রান্নাঘরের তাক থেকে…

রান্না, অফিস, বাজারহাট, সন্তানকে সকালে স্কুলে পাঠানো, ঘরে ফিরে তাদের পরিচর্যা, ছড়িয়ে থাকা ঘর গুছিয়ে তোলা। আবার নতুন আরেকটি দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাএই রুটিনই তো চলছে দিনের পর দিন।দশ হাতে কাজ করেও অনেক সময় আপনার পক্ষে সবদিক সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এই ব্যস্ত দিনলিপির মাঝে যদি কেউ মনে করিয়ে দিতে চায় রূপচর্চার কথা হয়তো কিছুটা রেগেই যাবেন। সময় কোথায় নিজের সৌন্দর্য নিয়ে ভাববার! কিন্তু প্রয়োজন কিন্তু আছে। সব প্রয়োজন মেটানোর বিন্দুতে দাঁড়িয়ে নারীকে নিজের দিকেও ফিরে তাকাতে হয়।কারণ আপনাকে তো এখন শুধু ঘর নয় বাইরেটাও সামলাতে হচ্ছে। ছুটতে হচ্ছে মানুষের ভীড়ে, কাজে।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ কাহিনির বিষয় কাজের ফাঁকে রূপচর্চা। সময় নেই হাতে একদম? কুছ পরোয়া নেহি, আমরা যা বলতে চাইছি সেগুলোর উপাদান পেয়ে যাবেন একেবারে আপনার হাতের কাছে। বলা যেতে পারে রান্নাঘরের তাকে অথবা ফ্রিজের ভেতরে। শুধু আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী বেছে নিন উপকরণগুলো।

চুল নিয়ে মেয়েদের আছে নানান চিন্তা। ধূলো-ময়লায় অথবা রান্না ঘরের  গরমে চুল তার নিজস্ব উজ্জ্বলতা হারাচ্ছে। কখনো চুল একটু বেশী পড়ছে, মাথায় দেখা দিচ্ছে খুশকির উপদ্রব। এসব সমস্যার সমাধান তৈরী করতে পারেন একদম ঘরে বসেই। ওই যে একটু আগেই বললাম উপাদান রয়েছে আপনার হাতের কাছেই।

  অনুজ্জ্বল চুলের জন্য:rupcare_sour-yogurt

* এককাপ দইতে মেথিগুড়া মিশিয়ে সারারাত রেখে দিন সকালে মাথায় লাগিয়ে আধঘন্টা রাখুন তারপর ধুয়ে ফেলুন।

*এককাপ ঘোলে চার চা চামচ হুইট জার্ম অয়েল মিশিয়ে চুল ধোওয়ার আধঘন্টা আগে লাগিয়ে রাখুন তারপর ধুয়ে ফেলুন।

খুশকির জন্য:

  • পর‌্যাপ্ত পরিমান টোম্যাটো পিউরির সঙ্গে একটি ডিমের সাদা অংশ লেবুর রস (তৈলাক্ত চুলের ক্ষেত্রে) এক টেবিল চামচ সরিষার তেল (শুশ্ক চুলের ক্ষেত্রে)একসঙ্গে সঙ্গে মিশিয়ে মাথায় লাগান পর পর দশ দিন। মনে রাখতে হবে,২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলতে হবে।
  • আদার রস বিলি কেটে কেটে মাথায় লাগান পর পর ১০ দিন। তবে ২৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলবেন।
  • উপরোক্ত রূপটানগুলো ব্যবহার করার পর শেষবার চুল ধোবেন এই মিশ্রনটি দিয়ে। এককাপ চায়ের লিকারে একটা গোটা লেবু মিশিয়ে নিয়ে চুল ধোবেন।

চুল পড়লে:

  • এককাপ ভিনিগার সল্ট-এ আধ খানা লেবুর রস মিশিয়ে মাথায় লাগান ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন।
  • তৈলাক্ত চুলের ক্ষেত্রে এককাপ দইয়ে একটা লেবুর রস মিশিয়ে মাথায় লাগান। আধাঘন্টা পর ধুয়ে ফেলুন।
  • নারিকেল তেলে কয়েকটি ভৃঙ্গরাজ পাতা ভিজিয়ে রাখুন। কয়েকদিন বাদে প্রতিরাতে ওই তেল মাথায় লাগান পরের দিন মাথা ধুয়ে ফেলুন।

চুলের ডগা ফাটলে:

  • ২ টেবিল চামচ মেথিগুঁড়া ১ টেবিল চামচ রাই সরষে গুঁড়া ২ টেবিল চামচ চন্দন পাউডার ১ টেবিল চামচ মেহেদী পাউডার পরিমান মতো দইয়ে মিশিয়ে মাথায় লাগান। আধঘন্টা পর ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে একদিন করে ব্যবহার করুন।

উজ্জ্বল চুল পেতে:

