খলিল জিবরানের দু’ টি কবিতা

কবি

কবি , জুড়ে দেয় মুহুর্তের বর্তমান আর সদ্য অতীত
শুদ্ধ প্রসবণে বহমান এক , তৃষিত হৃদের শেষ চুমুকে ।
কবি , নিরেট বৃক্ষসম , স্নাত সুন্দরতম নদের সাথে
অন্তরের নিষিদ্ধ গন্ধমের দীর্ঘশ্বাসের ঘ্রাণে ।
কবি , গাইয়ে পাখির কুহক, বিষাদমাখায় অর্ন্তজ্বালা
নরম প্রলেপ পরশে পবিত্রসুর ,
শুভ্রমেঘের দিগন্তে লুকোচুরি , অন্ধতার সাথে
উর্ধ্বে যায় , উড়ে যায় আকাশনীলের সন্ধিতে।
ঝরে যত মানবীয় ক্ষত আর ক্ষেত্রে
আলোর কোমল পুষ্পপটের রঙ মিলে মিলে।
দেবদূতসম ডানায় কবি, ধ্রুব সত্যের ঈশ্বরদায়
লুমেন আলোর বর্ণচ্ছটা , হাজার শতেক আলো্ময়
আধার তমস হারিয়ে বেড়ায় কবির ডানায় , ডানায় ডানায় !
উদাস বাতাস –
ব্যর্থ আবার নিবিয়ে দিতে আলোকশিখা,
হাজার রঙের আলোকসাজায় !
মিলিয়েছে ইশতারের ভালোবাসা, আপোলোর সুরের মায়ায় ।
একক মানুষ, একের মানুষ ,
সাদাসিধে আর ভাবালুতার আলখাল্লায়
প্রকৃতির সাথে সন্ধিতা , খোঁজে বাঁচার খোরাক,
এইভাবে নেমে থাকে ওহী , পবিত্রময় স্ত্রোতএক !
বীজ বুনে যায় কবি, হৃদবীজের দানা দানা বীজ-
ভালোবাসার দৈব বিরান প্রান্তরে , অমনুষত্বের কীটনাশকের
ফলন বাম্পার – মানুষ নামের শস্যদানায়, দোলন হালকা চালে!
এই তবে কবি – মানুষ নামের স্বল্পপ্রজ প্রজাতি
ঠেলে রাখে একপেশে করে, ছুঁড়ে দ্যায় কোণে !
স্তম্ভ আর সৌধের বাড়াবাড়ি , মৃতদেহের পিপড়া যখন পিলপিল
সারে সারে । কবির বিদায় নিয়তিসম ! বিদায় মানুষ।
এই কবি সে – মানুষের হিসেবের খাতা গোলমেলে বড়ো !
না মেলে হিসেব ! সরল নামের জটিল গণিত।
খেরোখাতা ফেলে দেয় কবি।
মুখে ফোঁটা এক চিলতে হাসি , তাই সই !
এবার প্রশ্নত্তোরে –
এখনো ঠাঁয় অজাগরী মানবসন্তানেরা ?
মাহাত্ম্যবোধে কার উড্ডয়নের সুযোগসন্ধ , সুলুকসময় ?
উপেক্ষায় আর কতোটা কালের পচন দেহের , শরীরের মূর্তিসব চিহ্নায়ন – যত স্বত্তাশক্তি , প্রেম নয়তো প্রশান্তি ?
আর কতো পাড় হতে হয় , যম কিংবা আযরাঈলের শিকারসম্মান ,
গোল্লায় যাক প্রশ্বাস নেয়া নিঃশ্বাসগুলো – অজীবন মেতে বৃত্তাবন্দী ?
মোমের গলনে গলিত মানুষ , আলোর গলন , পথের গলন ……
মোমের রেখায় পথের হদিস মানবজীবন , তারাও ছিন্নমস্ত ?
কবি – তুমি জীবনে জীবন , জয়িত জীবন
মলিন শিকলে সময় যাপন, দর্প নিগঢ় স্বর্ণজীয়ণ ।
কবি – এদিন তোমার রাজ, অন্তর্যামীর হার ।
নিঃসীমানার শেষবিন্দু কোথায় কোথায় ,
অশেষ অজার !
কবি – পরখ করো মুকুট কাঁটায়
একটু করেই মেলে দেয়া ছায়া,
পরাগমাখা লুকিয়ে রাখা ফুলেল গাঁথায় ।

grasses-with-raindrop

সন্তানদের নিয়ে

তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়।
জীবনের নিজের প্রতি নিজের যে তৃষ্ণা, তারা হলো তারই পুত্রকন্যা।
তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, তোমাদের থেকে নয়।
এবং যদিও তারা থাকে তোমাদের সঙ্গে, কিন্তু তাদের মালিক তোমরা নও।
তুমি তাদের দিতে পারো তোমার ভালোবাসা,
কিন্তু দিতে পারো না তোমার চিন্তা, কারণ তাদের নিজেদের চিন্তা আছে।
তুমি তাদের শরীরকে বাসগৃহ জোগাতে পারো, কিন্তু তাদের আত্মাকে নয়।
কারণ তাদের আত্মা বাস করে ভবিষ্যতের ঘরে। যেখানে তুমি যেতে পারো না,
এমনকি তোমার স্বপ্নের মধ্যেও নয়।

তুমি তাদের মতো হওয়ার সাধনা করতে পারো, কিন্তু
তাদের তোমার মতো বানানোর চেষ্টা কোরো না।
কারণ জীবন পেছনের দিকে যায় না, গতকালের জন্যে বসেও থাকে না।
তোমরা হচ্ছ ধনুক, আর তোমাদের সন্তানেরা হচ্ছে ছুটে যাওয়া তীর ।
ধনুর্বিদ অনন্তের পথে চিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন তার তীর ছোটে
দ্রুত আর দূরে।
তুমি ধনুক, তুমি বাঁকো, ধনুর্বিদের হাতে তোমার বেঁকে যাওয়া যেন আনন্দের জন্য হয়।
তিনি কেবল চলে যাওয়া তীরটিকে ভালোবাসেন তা-ই নয়,
তিনি তো দৃঢ় ধনুকটিকেও ভালোবাসেন।

“তোমরা হচ্ছ ধনুক, আর তোমাদের সন্তানেরা হচ্ছে ছুটে যাওয়া তীর ।
ধনুর্বিদ অনন্তের পথে চিহ্নের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যেন তার তীর ছোটে
দ্রুত আর দূরে।
তুমি ধনুক, তুমি বাঁকো, ধনুর্বিদের হাতে তোমার বেঁকে যাওয়া যেন আনন্দের জন্য হয়।
তিনি কেবল চলে যাওয়া তীরটিকে ভালোবাসেন তা-ই নয়,
তিনি তো দৃঢ় ধনুকটিকেও ভালোবাসেন।”