এটা এমনই আকালের দেশ যেখানে নান্দনিক বেদনা দেয়ার লোকেরও বড় অভাব- হেলাল হাফিজ

কোন এক ছুটির দিনের ফিনফিনে হাওয়ায় যেন ভাসছে শহর। ভীড়-ভারিক্কি নেই, মোটর গাড়ির হর্নের আর্তনাদ নেই। কবি হেলাল হাফিজের সঙ্গে কথা হয়েছিল আগেই। ঘড়ির কাটা মিলিয়ে সকাল-সকাল পৌঁছে গেলাম জাতীয় প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে। সেই একই ভঙ্গীতে বসে আছেন কবি। প্রায় চৌত্রিশ বছর আগে যেমন দেখেছিলাম। এরপর বহুবার আমাদের দেখা হয়েছে এই একই জায়গায়। কথা হয়েছে অবিশ্রান্ত। কবি বসে আছেন একা একটা টেবিলে, সামনে চায়ের কাপ। চেয়ারের পেছনে ঝুলছে তার বিখ্যাত কাপড়ের ব্যাগ। স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে হেসে স্বাগত জানালেন হেলাল হাফিজ আমাদের। আমার সঙ্গে লেখক, সাংবাদিক রুদ্রাক্ষ রহমান।
নোটপ্যাড আর কলম গুছিয়ে সামনে রাখতেই হাসলেন হেলাল হাফিজ। প্রশ্ন করলেন, কি করবে আমার সাক্ষাৎকার নিয়ে? আমার সোজা উত্তর, জানতে চাই আপনার কথা। হেলাল হাফিজ ভাবনার অন্তরালে সরে গেলেন যেন। তারপর বললেন, আমার কৈশোর কেটেছে খেলা নিয়ে। খেলতে ভালোবাসতাম। সেই সময়ে মাতৃহীনতার এক গভীর বেদনা আমার ওপর চেপে বসেছিলো পাথরের মতো। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও ক্রমশ একা হয়ে গেলাম। তখন ভেবেছি এই বেদনাকে খেলা দিয়ে প্রশমিত করবো। কিন্তু হলো না। তারপর প্রবেশ করলাম কবিতার পৃথিবীতে। আমি লিখতে শুরু করলাম। helal 1
নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় কবিতাটি তাকে দিয়েছে তারকা খ্যাতি। পাঠকের মুখে মুখে ফিরেছে এই কবিতার লাইন – ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ । হয়েছে দেয়াল লিখনও। ১৯৬৯ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে তিনি লিখেছিলেন কবিতাটি। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বরষের ছাত্র। হেলাল হাফিজ বলেন, গণঅভ্যূত্থান আমাকে দিয়ে এই কবিতাটি লিখিয়ে নিয়েছিলো। আমি কোনদিন মিছিলে যাইনি। রাজনীতির প্রবল স্রোতে ভাসিনি। কিন্তু এই কবিতাটির ভেতর দিয়ে মানুষের জাগরণ আমাকে স্পর্শ করেছিলো।
নিষিদ্ধ সম্পাদকীয় কবিতার প্রাথমিক খসড়া ছিলো আড়াই পৃষ্ঠার। তারপর চলে কাটা-ছাঁটা। কবিতা দাঁড়ায় আঠারো লাইনে। সাহিত্যিক আহমদ ছফা চূড়ান্ত লেখাটি পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন  বিশ্ববিদ্যোলয়ের তখনকার শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই কবিতা কোন প্রতিষ্ঠিত দৈনিকে ছাপা হয়নি। একটি ছোট কাগজে মুদ্রিত হয়েছিলো।
হেলাল হাফিজের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র গ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। এই বইয়ের কবিতাগুলো তাকে নিয়ে যায় খ্যাতির শিখরে। সংস্করণের পর সংস্করণ ছাপা হয় এই বই। এই খ্যাতির শিখরে বসে কি মনে হয়েছিল আপনার? আবারও হাসলেন কবি। মৃদু কন্ঠে বললেন, খ্যাতিমান হওয়ার পর আমার মনে হলো সবাই টাকা জমাতে চায় সামর্থ অনুযায়ী। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, কবিতা দিয়ে আমি মানুষ জমাবো।