  • এককাপ মেহেদী পাউডার, আধকাপ আমলা পাউডার,৩ থেকে ৪ চা চামচ মেথিগুঁড়া ২/৩ ফোটা মধু, আধখানা লেবুর রস মিশিয়ে রাখুন চা পাতা ফোটানো পানিতে। তৈলাক্ত চুল হলে মেশাবেন ডিমের সাদা অংশ আর শুষ্ক চুল হলে মেশাবেন একটা ডিম। এবার এই মিশ্রনটি চুলে লাগিযে ১ ঘন্টা পর ধুয়ে ফেলুন্। প্রতিরাতে যেকোন ভেষজ তেল লাগিয়ে ধুয়ে ফেলুন পরদিন সকালে।

চুলে রং ধরাতে:

  • এক কাপ মেহেদী পাউডার,তিন চতুর্থাংশ কাপ আমলা পাউডার, খয়ের, ১ চা চামচ চিনি,সামান্য পানি,১ কাপ বিটের রস,১ চা চামচcucamber_16602 লবঙ্গ গুঁড়া- এইসব উপকরণগুলি দই ও ডিমের সঙ্গে মিশিয়ে মাথায় লাগান ৩/৪ ঘন্টা পর ধুয়ে ফেলুন।

বাড়িতে তৈরি হেয়ার কন্ডিশনার:

  • চায়ের লিকার লেবুর রসের সঙ্গে মিশিয়ে মিশ্রণটি দিয়ে চুল ধোবেন শ্যাম্পু করার পর।
  • ফ্ল্যাট বিয়ার দিয়েও শ্যাম্পু করার পর চুল ধুতে পারেন।
  • শুকনো চুলের জন্য মধু লাগান। কিছুক্ষন রেখে ধুয়ে ফেলুন।

চুল পাকা রোধ করতে:

  • একটি লোহার পাত্রে গোটা আমলা থেঁতো করে ভিজিয়ে রাখুন সারারাত। তারপর ছেঁকে নিয়ে বেদানার খোসা ও তুলসীর রস মিশিয়ে মাথায় লাগান সপ্তাহে দুই থেকে তিন বার। পনেরো কুড়ি মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।

ত্বক নিয়েও সমস্যার শেষ নেই। আর ত্বক ভালো থাকবেই বা কী করে। বদলে যাচ্ছে আবহাওয়া। যখন বৃষ্টি থাকবার কথা তখন থাকছে না। যখন শীত পড়ার কথা তখন গরম। তারপর ঘরে বাইরে কাজ তো আছেই।তৈলাক্ত ত্বকের এক ধরণের সমস্যা আছে। সমস্যা আছে শুষ্ক ত্বকেও। আছে মুখে পিগমেন্টের সমস্যা।

তৈলাক্ত ত্বকের জন্য:

  • ত্বক পরিস্কার করুন ২ চা চামচ লেবুর রস ও ১ চা চামচ দইয়ের মিশ্রণ দিয়ে।
  • টোনিংয়ের জন্য ব্যবহার করুন নিচের ৩ টি মিশ্রণ: -টোম্যাটোর পাল্প, শসার রস, দু ফোটা লেবুর রস একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন, ধনে পাতার রস আর কয়েক ফোটা লেবুর রস মিশিয়ে তুলোতে ভিজিয়ে মুখে লাগান। ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন, গাজরের রসের সঙ্গে কযেক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে সেটাও টোনার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মুখের রূপটান:s-0032-600x600

  • আধ চা চামচ মুলতানি মাটি, আধ চা চামচ চন্দনগুঁড়া, আধ চা চামচ বাটা হলুদ, একটি ডিমের সাদা অংশ এক সঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন।
  • আধা চা চামচ বেসন আধা চা চামচ শুকনো গোলাপ ফুলের পাতাগুঁড়া দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান আধঘন্টা পর ধুয়ে ফেলুন।
  • পেঁপে চটকে কেওলিন পাউডারের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান।মিনিট ১৫ পর ধুয়ে ফেলুন।

ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান:

  • দুধে দু ফোটা লেবুর রস লাগিয়ে সেটা মুখে লাগান।তারপর ভেজা তুলো দিয়ে মুছে নিন।
  • টোনার হিসাবে ব্যবহার করুন নিচের দুটি মিশ্রণ। মিশ্রণ দুটির যে কোন একটি ২ টেবিল চামচ পরিমান নিয়ে বরফ ঠান্ডা পানিতে মেশান এবং তাতে তুলোর প্যাড ভিজিয়ে ফ্রিজে রেখে দিন।তারপর ঠান্ডা অবস্থায় ফ্রিজ থেকে বের করে মুখের উপর চাপা দিয়ে রাখুন ৫ থেকে ১০ মিনিট।
  • পরিমান মতো শসার রসে এক ফোটা মধু মিশিয়েও ব্যবহার করতে পারেন্।
  • গাজরের রস এবং শসার রসও মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।

