শিলং : মেঘেদের ঘরবাড়ি

shilong pranenr banglaA22

মেঘ কখনো বাড়ি ফিরে যায় কি না জানা নেই। মেঘের বাড়িই বা কোথায় কে জানে! কিন্তু জায়গাটায় বেড়াতে গিয়ে আমারও খুঁজতে ইচ্ছে হলো মেঘের ঘরবাড়ি।
নাম মেঘালয়। মেঘালয় ইংরেজী (Meghalaya) উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য। এই রাজ্যের উত্তর ও পূর্ব দিকে অসম (আসাম) রাজ্য এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র অবস্থিত। মেঘালয়ের রাজধানী শিলং। শিলং ইংরেজী (Shillong), উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় রাজ্যেও পূর্ব খাসিয়া পাহাড় জেলার একটি শহর ও পৌরসভা এলাকা। এটি মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী। শিলং বাংলাদেশ -ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে এবং ভূটান-ভারত সীমান্তের প্রায় ১০০ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। এটি খাসিয়া পাহাড়ে প্রায় ১৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।
এখানে বৃষ্টি পড়ে বারো মাস। কবিগুরু রবীন্দ্র্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু…।’ ঢাকা থেকে শিলং ঘুরতে যাওয়ার সময় সম্ভবত কবিগুরুর এ কথাটি বারবার মনে পড়বে। ঠিক যেন কবিদের অনুপ্রেরনার ও চিত্রকরদের ক্যানভাসের শহর।
ছোট বেলা এক সময় হয়ত সকলেই পড়েছেন প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিকের ভূগোল বইয়ের একটি সাধারণ প্রশ্ন-পৃথিবীতে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয় কোথায়?
উত্তরটা এখন ও ভেসে বেড়ায় – ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে।
তখন ভাবতাম হয়ত ভারত অনেক অনেক দূরের কোন দেশ। দূর, দিন বছর – বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইচ্ছের ডাল পালা বাড়তে থাকে। তবে অনেকেই জানেন না এই চেরাপুঞ্জি বাংলাদেশ থেকে কতদূর। ম্যাপ বের করে হিসাব-নিকাশ করে দেখবেন বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে চেরাপুঞ্জি সোজাসুজি কুড়ি কিলোমিটারেরও কম। বাড়ির পাশেই বিশ্বের বৃষ্টিবহুল এই এলাকা, সেখানে আষাঢ় কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টি উপভোগ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
তাই বৃষ্টির মৌসুমে ঘুরে আসুন চেরাপুঞ্জি। সঙ্গে উঁকি দিতেই হবে মেঘালয়ের রাজধানী ভারতের অন্যতম পর্যটন শহর শিলং-এ।
কেউ কেউ বলেন, দার্জিলিং যদি হয় রূপের রানী তা হলে শিলং হচ্ছে রাজা। পাইন অরণ্য, জলপ্রপাত এবং পার্বত্য জলধারার সমারোহ। ১৮৯৭ সালে এক ভূমিকম্পে শহরটি ধবংস হয়ে যায় এবং এরপর এটিকে পুনরায় গড়ে তোলা হয়।

কীভাবে যাবেন,
সায়েদাবাদ থেকে অনেক লাইনের বাস সিলেট যায়। সেখান থেকে বাসে কিংবা সিএনজি স্কুটারে তামাবিল সীমান্ত। ভারতের পাহাড়গুলোর ঠিক পাদদেশে বাংলাদেশের এই প্রান্তে সমতলভূমিতে ইমিগ্রেশন-কাস্টম অফিস। আর সীমান্ত পার হলেই ডাউকি ইমিগ্রেশন-কাস্টমস অফিস। ঢাকা থেকে সিলেটে বাস ভাড়া পড়বে নন-এসি ৪৭০ টাকা ও এসি ১২০০ টাকা।pranerbanglaHills_Shillong05

সকালে সিলেট নেমে সিএনজি বা গাড়ি ভাড়া করে চলে যান তামাবিল। সীমান্ত পার হয়ে সরাসরি শিলংগামী ট্যাক্সি ভাড়া করুন।
বড় ট্যাক্সিতে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ রুপি লাগবে। ছোট ট্যাক্সি ক্যাবও নিতে পারেন যদি সফরসঙ্গীর সংখ্যা কম থাকে।

বিকল্প পদ্ধতি
এছাড়া আর একটি সহজ পদ্ধতি আছে,প্যাকেজ সিস্টেমে শ্যামলী পরিবহনের গাড়ি ছাড়ে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে এবং ফিরে আসে সোমবার রাত ১০টায়। শিলং যেতে এটাই সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। যাতায়াত গাড়ি ভাড়া ৪ হাজার টাকা।

এছাড়া ভিসা ফি ৬০০ টাকা+সার্ভিস চার্জ ৫০০ টাকা। মোট ১ হাজার ১০০ টাকা শ্যামলী কাউন্টারে জমা দিয়ে ভারতের ১-৬ মাসের ভিসা নিতে পারেন।

