ঘুরে আসুন ভাসমান বাজার থেকে

অনেক বছর আগে “ওয়াটার ওয়ার্ল্ড” মুভি দেখে একটা ফ্যান্টাসি কাজ করতো,  এই কি সম্ভব পুরো একটা গ্রাম পানির উপর ! অনেক পরে জানলাম ভারত, চায়না , থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ এবং আরও কিছু কিছু দেশে  এ রকম  গ্রাম ও বাজার আছে যা পানির উপর ভাসমান । এইসব ভাসমান বাজার কে ইংলিশ এ “ফ্লোটিং মার্কেট” বলে।  কিন্তু আজ আমি কোন বিদেশী দেশের এমন ভাসমান  বাজার বা গ্রাম এর কথা বলবো না। আমাদের বাংলাদেশ এ আছে এক জলের স্বর্গ রাজ্যে। বলছিলাম বরিশাল-পিরোজপুরের-ঝালকাঠির নদী আর গ্রামের ভেতর বয়ে যাওয়া খালগুলোর কথা।  সবুজ যে কতোটা সবুজ হতে পারে, প্রকৃতি যে কতোটা সুন্দর হতে পারে ওখানে গেলেই তা জানতে পারবেন।  আর আজ এখানেই আমাদের গন্তব্য। আপনি যদি যান জুলাই থেকে অক্টোবরের মাঝে তবে দেখা পাবেন অপার্থিব এক সুন্দর বাজারের। সেটা হলো ভিমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজার। বাংলাদেশের উৎপাদিত মোট পেয়ারার প্রায় ৮০ ভাগই উৎপাদিত হয় ঝালকাঠির বিভিন্ন গ্রামে। আটঘর, কুরিয়ানা, ডুমুরিয়া, বেতরা, ডালুহার, সদর ইত্যাদি এলাকার প্রায় ২৪ হাজার একর জমিতে পেয়ারার চাষ হয়। আর এ পেয়ারা বেচাকেনার জন্য ঝালকাঠির ভিমরুলিতে জমে ওঠে বাংলাদেশের সবচে বড় ভাসমান বাজার। প্রতি মৌসুমে এ বাজারে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে পেয়ারা চাষিরা তাদের ক্ষেতের পেয়ারা নিয়ে আসে এ বাজারে। আর ক্রেতারাও আসে অনেক দূর থেকে। সাধারণত নৌকায় থাকা পুরো পেয়ারাই এক লটে কেনাবেচা হয়। ভরা মৌসুমে এক নৌকা পেয়ারা মাত্র ৩০০ টাকায়ও কিনে নেওয়া যায়।IMG_8506-626x365

বরিশালে প্রতি এলাকাতেই একটি নদী নিদেন পক্ষে একটি খাল রয়েছে। ভরা বর্ষায় তো বটেই, শীতকালেও এসব খালে পানি প্রবাহ থাকে। তাই বছর ভর ঘুরে বেড়ানো যায় শান্ত স্নিগ্ধ এ এলাকায়। ছোট খালের দুই পাশে কোথাও ফসলের মাঠ, কোথাও পতিত ভূমি কোথাও বা বসতবাড়ি- সব কিছুই ছবির মতো মনে হবে আপনার কাছে। কিছুক্ষণ পর পর আছে গ্রামীণ ছোট বাজার। আর সে বাজারের আছে টাটকা সব শাকসবজি। দুপুরে খেতে চাইলে আছে তারও ব্যবস্থা। পানিপ্রধান অঞ্চল বলে স্বভাবতই এখানকার জীবনযাত্রায় নৌকার ভূমিকা প্রবল। কতটা প্রবল তা এখানে না এলে বোঝা যাবে না। কিছু কিছু এলাকার অধিবাসীদের বাণিজ্যের বেশ বড় অংশ চলে জলে বসে। আর এ কারণেই বরিশাল, পিরোজপুরে আর ঝালকাঠিতে গড়ে উঠেছে অনেক ভাসমান বাজার। বরিশালের বানারীপাড়ার সন্ধ্যা নদীতে প্রতি শনি এবং মঙ্গলবার বসে বিশাল ধান আর চালের ভাসমান বাজার। খুব সকাল থেকেই কয়েকশ নৌকায় করে কারবারি ও গৃহস্থরা ধান চাল নিয়ে আসে বিক্রির জন্য। অনেকে আসে খালি নৌকা নিয়ে চাল কিনতে। পুরো প্রক্রিয়াটাই চলে নদীতে বসে। ধানের বাজার ছাড়াও আছে ভাসমান সবজি বাজার। নাজিরপুরের বৈঠাকাঠা, উজিরপুরের হারতা, মাহমুদকাঠিসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় আছে এ সবজি বাজার। এখানেও স্থানীয় মানুষজন তাদের শাকসবজি নৌকায় করে নিয়ে এসে নৌকায় করেই বিক্রি করে থাকে। সকাল থেকেই জমে ওঠে এ বাজার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত লাল শাক, পালং শাক, পুঁই শাক, কলা, চিচিংগা, বরবটি, শশা, টমেটো, ঢেড়শ, মূলা ইত্যাদি নানা সবজি দিয়ে ভরপুর থাকে এসব নৌকায়। অসাধারণ ফটোজেনিক জায়গা এটি। বলা যায় ফটোগ্রাফারদের স্বর্গরাজ্য। শান্ত জলের মাঝে সবজি বোঝাই নৌকাগুলোতে বেচাকেনা চলে হরদম।