পিগমেন্টেশনের জন্য ফেস প্যাক:

  • এক চা চামচ কেওলিন পাউডার, আধ চা চামচ কমলা লেবুর খোসা শুকনো গুঁড়া, আধ চা চামচ আমন্ড গুঁড়া দুধের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান। শুকিয়ে গেলে দূয়ে ফেলুন।
  • ডাবের পানি মুখে লাগিয়ে রাখুন ধোওয়ার প্রয়োজন নাই।
  • মুলার রস লাগান দাগ ধরা জায়গায়।

অতিরিক্ত শুষ্ক ত্বকের জন্য:

  • ২ চা চামচ গাজরের রস আর থেঁতো করা তরমুজ মেশান সামান্য চন্দন গুঁড়ার সঙ্গে। এবার মুখে লাগিয়ে রাখুন। আধঘন্টা পর ধুয়ে ফেলুন।
  • ২/৩ ফোটা আমন্ড তেল, ২ ফোটা গ্লিসারিন ও আধ চা চামচ ওটমিল মিশিয়ে মুখে লাগান। ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন।1429631597_egg

লোমকুপ বড় হলে বা ব্রণের দাগ মেলাতে:

  • ১ চা চামচ মুসুরির ডালের বেসন, ১ চা চামচ আমন্ড গুঁড়া, কেওলিন পাউডার আধ চা চামচ,চন্দন গুঁড়া আধ চা চামচ, চালের গুঁড়া আধ চা চামচ মিশিয়ে নিন ১ টি ডিমের সাদা অংশে সঙ্গে। এবার মুখে লাগিয়ে অপেক্ষা করুন যতক্ষন না শুকিয়ে যায়।শুকিয়ে গেলে মুখে সামান্য কাঁচা দুধ দিয়ে ভিজিয়ে আলতো করে আঙ্গুগুলের ডগা দিয়ে ঘষতে থাকুন।মিনিট পাঁচেক ঘষার পর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।এরপর লবঙ্গ গুঁড়া, পুদিনার রস,কেওলিন পাউডার একসঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান। শুকিয়ে গেলে পানির ঝাপটা দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

চোখের কোলে কালো দাগ:

  • প্রথমে কাঁচা দুধ বা দুধের সর দিয়ে চোখের চারপাশ পরিস্কার করুন।তারপর আলতো করে ম্যাসাজ করুন আমন্ড তেল।তারপর নিচের লেখা যে কোন একটি পদ্ধতি অবলম্বণ করুন:
  • ভেজা তুলো বন্ধ চোখের পাতার ওপর রাখুন ১০ মিনিট।
  • ২ চা চামচ শসার রসে তুলা ভিজিয়ে রেখে দিন চোখের পাতার উপরে ও চোখের কোলে।
  • আলু বা শসা কুরিয়ে নিন। তারপর কুরানো আলু বা শসা চোখের পাতার উপর রেখে দিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট।
  • শসা কুরিয়ে কাঁচা দুধের সঙ্গে মেশান তারপর শুয়ে মিশ্রণটি চোখের পাতার উপরে দিয়ে শুয়ে থাকুন ২০ মিনিট।

অ্যাকনে থেকে মুক্তি পেতে:download

  • নিম পাতা সেদ্ধ করা পানি দিয়ে মুখ পরিস্কার করুন।
  • টোনিং এর জন্য ব্যবহার করতে পারেন ১ চা চামচ নিম পাতার রস অথবা আধ চা চামচ পুদিনা পাতার রস অথবা আধ চা চামচ তুলসী পাতার রস।
  • ফেস প্যাক হিসাবে ব্যবহার করুন আধ চা চামচ কেওলিন পাউডার, আধ চা চামচ শুকনো তুলসী পাতা গুঁড়া ও এক চিমটে কর্পূর গুঁড়া দুধে মিশিয়ে মুখে লাগান। শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন।
  • প্যাক হিসাবে এক চা চামচ লবঙ্গ গুঁড়া, এক চিমটে হলুদ গুঁড়া, একটা ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগান। শুকিয়ে গেলে ভেজা তুলা দিয়ে মুছে ফেলুন।

বলিরেখা দূর করতে:

  • ২চা চামচ চিনি, ২চা চামচ লেবুর রস, ২ চা চামচ গ্লিসারিন মিশিয়ে মুখে হাতের পাতায় বা শরীরের যে অংশে ভাঁজ পরে বেশি বা ইতিমধ্যে বলি রেখা দেখা দিয়েছে সেখানে মালিশ করুন এবং ধুয়ে ফেলুন।
  • বলিরেখা যেন না দেখা দেয় তার জন্য প্রতিদিন সকালে চোখের চারপাশে কপালে, নাকে, ঠোঁটের চারপাশে ভিটামিন-ই তেল ও রাতে আমন্ড তেল ম্যাসাজ করুন।

আবিদা নাসরীন কলি