নানা রঙের দিনগুলি…

 

সুলতানা শিরীন সাজি

সুলতানা শিরীন সাজি

উঠানের পাশের নিম গাছটার সবুজ পাতার দিকে তাকিয়ে আমি তখন বড় হচ্ছি। আমার দু’চোখের স্বপ্ন ঘিরে তখন সাদা কালো বায়োস্কোপের ঘোর! ছায়ার মত ঘুরে বেড়ায় অচিন ইচ্ছারা। পাখি হয়ে তাদের পিছু নেই। আমি তখন লুকানো ডাইরীতে লিখছি, মনের ভিতর জমে থাকা সবুজ পাতার গল্প। লিখছি, একেকটা উদাস দুপুরে আমার খুব বনে যেতে ইচ্ছা করে। বনে যেয়ে মাশরুম কুড়াতে ইচ্ছা করে। লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরীর লোরার মত একটা সবুজ মাঠে দৌড়াতে ইচ্ছা করে।ইচ্ছা করে দুরের এক গির্জার ঘন্টা শুনে,সেখানে যেতে। রাশিয়ান বই এ পড়া সেই অদভুত গল্পগুলো। আমাকে ভাবনার পাখি বানিয়ে দেয়। আমি কাগজের নোকা বানিয়ে এক একটায় এক একটা স্বপ্নের কথা লিখি।আমি খুব বেশি দূরে যেতে পারিনা। বাসার বাইরের চৌবাচ্চাতে নৌকাগুলো ভাসিয়ে দেই। আমার স্বপ্নরা চৌবাচ্চা্র পানিতে মিশে একাকার হয়ে যেতে থাকে। তখন প্রতিরাতে ডায়েরী লেখার পর,ওটাকে লুকাচ্ছি 12742795_1028741763831312_3156590385128751173_nতখন বই এর শেলফের বই এর পিছনে। আমার তখন একলা আকাশ দেখতে ভালো লাগছে। এক একটা ডায়েরীতে জমা হচ্ছে আমার বড় হবার টুকটাক গল্প। আমার আকাশ আমার জানালা। বাসার সামনের ঝিরিঝিরি পাতার সেই সজনে গাছটা। আর পাতাবাহারের বাগান। আমি বাসা্র বড় বড় ডিকশনারীতে আর মোটা বইগুলোতে জমাচ্ছি বাহারী সব পাতা আর ফুলের পাঁপড়ি। সে সময়,আমার হাতের উপর খেলা করতো মুরগীর হলুদ রঙের ছানাগুলো। এত নরম আর আদুরে। আমি ওদের ছবি আঁকতাম। ওদের নাম ও দিতাম আমি। আমাদের বাসার পিছনে বড় বড় গাছের গুড়ি পড়ে ছিল অনেকদিন। রোদে শুকানোর পর সেইসব গাছের ফার্ণিচার বানানো হবে। গুড়ির উপর বসে বিকেলের রোদে বই পড়তে পড়তে সন্ধ্যা নামতো। পাড়ার সমবয়সী বনধুরা এসে খেলতে ডাকলে, অহংকারী হাঁসের মত ঘাড় বাকিয়ে বলতাম,আমি আর খেলবোনা। ওরা ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে আর ডাকতে আসেনি। আর এভাবেই টুপটাপ করে ঝরে গেলো আমার কৈশোর এর দিনগুলো। আমি বড় হয়ে গেলাম। আমার কৈশোর এর কাছে জমা থাকলো বাবার দেয়া আমার লুকানো ডায়েরী। শেলফের বইভর্তি আমার সবুজ পাতারা। ছবির খাতায় আমার প্রিয় মুরগীছানারা। আমার পোষা বিড়াল তুলি। আমার ভাইয়ের দেয়া বাহারী ছাতা। আপুর দেয়া নখপালিশ। আপার দেয়া গোলাপী ফ্রক। রুমি ভাই এর দেয়া প্রথম ঘড়ি। জার্মান থেকে মামার দেয়া পারফ্যিউম। মায়ের বানানো সোয়েটার।সব কিছু ছেড়েছুড়ে আমি কেমন অন্য আমি হয়ে গেলাম। আবার বাবা সবাইকে ডেকে ডেকে বলতে লাগলো, আমার বুড়িটা কেমন ঘুমাতে ঘুমাতে বড় হয়ে গেলো! আমি কিন্তু তখনো আমাদের বারান্দার বিশাল একটা আরাম চেয়ারে সুযোগ পেলেই গুটি শুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ি। আমি তখনো বাবা মায়ের ভালোবাসার আদরে আহ্লাদী হই। অথচ এরপর থেকে বড় হওয়াটাই জীবনে জুড়ে গেলো। আমার আর কৈশোর এ ফেরা হলোনা !

(অটোয়া,কানাডা)