কিভাবে যাবেনঃ   আপনি যদি ২ রাত ১ দিন সময় পান হাতে, দেখে আসুন দক্ষিণ বাংলার অপার সে সৌন্দর্য, অনুভব করে আসুন বাংলার রূপ। ঢাকা থেকে সড়ক ও নৌ পথ দুই ভাবেই যাওয়া যায়। সড়ক পথে ঢাকার গাবতলি থেকে বরিশাল এর বাস ছাড়ে ভাড়া ৪০০ টাকা। এছাড়া আপনি মাওয়া যেয়ে লঞ্চে বা স্পীড বোটে ওপাড়ে যেয়ে বিআরটিসি বাসে করে বরিশাল যেতে পারবেন। বরিশাল এর নতুল্লাবাদ থেকে বাসে অথবা সি এন জি করে যেতে হবে বানারিপাড়া। সি এন জি তে ভাড়া নিবে ৪০/৫০ টাকা। তারপর সেখান থেকে নসিমনে ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে যাবেন কুড়িয়ানা। একটু হেটে একটা ব্রীজ পাড় হয়ে আবার অটো করে ৫ টাকা ভাড়ায় চলে যেতে পারবেন আটঘর ও কুড়িয়ানা বাজারে।আর ভিমরুলি যেতে চাইলে বানারিপাড়া থেকে নৌকা বা ট্রলারে যাওয়াই ভালো। অথবা নৌ পথে ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন পিরোজপুর/বরিশাল এর লঞ্চ ও ষ্টীমার ছাড়ে বিকেল ৫ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত। ডেকের ভাড়া ২০০/২৫০ টাকা আর কেবিন সিঙ্গেল ১০০০/১২০০ এবং ডাবল ১৮০০/২০০০ টাকা। আপনি পিরোজপুরের হুলারহাট নেমে চলে যাবেন বানারিপারা। বানারিপারা থেকে উপড়ে উল্লেখিত নিয়মে যেতে পারেন অথবা এখান থেকেই ট্রলার রিজার্ভ করে নিতে পারেন। ভিমরুলি,আটঘর ,কুড়িয়ানা সহ আরো অনেক ছোট বাজার ও বাগান ঘুড়িয়ে আনার জন্য ৫০০-৭০০ টাকা ভাড়া নিবে ছোট ট্রলারে আর বড় ট্রলার ১২০০-১৫০০ টাকা। অবশ্যই দামাদামী করে ভাড়া ঠিক করবেন।

