী নারীদের ছবি দিয়ে তৈরী অভিজাত বর্ষ পঞ্জিকা, মণিপুরী শাড়ী/ চাদর বা বাণিজ্য মেলায় সস্তায় কিনতে চাওয়া রাঙ্গামাটির হস্তশিল্পের পণ্য।আমরা আদিবাসীদের বেঁচে থাকার সংগ্রামে জয়ী হওয়ার সংবাদের চেয়ে পরাজিত হয়ে সস্তাায় ভিটে-মাটি বিক্রি করে নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে উজ্জীবিত হই। নিজেদের ইতিহাস বর্ণনায় অতীতে ফিরে গিয়ে আমরা অন্যের শোষণে নিপীড়িত হওয়ার কথা যতোবার স্মরণ করি, ততোবার বর্তমানে চোখ রেখে লজ্জাবনত হইনা; আমাদের সাম্রাজ্যবাদী শোষণে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার এইসব মানুষকে নিপীড়িত হতে দেখে।

সিলেট অঞ্চলের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষেরা দুর্গম পাহাড় আবাদ করে নিজেদের নিভৃত পল্লী তৈরী করেছে। সীমাহীন প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের নিজস্ব জীবনবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে যতেœর সাথে লালন করছে। এইসব মানুষের কাছে পাহাড় পবিত্র, নদী-ঝরণা-পাথর-বৃক্ষ সবই পবিত্র। তাদের কাছে বৃক্ষের মৃত্যু মানে নিজেদের মৃত্যু, পাহাড়ের ধ্বংস মানে নিজেদের ধ্বংস, নদীর কান্না মানে নিজেদের কান্না। অরণ্যহীন জীবন তাদের কাছে কালাপানির জীবন। আদিবাসীদের পাহাড়চ্যুত ও অরণ্যচ্যুত করতে আমরা প্রতি নিয়ত নানা ধরনের কূটকৌশল তৈরী করছি। আমাদের কুবুদ্ধির কাছে এইসব সহজ-সরল অরণ্যচারী মানুষেরা লড়াই করতে পারে না। তারা বিনা যুদ্ধে হার মানে। বসত-ভিটা, পুঞ্জি, জুমক্ষেত সবকিছু ফেলে তারা পিছু হটে। আমরা হায়েনার মতো সামনে আগাই। আমাদের নাগরিক জীবনের প্রয়োজনে কতোকিছুই না আমরা দখল করতে চাই- বাঁশমহাল, ঘন বৃক্ষের বন, টলমলে জলের জলাভূমি, সবুজ পাহাড় । নদীর হৃদয় খনন করে হাজার হাজার ট্রাক পাথর আমরা তুলে আনতে পারি । আমাদের প্রয়োজনের কোনো শেষ নাই। আমরা প্রকৃতি ধ্বংস করি । আবার প্রকৃতির বিরূপ আচরণে আতঙ্কিত হয়ে সভা-সেমিনার করি । আমরা জানিনা পাহাড় কিভাবে বাঁচাতে হয়, অরণ্য কিভাবে গড়ে তুলতে হয়, নদীর জল কিভাবে নিটোল স্বচ্ছ রাখতে হয়। আমরা জানি শুধু এগুলোর ধ্বংস প্রক্রিয়া । আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা জানে প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নিজ নিজ অঞ্চলের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রকৃতির এ সকল উপাদানকে কিভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, কিভাবে গভীর মমত্ববোধের সাথে এ দেশের অরণ্য, নদী, পাহাড় ও জীববৈচিত্রের সাথে পারস্পরিক মিশ্রত্রিয়া গড়ে তোলে প্রকৃতিতে টেকসই বাস্তু-ব্যবস্থাপনা তৈরী করা যায়।

