ফেইসবুক থেকে

ফেইসবুক এর গরম  আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে । প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতীকক্রিয়া।

                                                          মানুষের অভিভূত হবার ক্ষমতা যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন তার এক ধরনের মৃত্যু ঘটে।

monijapranerbanglaমনিজা রহমান(নিউইর্য়ক):ইস্টার্ন প্লাজা শপিংমলে প্রথম যেবার এস্কিলেটরে চড়ি, খুব অভিভূত হয়েছিলাম। ওঠার কোন কষ্ট নেই। সিড়িতে দাঁড়িয়ে থাকলেই হল।
প্রথম এলিভেটর বা লিফটে চড়ার অভিজ্ঞতা বহু বছর আগে। তখন আমার বয়স আট কি নয় হবে ? আব্বার বাগেরহাট পিসি কলেজের বন্ধু জহুর চাচা আমেরিকা থেকে এসে উঠেছিলেন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে। আব্বার আরেক বন্ধু রহমান চাচা, ওনার মেয়ে নীলা আর আমরা গিয়েছিলাম একসঙ্গে। হোটেলের জানালা দিয়ে সুইমিং পুলের নীল পানি, সুইমিং কস্টিউম পড়া শ্বেতাঙ্গীনি,কাঠগোলাপ দেখে এত যে অভিভূত হয়েছিলাম, বলার নয় !
গেন্ডারিয়া থেকে গাউসিয়া যেতে তখন রিক্সা ভাড়া ছিল বারো টাকা। আমি যখন কলেজের ছাত্রী, সেই সময়ের কথা বলছি। নীলক্ষেতে ঘুরে ঘুরে পুরনো বই বা ম্যাগাজিন কিনতাম। নতুন কেনার মতো টাকা ছিল না । চাঁদনী চকে গিয়ে অনেক দোকান ঘুরে, দরদাম করে কাপড় কিনতাম।
সবচেয়ে প্রিয় ছিল নিউমার্কেট। একটা কলম বা একটা নোটবুক কিংবা বিশেষ কারো জন্য কার্ড কিনতে বহুক্ষণ ঘুরতাম। তখন সময় ছিল সীমাহীন। ঘড়ির কাঁটা ধরে চলতাম না। বরং ঘড়ি চলতো আমাদের পিছনে। নিউমার্কেটের গেটে টক-মিষ্টি ফলগুলি ছিল ভীষণ প্রিয়। ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কি যে অভিভূত হতাম ! ভালোলাগার রেশ বহুদিন স্থায়ী থাকতো মনে।
প্রথম যেবার কক্সবাজার গিয়েছিলাম, বিশাল সব ঢেউ দেখে এমন অভাবনীয় ভালোলাগার অনুভূতি হয়েছিল যে বলার নয় ! বার্মিজ মার্কেটে গিয়ে কি রেখে কি কিনবো ভেবে উঠতে পারছিলাম না। মনে মনে ভেবেছিলাম, আবার যখন আসবো, এক লাখ টাকা নিয়ে আসবো কেনাকাটার জন্য। এখন কত নামকরা সি বিচে কিংবা শপিং মলে যাই, কিন্তু কেন যেন সেদিনের মতো অভিভূত হতে পারি না।
মানুষের অভিভূত হবার ক্ষমতা যখন নষ্ট হয়ে যায়, তখন তার এক ধরনের মৃত্যু ঘটে।