এক্ষেত্রে সুবিধা হচ্ছে ই-টোকেন নিতে হবে না। তবে ৫ কর্মদিবস সময় লাগবে ভিসা পেতে।

আপনার যদি ভিসা নেওয়া থাকে, তবে শুধু বাসের টিকিট কাটলেই হবে। মনে রাখবেন ট্রাভেল ট্যাক্স ৫০০ টাকা দিতে হবে, সেটা রওয়ানা দেওয়ার আগে সোনালী ব্যাংকে দিলেই চলবে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে এই নম্বরে-০১৭৪৯৯৩৭৫৪৫ (শ্যামলী কমলাপুর আন্তর্জাতিক টার্মিনাল)

আবহাওয়া
শিলংয়ের আবহাওয়া সারা বছরই মনোরম। তবে মার্চ ও জুন মাস বেড়াতে যাওয়ার আদর্শ মরসুম। গরমের দিনেও হাল্কা গরম কাপড় ও শীতে ভারি গরম জামার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বৃষ্টিপাত এ অঞ্চলে যখন-তখনই হতে পারে। তাই, ছাতা আর বর্ষাতির বন্দোবস্ত রাখা চাই।

পার্বণ-80511745-shillong-rain
এই অঞ্চলে বিভিন্ন উপজাতির বাস, তাই উৎসবেরও আধিক্য। খৃস্টান ধর্মাবলম্বীরা মহা সমারোহে পালন করেন বড়দিন, গুড ফ্রাইডে, ইস্টার, ইত্যাদি। ইংরেজি নব বর্ষেও আনন্দমুখর হয়ে ওঠেন পাহাড়িরা। খাসিয়া উপজাতির মানুষ পালন করেন শাদ সুকমিনসিয়েম পরব। কা পমব্ল্যাং নংক্রেম অথবা নংক্রেম নৃত্যও অতি প্রসিদ্ধ খাসিয়া উৎসব। জয়ন্তীয়া উপজাতীয়দের পার্বণ বেহদিয়েংখ্লাম পালিত হয় প্রতি বছর জুলাই মাসে। গারোরা পালন করেন ওয়াংগালা উৎসব যা আদতে সূর্যের উপাসনা।

টুকিটাকি
শিলংয়ে খাবার জায়গা দেদার। রকমফেরও অঢেল। বার্গার, পিৎজা, মিল্কশেক, স্যাণ্ডউইচের দোকান রাস্তার মোড়ে হামেশাই পাওয়া যায়। চীনে খাবার ও তিব্বতি মোমো-থুকপাও পাওয়া যায় বেশ কিছু রেস্তরায়। স্থানীয় খাবারের দোকান তেমন না থাকায় খোজ নিতে পারেন ট্যুরিস্ট লজের ক্যান্টিনে। মনে রাখা দরকার, ভারতের এই অংশে সাধারণত আমিষ খাদ্যের প্রচলন আছে। নিরামিষ খাবারের সন্ধান পাওয়া যাবে মারওয়াড়ি ভোজনালয়ে ও শিলংয়ের কিছু বাঙালি রেস্তোরায়ঁ।

বেড়ানো শেষে কেনাকাটা করতে হলে শিলংয়ের পুলিশ বাজারের দোকানগুলোয় যাওয়া যায়। এখানে দরদাম করাটাই দস্তুর। এ ছাড়া শহরে আছে বেশ কিছু অত্যাধুনিক শপিং মল। স্থানীয় উপজাতির মানুষের হাতে তৈরি জিনিসপত্রের সম্ভার পাওয়া যায় এখানে।

চেরাপুঞ্জির টুকিটাকিshilong@pranerbangla

চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে গ্রীেষ্ম তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতকালে ৩.৯ থেকে ১৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। উত্তর পূর্ব ভারতের এই প্রান্তে বৃষ্টিপাতের হার বেশি। বর্ষাকাল ছাড়াও বৃষ্টি হতে পারে যে কোনও সময়।
বেড়ানোর ভাল সময় হচ্ছে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস ট্রেকিং, প্রকৃতি বীক্ষণ, ইত্যাদির জন্য আদর্শ। বৃষ্টির পূর্ণ রূপ দেখতে চাইলে মে থেকে অক্টোবর মাসে আসা উচিত।

চেরাপুঞ্জি মানেই বৃষ্টি। ঘরের জানলা দিয়ে অবিশ্রান্ত ধারা দেখতে ভাল লাগলেও বাইরে বের হলে দরকার পড়তে পারে ছাতা, বর্ষাতি ও রবারের জুতো। রওনা হওয়ার আগে সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।
সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথাব্যাথা ও সাধারণ পেটের অসুখের ওষুধ অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন। পানীয় জল পরিশ্রুত করতে জিওলিন জাতীয় পিউরিফায়ার হাতের কাছে রাখুন।

মেঘালয়ে সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষা খাসিয়া। বিদেশী অতিথিদের সঙ্গে তারা অবশ্য হিন্দি-ইংরেজি মেশানো এক মিশ্র ভাষায় কথা বলেন।

সম্রাট