সিলেট অঞ্চলের আদিবাসীদের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় খাসিয়াদের কথা। খাসিয়ারা জৈন্তা-খাসিয়া পাহাড়ের আদিবাসী জনধারা। ১৯৯১ সালের আদম শুমারী অনুযায়ী সিলেটে খাসিয়াদের সংখ্যা ১৩,৪১২ জন। ১৯৭১ সালেও এদেশে খাসিয়াদের সংখ্যা ছিল ৬০,০০০ জন। বর্তমানে খাসিয়ারা সিলেট বিভাগের জৈন্তা, গোয়াইনঘাট, ছাতক, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলায় বাস করে। খাসিয়ারা পান-সুপারী, কমলা ও আনারস চাষের মাধ্যমে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে। খাসিয়াদের গ্রামকে বলা হয় পুঞ্জি। বর্তমানে খাসিয়াদের ৮২ টি পুঞ্জি আছে। এই পুঞ্জিগুলোর অধিকাংশের বর্তমান দাবীদার বাংলাদেশের বন-বিভাগ। খাসিয়ারা তাই আতঙ্ক নিয়ে ঘুমোতে যায়- কবে, কখন বন-বাবুরা উচ্ছেদের নোটিশ পাঠান। বন-বাবুরা ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা খাসিয়াদের পান-পুঞ্জির দিকে, জুম-ক্ষেতের দিকে প্রতি নিয়ত অভিযোগের আঙ্গুল তোলেন- খাসিয়ারা নাকি বন ধ্বংস করে ।

সিলেটের জাফলং পর্যটন এলাকা হিসাবে আজ সারাদেশে সমাদৃত। জাফলং-এর পিয়াইন ও ডাউকি নদীর তীরে ছিলো খাসিয়াদের অনেকগুলো পুঞ্জি- যেখানে তাদের নারীরা নিঃসঙ্কোচে ডাউকি’র জলে স্নান করতে যেতো, শিশুরা ঘুরে বেড়াতো অকৃত্রিম প্রকৃতিতে। তাদের জীবন ছিলো সহজ-সরল কাব্যময়। বর্তমানে পুঞ্জির সংখ্যা হ্রাস পেয়ে কয়েকটি পুঞ্জি বিদ্যমান আছে। এই পুঞ্জিগুলোর মধ্যে সংগ্রাম পুঞ্জি টিকে আছে প্রায় ৫০টি খাসিয়া পরিবার নিয়ে। এই পরিবারগুলোর জীবন সংগ্রামের কথা শুনলেই সিলেট অঞ্চলের আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার সকল জনগোষ্ঠীর জীবন-যাত্রার উপাখ্যান সহজবোধ্য হবে। সংগ্রাম পুঞ্জির খাসিয়াদের কাছে বেঁচে থাকা মানে চোখ-কান-নাক সব বন্ধ করে জীবনটা পার করে দেয়া। তাদের পুঞ্জির কাছে অবিরাম পাথর ভাঙ্গার ক্রাশার মেশিনের তীক্ষœ শব্দ, বাতাসে ধুলির মেঘ, নদী জুড়ে দৈত্যাকৃতির এস্কেপেটর মেশিনে নদী ধর্ষণ, বাঙ্গালী বারকী শ্রমিকদের দিনমান হট্টগোল। এর উপর রয়েছে অনাহুত পর্যটকদের অযাচিত অসভ্য আচরণ, বিনা অনুমতিতে খাসিয়া বাড়ীতে প্রবেশ, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, খাদ্যবর্জ ত্যাগ, তাদের নারীদের উত্যক্ত করাসহ নানাবিধ মৌলিক অধিকার হরণের প্রচেষ্টা । এইসব বিড়ম্বনাকে নিয়তি মেনে নিয়ে খাসিয়ারা বেঁচে আছে। শ্রীমঙ্গলের মাগুরছড়ার অগ্নিকান্ডের কথা সবাই ভুলে গেলেও মাগুরছড়ার খাসিয়া পুঞ্জির মানুষ আগুনের সেই লেলিহান শিখার কথা ভুলেনি। সেই আগুনের তীব্রতায় পুঞ্জি ছেড়ে পালিয়ে আসা খাসিয়াদের ঘর-বাড়ী সব লুটপাট হয়ে যায়। তাদের সাজানো গোছানো পুঞ্জি জুড়ে ছিলো ধ্বংসের তান্ডব। সেই ক্ষত এখনো সবাই সারাতে পারেনি । সিলেটের বিভিন্ন চা-বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাগান সংলগ্ন খাসিয়াপুঞ্জির বিরোধ নিত্যকার ঘটনা । বাগান পুঞ্জির জায়গা দখলে নিয়ে যেতে চায় । পুঞ্জি উচ্ছেদে চলে প্রভাবশালী বাগান মালিকদের তৎপরতা । মৌলভীবাজার জেলার কুলাউরা উপজেলার ঝিমাই চা বাগান ঝিমাইপুঞ্জি, শ্রীমঙ্গল উপজেলার নাহার চা বাগান আসলমপুঞ্জি ও কাইলংপুঞ্জি, হবিগঞ্জ জেলার চুনারঘাট উপজেলার হাতিমারা চা বাগান বৈরাগীপুঞ্জি উচ্ছেদ করতে চায় । খাসিয়াদের পানজুমের বড় বৃক্ষগুলো কেটে নিতে চায় । এক্ষেত্রে খাসিয়াদের সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিকার না করে প্রশাসন ও বন বিভাগ চা-বাগানের সহযোগী হয় ।pranerbanglaA2ssa