11878979_10153214597504296_2489955061459650792_o1

কি করে ঘুরবেন : বানারীপাড়া পৌছাবেন সকাল ৬ টার মধ্য। এরপর যে কেন একটি রেষ্টুরেন্ট এ নাস্তা করে আবার নদী তীরে চলে আসুন। একটি বড় নৌকা ভাড়া করুন। বলবেন আপনি ৬-৭ ঘন্টা ঘুরবেন এভাবে : বানারীপাড়া, বৈঠাকাঠী, আটঘর-কুড়িয়ানা, ভিমরুলি ও মাহমুদকাঠি। ১০-১৫ জন বসার মত একটি ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া নেবে ১৫০০ টাকার মত। দুপুরে কুড়িয়ানার বিখ্যাত বৌদির রেষ্টুরেন্ট (সকাল সন্ধ্যা) এ খেয়ে নিতে পারেন। তবে আগে অর্ডার করলে ভালো খাবার রান্না করে রাখবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের এ বাজারটির ছোট বৌদির রেষ্টুরেন্ট এ কয়েকশ বিদেশী খাবার খেয়েছেন। বৌদির রেষ্টুরেন্ট এর ফোন নম্বর : ০১৯২৩-৭৪৪৯৩৭ (সন্ধ্যা রানী) ।

ফেরার সময় বানারীপাড়া থেকে বাসে করে চলে আসুন গুঠিয়া। গুঠিয়ার বিখ্যাত বায়তুল আমান মসজিদ দেখে অটো নিয়ে চলে যান দুর্গাসাগর। এরপর বাসে বরিশাল গিয়ে রাত ৮.৩০ এর লঞ্চ এ উঠে বসুন ঢাকার উদ্দেশ্যে। এখানে আপনি প্রতি আধা ঘণ্টা পর পরই বাস পাবেন। নথুল্লাবাদ নেমে রিকশা বা অটো নিয়ে লঞ্চঘাট। এ ঘাট থেকে রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে তিন-চারটি লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়।  যাঁরা এক রাত থাকতে চান : তারা স্বুরপকাঠির মিয়ার হাটে হোটেল ইফতিতে থাকতে পারেন। একদম নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা সাধারণ মানের এ হোটেলে থাকাও হবে একটা অভিজ্ঞতা। এছাড়া বরিশাল নতুল্লাবাদ চলে আসতে পারেন। অথবা ঝালকাঠি   শহরের দু একটি হোটেল হল  কালিবাড়ি রোডে ‘ধানসিঁড়ি রেস্ট হাউস, বাতাসা পট্টিতে আরাফাত বোর্ডিং, সদর রোডে  হালিমা বোর্ডিং  ইত্যাদি। ভাড়া ৩০০  থেকে ৫০০ টাকা হতে পারে ।

টিপসঃ20575763140_3996d865b2_b
১) গ্রুপ করে গেলে ভাল
২) নৌপথে যাওয়াই ভালো সড়ক পথ থেকে
৩) রেইন কোট, ছাতা সম্ভব হলে লাইফ-জ্যাকেট নিয়ে যাবেন
৪) বাগানে ঢুকে পেয়ারা ছিড়বেন না
৫) আমাদের প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের তাই  কোন চিপস, চানাচুর বা পানির বোতল নদীতে ফেলবেন না
৬) সম্ভব হলে টর্চ লাইট সঙ্গে নিবেন
৭) কিছু মাথা ব্যাথার মেডিসিন নিবেন

বিঃদ্রঃ আমার মতে সবচেয়ে ভালো পন্থা লঞ্চে বরিশাল গিয়ে সি এন জি করে আটঘর,কুড়িয়ানা বাজার ঘুরুন। আর যারা পেয়ারা নিয়ে আসে তাদের কারো সঙ্গে একটু কথা বলে ২০০/২৫০ টাকা কন্ট্রকে বলুন আপনাকে আশপাশ ও পেয়ারা বাগান ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। যেটা করার জন্য ট্রলারে খরচ অনেক বেশি। তবে হা এই ভাবে করলে আপনি ভিমরুলি ঘুরতে পারবেন না। এটা একান্তই আমার নিজস্ব ভাবনা কম খরচে বাজার ও বাগান ঘুরার। আটঘর,কুড়িয়ানা বাজার ও কিন্তু মোটামুটি বেশ বড়।

সম্রাট

ছবিসূত্রঃ ইন্টারনেট