শুভ জন্মদিন জুয়েল আইচ

jewel_aichবাবলু ভট্টাচার্য : কাগজ থেকে টাকা তৈরি কিংবা মানুষকে দ্বিখণ্ডিত করে আবার জোড়া লাগানোর কথা বলতেই সবার স্নায়ুতে যে বিষয়টি প্রথম কড়া নাড়ে সেটি যাদু। আর যাদুকে যিনি বিনোদন থেকে শিল্পের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে পরিচিত ও সম্মানিত করেছেন তিনি যাদুকর জুয়েল আইচ।

জুয়েল আইচ কেবল মাত্র যাদু শিল্পীই নন; একাধারে বাঁশিবাদক, চিত্রশিল্পী, সমাজসেবী ইত্যাদি নানা পরিচয়ে পরিচিত। এছাড়াও তাঁর আরেকটি পরিচয় রয়েছে- তিনি একজন দেশপ্রেমী মুক্তিযোদ্ধা। আর এই পরিচয়টিকেই তিনি সবচেয়ে মূল্যবান মনে করেন।

জুয়েল আইচের ছেলেবেলা কেটেছে পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার সমদেকাঠির গ্রামের বাড়িতে। সেই সুবাদে সমদেকাঠি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ সম্পন্ন হয়। পরে তিনি পিরোজপুর শহরে চলে আসেন। সেখানকার সরকারি হাইস্কুল থেকে এস.এস.সি. এবং স্থানীয় কলেজ থেকে এইচ.এস.সি. পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এছাড়াও শিক্ষকতার সুবাদে তিনি ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে বি.এড. কোর্স সমাপ্ত করেন।

বাবার আঁকাআঁকির কারণে জুয়েল আইচের আকর্ষণ জন্মে চিত্রশিল্পের প্রতি। আবার ছোট বেলায় গ্রামের মেলায় বাঁশি দেখে এবং বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বেদেদের বাঁশি বাজানো দেখে তাঁর আগ্রহ জন্মেছিল বাঁশি বাজনোর প্রতি। তবে যাদুর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ভিন্ন। কারো যাদু দেখে নয়, কেবল বই পড়েই যাদুর প্রতি মোহাবিষ্ট হন তিনি। ছোটবেলা থেকেই যাদুর প্রতি একটা অন্যরকম টান অনুভব করতেন। বন্দে আলী মিয়ার ‘রূপকথা’ তাঁকে টেনে নিয়ে যেত যাদুর দেশে। যাদুর পাশাপাশি আঁকাআঁকি এবং বাঁশিটাকে এখনো ধরে রেখেছেন তিনি।

প্রথমদিকে এক ধরনের ভাললাগা থেকেই যাদু ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ শুরু হয়। কিন্তু একটা সময় তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরে পাকিস্তানের সঙ্গে এক হকি ম্যাচে বাংলাদেশ ১৭ গোলে হেরে যায়। মুক্তিযোদ্ধা জুয়েল আইচ এভাবে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের হেরে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেননি। কষ্টে তাঁর বুক ভেঙ্গে যাচ্ছিল। এরপর শপথ নেন, যেভাবেই হোক বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে সম্মানের আসনে বসাতেই হবে। সেই থেকেই জোরেসোরে যাদুর চর্চা শুরু।img_1250

আমাদের যাদুর হাজার বছরের ঐতিহ্যের ইতিহাস তিনি জানতেন। বাংলাদেশের মাথা উঁচু করার হাতিয়ার হিসেবে তাই নিজের জানা ক্ষেত্রকেই বেছে নেন। এরপরের ইতিহাস কেবল সামনে চলার। তাঁর যাদু শিল্পে আসাটাকে তিনি সম্পূর্ণই মুক্তিযুদ্ধের ফসল বলে মনে করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ রাজধানী ঢাকার দিকে ছুটতে লাগল। জুয়েল আইচ করলেন বিপরীত কাজটি। তিনি ঢাকা ছেড়ে চলে গেলেন গ্রামে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণ হিসেবে তিনি শিক্ষার অভাবকেই প্রধান মনে করতেন। শিক্ষার বিষয়টা শহরের চেয়ে গ্রাম থেকেই সবচেয়ে ব্যাপকভাবে আরম্ভ করা উচিত বলে মনে হয়েছিল তাঁর। তাই শিক্ষকতা দিয়েই কর্মজীবন শুরু করেন জুয়েল আইচ।

হঠাত্‍ ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঘটে এক মারাত্মক দুর্ঘটনা। স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদল ডাকাত তাঁর বন্ধু নিটুল করের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। ওই বন্ধুর বাড়িতেই ছিল জুয়েল আইচের যাদুর সমস্ত সরঞ্জাম, বইপত্র। একাত্তরের পরে মাত্র ছ’বছরের মাথায় তিনি দ্বিতীয়বারের মত সর্বস্ব হারান। এরপর শিক্ষকতা ছেড়ে ঢাকায় ফিরে এসে নিজেকে জড়ালেন যাদু শিল্পে। তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে লাগল টেলিভিশনে, মঞ্চে, দেশে, বিদেশে।

বাংলাদেশে যাদুর সম্রাট হিসেবে পরিচিত এই গুণী শিল্পী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন। জুয়েল আইচ যখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র তখন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তারুন্যের রক্ত টগবগ করছে তাঁর শরীরে। উপলব্ধি করলেন পাকিস্তানের নির্যাতনে বাংলাদেশীদের দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। যুদ্ধ ছাড়া আর কোনো পথ নেই। ওদের শোষণ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটাই উপায় আর সেটা হল সশস্ত্র সংগ্রাম। তাই জীবনের মায়া ছেড়ে নেমে পড়লেন হিংস্র হায়ানাকে বধ এবং দেশকে শৃংখলমুক্ত করার সংগ্রামে। পিরোজপুর জেলার স্বরুপকাঠি থানার পেয়ারাবাগান নামক স্থানে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে হঠাতে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের নেতৃত্বে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর।

পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কখোনো গেরিলা যুদ্ধে আবার কখনো সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। অনাহার, অনিদ্রা, পায়ের গভীর ক্ষত, চিকিত্‍সাবিহীন ‘সুইসাইড মাইগ্রেন’ নিয়ে দিনরাত ছোটাছুটি আর নিষ্ঠুরতর প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধের কথা ভাবলে জুয়েল আইচ আজো শিউড়ে ওঠেন। অসংখ্য প্রিয়জনকে হারানোর স্মৃতি তাঁর হৃদয়কে এখনো ভারাক্রান্ত করে। নিজের জীবন রক্ষা পেলেও পাক হানাদার এবং তাদের দোসরদের হাতে সহায় সম্বল সবই হারান। সম্পূর্ণ নিজস্ব অবস্থায় নতুন করে আবার জীবন শুরু করেন। স্বাধীনতার গৌরব ছাড়া তখন তাঁর আর কিছুই ছিলনা।

দেশের প্রয়োজনে জুয়েল আইচ ১৯৭১ সালে কোমল তুলি, বাঁশি আর যাদু দন্ড ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। তেমনি সমাজের প্রয়োজনে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ যখন চরমে তখন তিনি রাজপথে নেমে এসেছেন। অংশ নিয়েছেন ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক সচেতনতা অভিযানে। তাছাড়া ধূমপান বিরোধী অভিযানে তার অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি যুক্ত ছিলেন ‘আমরা ধুমপান নিবারণ করি (আধুনিক)’ এর সাথে। তাঁর এ অভিযানের প্রেক্ষিতে সরকার সিগারেটের প্যাকেটে “সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর” কথাটি লেখার নিয়ম চালু করে। এসিড সন্ত্রাস বিরোধী প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে যুক্ত রয়েছেন এসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) সঙ্গে। এছাড়াও পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামে ‘পরিবেশ আন্দোলন’ এবং মাদক বিরোধী অভিযান ‘মাদককে না বলো’-এর সঙ্গে জুয়েল আইচ ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

এখানেই তিনি সমাপ্তি টানেননি। মৃত্যুর পরও কিভাবে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখা যায় সেই ভাবনায় মরণোত্তর দেহ দান করেছেন তিনি। গড়ে তুলেছেন মানব কল্যাণে মরণোত্তর দেহদাতা সমিতি। তিনি এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক।

জুয়েল আইচের রয়েছে বিশাল সংগ্রহ ভাণ্ডার। এ সংগ্রহশালার অধিকাংশই বই। এর মধ্যে যাদুর বইতো আছেই, আরো আছে প্রবন্ধ ও কবিতার বই, দর্শন, উপন্যাস, জীবনী, আত্মজীবনী, আত্মউন্নয়ন, নৃতত্ব, স্বাস্থ্য, মনোবিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোলসহ বিচিত্র ধরনের হাজার হাজার বই। তাঁর সংগ্রহে এমন অনেক দুর্লভ বই রয়েছে যার প্রকাশ বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে।

তাঁর সংগ্রহের আরেকটি ভিন্ন বিষয় হলো বাঁশি। তাঁর সংগ্রহশালায় কয়েকশ দেশী-বিদেশী বাঁশি রয়েছে। তিনি নিয়মিত বাঁশি বাজান। তাই সংগ্রহ করেছেন দেশ বিদেশের নানা আকারে নানা ধরনের অসংখ্য বাঁশি। নিজে আবিষ্কার করেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার একটি বাঁশী। পন্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া এই বাঁশীর নাম রেখেছেন ‘জুয়েল বাশী’। বড় বাঁশী বাজাতে গেলে নিজের ঘাড় অনেকখানি বাঁকাতে হয় যা অনেক বেশি কষ্টসাধ্য। তাই নিজের ঘাড় না বাঁকিয়ে বাঁশীর ঘাড় বাঁকিয়ে দিয়েছেন। প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে তৈরী এই বাঁশীর আকৃতি অনেকটা ইংরেজী ৭ এর মতো।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এই গুণী শিল্পী বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। পেয়েছেন দেশসেরা জাতীয় পুরস্কার ‘একুশে পদক’। অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে কাজী মাহমুদুল্লাহ স্বর্ণপদক, বাংলাদেশ টেলিভিশন অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেরা জাতীয় পুরস্কার বেস্ট ম্যাজিসিয়ান অব দ্য ইয়ার। সোসাইটি অব অ্যামেরিকান ম্যাজিসিয়ান ১৯৮১ সালে জুয়েল আইচকে এ পুরস্কারে ভুষিত করে। এছাড়া ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ফ্রান্স, মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ থেকে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর দখলে প্রায় দেড়শ’র মতো পুরস্কার রয়েছে।

স্ত্রী বিপাশা আইচ ও একমাত্র মেয়ে খেয়া আইচকে নিয়ে সংসার জুয়েল আইচের। স্ত্রী বিপাশা একদিকে সংসার এবং অন্যদিকে তাঁর যাদুর সহযাত্রী। এ দু’টি ক্ষেত্রই জুয়েল আইচের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছে স্ত্রী বিপাশা। সংসারের পাশাপাশি যাদুতে স্ত্রী বিপাশার অনুপ্রেরণার কথা অকপটেই স্বীকার করেন জুয়েল আইচ।

জুয়েল আইচ ১৯৫০ সালের আজকের দিনে (১০ এপ্রিল) পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার সমদেকাঠিতে জন্মগ্রহণ করেন।