সিলেট সদর উপজেলার টুলটিকর ইউনিয়নের দলদলি চা বাগান ও টিলাগড় ইকো-পার্কের মধ্যবর্তী এক শহরতলী বালুচর । এই বালুচর এলাকায় ওঁরাও নামের এক ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীর কিছু পরিবারের বসবাস । যদিও সিলেটের অনেকের কাছেই এই ওঁরাও সম্প্রদায়ের বসতির কথা অজানা এবং জানাটাও অপ্রয়োজনীয় ।
এক সময় ছোট ছোট টিলা ও পাহাড়ি ছড়া (খাল) বেষ্টিত ছিল সিলেট শহরের উত্তরপূর্ব সীমানার এই বালুচর এলাকা । এম সি কলেজের ঐতিহ্যবাহী ছাত্রাবাসের সীমানা পেরিয়ে দূর পাহাড়ের আড়ালে বসতি গড়ে তোলে আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার । তাঁদের ভাষ্যে তাঁরা এখানে এসেছিলো ব্রিটিশ আমলে । ধীরে ধীরে এখানে তাঁদের নিজস্ব এক রাজ্য গড়ে ওঠে । সেই রাজ্যে ছিল তাঁদের; এক মুকুটহীন রাজা । সেই রাজা বা রাজ্যের কোন ঠাটবাট ছিল না । ছিল কেবল সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের চর্চা । সেই রাজ্যের বাসিন্দা ছিল শ’খানেক নিরীহ ওঁরাও পরিবার । এখন আট / দশটি ঘরের বস্তি দেখে যদিয় এসব কথা কেউ বিশ্বাস করবে না । সেই বস্তি ‘চন্দন টিলা’ নামের এক মুমুর্ষ টিলায় অবস্থিত । যে টিলার চারপাশ থেকে প্রায় রাতেই খাবলে খাবলে তুলে নেয়া হয় মাটি । সেই টিলাতে এখনো কোন রখমে বেঁচে আছে কিছু দুঃখী মানুষ । এই রাষ্ট্রের কাছে হয়তো ওরা মানুষ নয়, ওরা ওঁরাও… ।

সিলেটের প্রকৃত ভুমিসন্তান পাত্র সম্প্রদায় । কোনো সুনির্দিষ্ট প্রাচীন ইতিহাস না থাকলেও তাদের সম্পর্কে লোকশ্রুতি রয়েছে সাতশত বছর পূর্বে সিলেট বা শ্রীহট্টের নৃপতি গৌড়গোবিন্দ তাঁদের পূর্বপুরুষ । যদিও রাজা গৌড়গোবিন্দ ও পাত্রদের সম্পর্কে এ পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়নি বা ইতিহাসে তাদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নাই । তবে সিলেট সদর, জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পাত্রদের বসতী রয়েছে । পাত্রদের গ্রামকে বলা হয় ‘গুল’ । তাই সিলেটে কালারগুল, চিকনাগুল, রাতারগুল ইত্যাদি নামকরণ পাত্রদের বসতীর কথা স্মরন করিয়ে দেয় ।
সিলেটের আদিবাসী জাতি সমুহের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থায় আছে মণিপুরী সম্প্রদায় । মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ, বডলেখা, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া উপজেলা, হবিগঞ্জ জেলা, সুনামগঞ্জ জেলা ও সিলেট জেলার সদর ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় মনিপুরীদের বসবাস । তাদের প্রধান পেশা হচ্ছে কৃষি কাজ, বস্ত্র বয়ন, চারু ও কারু কাজ, চাকুরী। মৈতেই, বিষ্ণুপ্রিয়া এবং পাঙ্গাল এই তিন ধরনের সম্প্রদায়ে মুনিপুরিরা বিভক্ত। এগুলোর মধ্যে প্রথম দুই সম্প্রদায় বৈষ্ণব মতাবলম্বী এবং ত্তৃীয, সম্প্রদায ইসলাম ধর্র্মের অনুসারী। বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানা হচ্ছে বাংলাদেশী মণিপুরীদের সর্ববৃহৎ আবাসভূমি। স্থানীয় বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায় শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক অগ্রসর। মুণিপুরী ন্ত্যৃকলা বর্তমানে দেশে বিদেশে সুনাম অর্জন করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান বিচারপতি মনিপুরি সম্প্রদায়ের মানুষ ।

সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্বরপুর, তাহিরপুর,ধর্মপাশা ও মধ্যনগর থানার কিছু অংশে হাজংদের বসবাস।তাদের প্রধান পেশা হচ্ছে কাপড় বোনা। তাদের মধ্যে অনেকে আবার কৃষিকাজ করে থাকে। তারা সাধারনত হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং পিতৃতান্ত্রিক পরিবার প্রথায় বিশ্বাসী। তারা মৃতদেহ দাহ করে। তাদের ভাষা সাধারনত তিব্বতীয় বর্মী শাখাভূক্ত হলেও এতে প্রচুর বাংলা আসামী শব্দের মিশ্রন ঘটেছে ।

সিলেটের আদিবাসী সম্প্রদায় সিলেটের গৌরব । তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষা করা সিলেটের নৃত্বাত্তিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের জন্য জরুরী । আদিবাসীদের জীবনধারা বদলাতে চাপ প্রয়োগের প্রয়োজন নেই, অরণ্যের নীরবতা ভাঙ্গতে নেই, নদীর যাত্রাপথে ব্যারিকেড দিতে নেই, পাহাড়ের উচ্চতাকে সমতলে মেলাতে নেই। প্রকৃতির সাধারণ নিয়মে হস্তক্ষেপ করলে তার ফলাফল শুভ হয়না। আদিবাসীরা প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলে। প্রকৃতির কাছে তারা আত্ম-সমর্পিত। তাদের সংস্কৃতিতে ভূমি হলো মা, সেই ভূমিতে গড়ে উঠা অরণ্যের মাঝে আদিবাসীরা মাতৃস্নেহ অনুভব করে । কেউ কি মা ও মায়ের স্নেহ অন্যের কাছে বিক্রি করে দিতে পারে ? তাই ভূমি বা অরণ্যকে আদিবাসীরা বেচা-কেনার পণ্য মনে করেনা। তাদের কাছে অরণ্য মানে জীবন। অরণ্য বিপন্ন হলে আদিবাসীরা তাদের জীবনকেও বিপন্ন ভাবে। তাই জাফলং জুড়ে যখন পাথর উত্তোলনের মহোৎসব হয় ডাউকি ও পিয়াইন নদীর হৃদয় ক্ষরণ করে যখন নগরায়নের রসদ সংগৃহীত হয়- আদিবাসীরা তখন এই লুটপাট দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষের সঙ্গে পরিবেশের যে নিবিড় বন্ধন রয়েছে তা অনুধাবন করতে হবে। আদিবাসীদের প্রকৃতির সহায়ক শক্তি হিসাবে মেনে নিয়ে তাদের জীবন ও সংস্কৃতি, তাদের এলাকার প্রকৃতি ও পরিবেশ, তাদের ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে । এই সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালীকে । আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাঙ্গালীদের পারস্পরিক সহযোগিতা-সংহতি-সহমর্মিতার দ্বার খুলে দিতে হবে। এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালীকে পরিচয় দিতে হবে দায়িত্বশীলতার । আমরা পাকিস্তানী শাষকের নিপীড়ন থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তার আলোকে এইসব ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হতে হবে। তারা এদেশের সন্তান। তাদের প্রতি কোনোরূপ বৈষম্য যেন না করা হয়- এজন্য সুশীল সমাজসহ সকল বিবেকবান নাগরিকদের উচ্চকন্ঠ হতে হবে। জাতিসংঘের ”মানবাধিকার ঘোষণা”, আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের ”বিশেষ ঘোষণা” ও আদিবাসী বিষয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিভিন্ন কনভেনশন ও ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী বাংলাদেশে আদিবাসীদের বিভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একথা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, আদিবাসীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার সংরক্ষণের মাধ্যমে সিলেট তথা বাংলাদেশের বন, পাহাড় ও সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহের পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষা করা সম্ভব ।
আব্দুল করিম কিম