                                                                                     সারা দেশের বাবলুদের জন্য পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা

riponpranerbanglaরিপন ইমরান(ঢাকা): বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে বাবলু…মাঝে মাঝে মায়ের ভেজা শাড়ির অাঁচলটা গালে চেপে ধরছে…গালটা এখনো খুব জ্বালা করছে…মা একটু আগে কষে একটা চড় দিয়েছে তাকে…
কেন মা চড়টা মারলো এখনো বাবলু বুঝে উঠতে পারছে না…সে তো আজ কোন দুষ্টুমি করেনি…শুধু স্কুল থেকে ফিরে রান্নাঘরে গিয়ে মাকে মাত্র দুবার জিজ্ঞেস করেছে, ‘মা এবারের পহেলা বৈশাখে আমি নতুন জামা কিনব না?’ প্রথমবার মনে হয় মা প্রশ্নটা শুনতে পায়নি তাই দ্বিতীয়বার ও একটু চেঁচিয়ে বলেছে…সঙ্গে সঙ্গে মা একটা থাপ্পড় দিয়ে দিল!!!
অথচ আজ কদিন ধরে ওদের স্কুলের প্রতিটা ছেলেমেয়ে এসে গল্প করছে ওরা পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কে কি কিনেছে…সবশেষ আজকে বাবলুর সবচেয়ে কাছের বন্ধু টগর জানালো, গতকাল রাতে ওর বাবা ওকে একটা লাল পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছে…টগরের গল্প শুনে অবশ্য বাবলু চুপ থাকেনি…
ছোট হলেও বাবলুর অনেক বুদ্ধি…ও চট করে জবাব দিয়েছে, ’বাবা বলছে আজ রাতে আমাকে মার্কেটে নিয়ে যাবে। বাবা তো খুব ব্যস্ত মানুষ। তাই আমরা পহেলা বৈশাখের আগেরদিন রাতে  প্রতিবার কেনাকাটা করি’…শেষ কথাটা অবশ্য একেবারে মিথ্যে না গতবার পহেলা বৈশাখের আগের দিন রাতে বাবা বাবলুর জন্য একটা লাল গেঞ্জি নিয়ে এসেছিল…গেঞ্জিটার গায়ে সাদা রঙ দিয়ে একটা একতারা অাঁকা ছিল…সকালে বাবা মায়ের সঙ্গে ওই গেঞ্জিটা পরে ধানমণ্ডি লেক থেকে এক পাঁক বেড়িয়ে এসেছিল ও…বাবলুর ঠিক মনে আছে মা সেদিন একটা লাল টিপ পরেছিল…কী যে সুন্দর লাগছিল মাকে…
বাবলুর বয়স আট বছর…ওরা শুক্রাবাদ থাকে…থাকে মানে তিন রুমের ফ্ল্যাটের এক রুমে ওরা সাবলেট থাকে…বাবলুর বাবা শাহীন ছোট একটা সিএ্যাণ্ডএফ ফার্মে চাকরি করে…বাবলুর বাবার যে বড় খালুর মতো অতো টাকা নেই এটাও বাবলু জানে…
তবে বাবলু জানে না গত মার্চ মাস থেকে বাবলুর বাবার চাকরিটা আর নেই…একটা চাকুরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে ওর বাবা… এ মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি পড়েছে…মোড়ের দোকানেও একই অবস্থা…বাবলু ঘুমিয়ে গেলে প্রতিরাতে ওর বাবা-মা খুব নীচু গলায় শঙ্কিত স্বরে আলাপ করে সামনের মাসটা কীভাবে কাটবে এ নিয়ে…
বি : দ্র : ছোটবেলায় আমি বাবলুদের দলে ছিলাম না…আমি বরাবরই সৌভাগ্যবানদের দলে…কিন্তু আমার অনেক বন্ধু ছিল বাবলু… কোন উৎসব এলেই আমার ওদের কথা মনে পড়ে…কোন উৎসবে অংশগ্রহণ করতে না পারাটা শিশুদের জন্য যে কী পরিমান কষ্টের ব্যাপার এটা যারা বাবলুদের চেনেন না তারা বুঝবেন না…সারা দেশের বাবলুদের জন্য পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছা…বড় হও বাবারা…আর বড় হয়ে বাবলুদের কথা ভুলে যেও না…

