তখন ছিল মন ভালোর সময়

pranerbanghlaA2bB

রিনি বিশ্বাস

চৈত্র বৈশাখের বিকেল সন্ধ্যেগুলো বড্ড মন উদাস করে.. প্রচন্ড গরমের দুপুর শেষ হওয়ার পর বিকেলটা আস্তে আস্তে ফুরিয়ে গিয়ে যখন সন্ধ্যে নামে ব্যস্ত শহরে, সবাই যখন ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োচ্ছে -তখন এক-একটা কাজ না থাকা সন্ধ্যে , আমার বড্ড নিজের হয়ে আসে.. একচিলতে শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ির একফোঁটা ব্যালকনির গায়ে সার দিয়ে রাখা আমার সাধের গাছে জল দিই, আর কেন যেন যাদবপুরে পড়ার দিনগুলো মনে পড়ে! ক্লাস শেষে মাঠে বসে আড্ডা, বন্ধুরা মিলে হইহই করতে করতে ক্যান্টিনে যাওয়া, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে চারপাশের সবুজ মেখে দিনশেষে ঘরমুখো হওয়ার দিনগুলো এখনও স্পষ্ট… পড়তাম মেয়েদের স্কুলে। মা তাঁর মেয়েকে নিজের স্কুলে (যেই স্কুলের তিনি ছাত্রী) ভর্তি করেছিলেন খানিক জেদ করেই। স্কুলে পড়ার সময় ছেলেদের সঙ্গে কোনরকম বনধুত্ত হওয়ারও সুযোগ হয়নি। হল, যাদবপুরে ভর্তি হবার পর। তখন অবশ্য আলাদা করে ‘এটা ছেলে বনধু, ওটা মেয়ে’ ভাবার অবকাশ ছিলনা। তখন ছিল মনভালোর সময়। তখন ছিল মনের মত সময়… বনধুতা নিয়ে তখন ছিল ভালো থাকার সময়.. ‘প্রেম কি’ সেটাও তো প্রথম যাদবপুরই শেখালো। প্রেম যে আসলে একটা বয়সে ভরপুর ছেলেমানুষি, উথালপাতাল পাগলামি, তাও তো প্রথম টের পাওয়া ওই সময়েই! নিত্যদিন এ বলে ‘জানিস অমুকের না তমুককে ভালো লাগে..’ বলেই একে অপরের গায়ে পড়ে কি খিল্ খিল্ হাসি! পরে সেই অমুক আর তমুকের ভালোলাগা ‘ভালোবাসা’ হয় কি না সেই খবরে অবশ্য কারুর উৎসাহ ছিলনা! ওই ভালোলাগার খবর পেতেই তখন ‘বে-শ’ লাগতো.. একটু এগিয়ে আসি, তখনও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে বেরোইনি। সঙ্গে শুরু হয়েছে আমার ‘সংবাদ পাঠিকা’র জীবন। ক্লাস আর খবর পড়া। দিব্যি চলছে পাশাপাশি। মাঝেমধ্যেই চিঠি আসে অফিসের ঠিকানায়। মূলত উৎসাহব্যঞ্জক চিঠি। প্রশংসার কথাই সাধারণত থাকে তাতে! একদিন এমনই একটা চিঠি এলো ‘খাস খবরের’ ঠিকানায়। উপরে পরিষ্কার হাতের লেখায় আমার নাম লেখা। এমন চিঠি আগেও যেহেতু কয়েকবার পেয়েছি এবং পরে যথারীতি ভুলে গেছি তাই তেমন আগ্রহ নিয়ে খুলিওনি মনে আছে বেশ… হয়ত খুলে পড়তামও না! পড়েছিলাম যে তার কারণ পত্রলেখকের হাতের লেখা!..এত সুন্দর হাতের লেখায় কেউ যদি চিঠি জুড়ে শুধুই নিন্দেও করে থাকেন, তবুও তা পড়তেই হত! অতএব চিঠিটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বাড়ি এনে সময় নিয়ে পড়েছিলাম.. যে লিখেছে সে ব্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনীয়ারিং পড়ে।

rain-drop

তারমানে বয়সে সে আমারই সমান.. গোটা চিঠি জুড়ে তার মুগ্ধতার বয়ান.. ‘রিনি’কে সে খবর পড়তে দেখেছে টেলিভিশনের পর্দায়, তার ভালো লেগেছে রিনিকে… সেই ভালোলাগা তার প্রত্যেক শব্দচয়নে মাখামাখি.. স্বীকার করি, এত অপূর্ব ভালোলাগার বহিঃপ্রকাশ দেখার সৌভাগ্য এজীবনে আজ অবধি আর ঘটেনি আমার…! কি কারণে তার এমন ভালোলাগার অনুভূতি হল, এমন করে সেই ভালোলাগা জানানোর ভাষা সে কোথায় পেলো, এত সুন্দর করে সে তা লিখলোই বা কি করে- পড়ে, অবাক হয়েছিলাম.. মুগ্ধও…. আর অনেকটা লজ্জা পেয়েছিলাম, মনে আছে… কারুর ভালোলাগা যে অন্য শিহরণ জাগায়.. রাঙিয়ে তোলে, সেই প্রথম বুঝেছিলাম… ভালোলাগার কথার সঙ্গেই বনধু হওয়ার আমন্ত্রণ ছিল সেই চিঠিতে… এমন আহ্বানের উত্তর দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু উত্তর দেওয়া হয়নি… কেন যে নিরুত্তর ছিলাম! ভাষা খুঁজে পাইনি, না কি লজ্জায় মনে হয়েছিল চুপ থাকাই শ্রেয়, না কি সাহসের অভাব! কি জানি! খুঁজলে চিঠিটা এখনো পাওয়া যাবে বাবাইয়ের কাছে; এখন আর খুঁজতেও সাহস পাইনা….. হঠাৎ হঠাৎ চেনা-অচেনা বনধুর মুখে এই না-দেখা বনধুকে দেখার চেষ্টা করি আজকাল… বয়স বাড়ছে যে টের পাই… পিছু হাঁটিএখন, কথায় কথায়.. আগে যা মনেও আসতো না, সেসব এখন মনে ভিড় জমায়.. হিসেবী হয়েছি আগের চেয়ে অনেকটা বেশি.. হয়ত জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সব হিসেব করতেই হয় হিসেব মেলানোর জন্য, তাই … শেষ চৈত্রর একলা সন্ধ্যেয় কোনো এক ভালোলাগা মুহূর্তকে ফিরে দেখার চেষ্টাও হয়ত বা সেই না-মেলা হিসেব মেলানোরই চেষ্টা… হয়ত….

(কলকাতা থেকে)