একা মানুষ কবি হেলাল হাফিজ। চিরকুমার। এখন থাকেন তোপখানা রোডের একটি হোটেলে। প্রেসক্লাব তার দ্বিতীয় গৃহ। এই নিঃসঙ্গ সময় কীভাবে কাটালেন অথবা কাটাচ্ছেন এখনো জানতে চাইলে কবি বললেন, একদা আমার আশ্রয় ছিলো প্রেসক্লাবের জুয়ার টেবিল। আশ্রয় ছিলো, সিগারেট, মদ। এখন এই সবকিছুকেই বিদায় বলেছি। আসলে প্রত্যেক মানুষই একা, নিঃসঙ্গ। সংসার থাকলেই নিঃসঙ্গতা কাটে না। মধ্য যৌবনে নিঃসঙ্গতা কষ্ট দেয়নি। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এখন তা চেপে বসেছে। একটা সময় আমি ছিলাম জিগালো।এই শহরের বিত্তশালী রমণীরা আমার সঙ্গ কিনে নিতো টাকার মূল্যে। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত  এভাবেই কেটেছে জীবন। কিন্তু এখন এই হোটেলে এসে প্রথম কবিতা লিখলাম-তুমি আমার নিঃসঙ্গতার  সতীন হয়েছো। এই লাইন কখনো লিখতে হবে ভাবিনি। এখন আমার সময় কাটে ফেইসবুকে।
প্রেমের কবিতা হেলাল হাফিজের আঙুলে যেন পোষমানা পাখি। অসাধারণ সব কবিতা তিনি উপহার দিয়েছেন পাঠকদের। লিখেছেন সেই লাইন-এখন তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ/ পত্র দিয়ো…। লিখেছেন-কষ্ট নেবে, কষ্ট। প্রেমের প্রসঙ্গ উঠতেই বললেন, পুরো জীবন আমি প্রেমের মধ্যেই আছি। সব সময়ই তা-ই ছিলাম। প্রথম প্রেমের কথা জানতে চাইলে একটু আনমনা হলেন কি কবি? হয়তো। উত্তর দিলেন সময় না নিয়েই।
‘আমার প্রথম প্রেম সবিতা মিসট্রেস। নেত্রকোনা গার্সল স্কুলের শিক্ষিকা। আমার চাইতে বয়সে প্রায় বারো বছরের বড়ো ছিলেন। তার প্রেমে পড়ার প্রথম কারণ ছিলো মায়ের ছায়া। ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে, তখন আমি নারীদের ভেতরে মাতৃরূপকেই খুঁজে ফিরতাম। সকালবেলা স্কুলে যেতেন সবিতা। নেত্রকোনায় তখনও পাঁকা রাস্তা হয়নি। লাল সুরকি দেয়া পথ। তার গোড়ালিতে সেই লাল সুরকির ছোঁয়া লেগে থাকতো। সেই লাল রঙ লাগা গোড়ালি দেখার জন্য পথে দাঁড়িয়ে থাকতাম।মনে হতো আলতা পায়ে হেটে যাচ্ছেন। আমি ফুফাতো বোন রেনুর প্রেমেও পড়েছিলাম। সে-ও বয়সে বড় ছিল। আমি ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। তবে আমাকে প্রভাবিত করেছিলো সবিতা মিসট্রেস আর হেলেনের ভালোবাসা। আমার আর হেলেনের প্রেমের কাহিনি গোটা শহর জানে। হেলেনের সঙ্গে ভালোবাসা ভেঙ্গে যাওয়ার পর বহুকাল আমি অভিমা্ন করে বাড়ি যাইনি।
প্রশ্ন করেছিলাম কবি হেলাল হাফিজকে-জীবনে কী ভুলে যেতে চান? অদভুত উত্তর দিলেন তিনি। বললেন, আমার জীবনের অল্প কিছু সুখের স্মৃতি ভুলে যেতে চাই। এগুলো আমাকে প্রেরণা দেয় না। আমি মনে রাখতে চাই বেদনার কথা। নিজেও যত্নে তৈরী করি বেদনা। এটা এমনই আকালের দেশ যেখানে নান্দনিক বেদনা দেয়ার লোকেরও বড় অভাব।
কথা বলতে বলতে ঘড়িতে বেশ অনেকটা সময় গড়ায়। আমরা আমাদের স্থান বদল করে ফেলেছিলাম অনেকক্ষণ আগেই। ক্যান্টিন থেকে চলে এসেছি ক্লাবের লাইব্রেরীতে। একসময় কাগজ, কলম গোছাতে হয়। হেলাল হাফিজের তাড়া আছে। কোথাও একটা যেতে হবে। লাইব্রেরীরে দরজা ঠেলে আমরা বের হয়ে আসি বারান্দায়। বাইরে তখন গ্রীষ্মের দুপুর। শেষ প্রশ্ন করলাম-কাল যদি মরে যান আজ পাঠকদের উদ্দেশে কী বলে যাবেন?
কবি থমকে দাঁড়ালেন। একটু ভেবে বললেন, ভালোবাসা, ভালোবাসা আর ভালোবাসা। মানুষ মানুষকে ভালো বাসলে সব বদলে যাবে, যায় ।

অদ্বিত আহমেদ