                                                                                              ভাত রানছি, জাউ রানছি, পিঠা রানছি কিন্তু রুটি তো বানাই নাই

tania1pranerbanglaসাগুফতা শারমীন তানিয়া(লন্ডন): সিমেন্টের (সিমিট) মেঝেয় ধুলো ঝাড়বার ঝাড়ুর ঝাপটা মনে পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল। মানে, সকাল আসছে। মানে খুদু (খোদেজা), বেদু (বেদানা) এরা সব্বাই আলোয়ান গায়ে আসছে ধেয়ে, প্রাকৃতিক কাজ ব্যতিরেকে বাকি সময় আমাকে ঘিরে থাকবে। মাঠে নাড়াপোড়ানো শুরু হয়েছে, শুরু হয়েছে মৈমনসিং এর মোষের আসা যাওয়া, শুরু হয়েছে গুড় জ্বাল দেয়ার গন্ধে ভার হয়ে থাকা বাতাসের আনাগোনা। মানে, সকালের কম্বল ঠেলে উঠবার সময় টের পাবো গরম কম্বলের কোথাও পথভোলা মুরগী এসে পেড়ে গেছে ডিম।
আমার দাদী সকালের উঠানে হন্যে হয়ে হাঁটতেন আর বলতেন, “ভাত রানছি, জাউ রানছি, পিঠা রানছি কিন্তু রুটি তো বানাইনাই। নাস্তা খাইব কি দিয়া?” ওঁর উত্তরদাত্রীর/দর্শকের নাম ছিল হয় নুরেজা’র মা নয় সাইফুল্লা’র মা।
এখন ছয় হাজার মাইল দূরে রাতের বেলা আলো ফুটবার ঠিক আগে আমার বাথরুমের পিছনের ঝোপে ব্ল্যাকবার্ডের দল শুরু করে- ভাত রানছি, জাউ রানছি, পিঠা রানছি কিন্তু রুটি তো বানাইনাই।
জীবদ্দশায় আমার দাদীকে আমি তেমন ভালবাসতে পারিনাই। বিচিত্র সব আন্ত-ব্যক্তিক সংঘর্ষ হতো আমাদের। এমনকি ওঁর মৃত্যুদিনেও আমি যে শোকে কেঁদেছি সেটি অপরাপর মানুষের দেয়া শোক। কয়েক মাস ধরে ওঁর গলার স্বর, ওঁর নিদন্ত মুখে ‘স’ ধ্বনিসমেত শব্দের উচ্চারণ এইসব ফিরে ফিরে আসছে। ফিরে আসছে ওঁর শেখানো সবুজ ত্যালঘাউরা পাখির নাম, রসুইন্যা গাছের নাম, ভাঁটফুলের ঝোপের নিচে নিথর অপেক্ষমান গোসাপ। ফিরে আসছে বীরাঙ্গনাকাব্যের ‘উত্তরিবে প্রতিধ্বনি কোথা জনা বলে’। ফিরে আসছে ওঁর গা আর পথশ্রমক্লান্ত কালো বোরকার সম্মিলিত ঘ্রাণ- বুড়োমানুষের মন খারাপ করা গায়ের ঘ্রাণ। ফিরে আসছে ওঁর নাকের পাটায় সোনার ‘এস’ লেখা নাকফুল। এস ফর সালেহা। বি এ বিটি।
অনেক বেমক্কা কথা বলে লোকের মন কালো করে দিতে পারতেন, মিছেও বলতেন, বলে ফেলে মনের ভুল বা বিকার বলে চাপা দিতেন… আর এইসবে আমি ক্ষিপ্ত হতাম, যেন আমি আচমকা কিছু বলি না, মিথ্যাও বলি না ইত্যাদি। এমনকি আমি মনে মনে তাঁকে ‘কিং সলোমনস মাইনস’এর এক চরিত্রের নামে ডাকতাম। কিন্তু আমাদের ছিল গায়ে গায়ে একরকমের মিল, একরকমের প্যাশন, জড়িয়ে ধরতে এলেই দ্বিগুণ বেগে জড়িয়ে ধরতেন।
প্রাতরাশ একত্রে করতে আমার কী ভাল যে লাগতো। আমার এখনো ইচ্ছা করে। জিজ্ঞেস করি, রুটি খাবি, ম্যাজিক ব্রেড (পরাটা) খাবি নাকি প্যানকেক বানাবো? অবধারিতভাবে বিস্বাদ তরলে হড়হড়িয়ে সিরিয়াল ঢেলে কুশানের সামনে দিয়ে মনে মনে আমিও কি বলি, ভাত রানছি, জাউ রানছি, পিঠা রানছি…