কেন্টে আনন্দে…

 তানভির আহমেদ


তানভির আহমেদ

পূর্ব লন্ডনটাকে মাঝে মাঝে ফার্মগেট আর গুলিস্তান মনে হয়, এই ব্যস্ত শহরের বাইরে প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে, মনে হয় দূরে কোথাও গিয়ে শান্ত হয়ে আসি। বন্ধু শারমিন লন্ডনে অদূরে কেন্টে ম্যুভ করেছে বেশ কয়েক বছর, যাবো যাচ্ছি করে করে সময় গড়িয়ে যায়। ওদিকে কেন্টে আমার আরেক বন্ধু জারিনের আমন্ত্রণও ডিউ হয় আছে, কেন্ট ও তার আশে পাশে দুই এক ঘন্টার ড্রাইভে আমার আরেক বন্ধু সানজিদা আপা, শওরিন তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যও একটা উপলক্ষ খুঁজছিলাম বেশ কিছুদিন ধরে। তারিখ পাক্কা হয়েছিলো তিন সপ্তাহ আগে। কিন্তু ব্রিটিশ আবহাওয়া বলে কথা, আমাদের উইকেন্ডের সমস্ত প্ল্যান পন্ড করে দিয়ে শুক্রবার থেকে ঝুম বৃষ্টি। টেলিফোনে সবাইকে মোটামুটি হতাশ করে দিয়ে আমাদের এই সমারের শেষ বারবিকিউ পার্টি ক্যান্সেল করে দিতে হলো। রাতে ঘুম হলো না। গভীর রাতে সিদ্ধান্ত হলো পার্টি হবে। বৃষ্টি হোক আর নাই হোক আমরা কেন্টাবারিতে পিকনিকে যাচ্ছি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দৌড়ালাম মুরগির ঠ্যাং আর খাসির চাপ যোগাড় করতে। আমাদের বন্ধু শুভ্র’র নেভিগেশন ভুল ডাইরেকশনে গিয়ে সকাল বেলার ১ ঘন্টা মাটি হলো বাসা থেকে শপিং সেন্টারে গিয়ে মাংস কিনতে। যাত্রা হলো শুরু, মেঘলা আকাশে যেন কিছুটা রোদ উকি দিচ্ছে এমন মন কলা খেয়ে আমরা কেন্টের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছি। মাঝ পথে ঝুম বৃষ্টি। কুমু হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠালো, ঝুম বৃষ্টির মধ্যে কিসের বারবি কিউ তানভীর।গাড়ী ঘুরিয়ে বাড়ীর পথ ধরার হুমকি দিলো কুমু। আমি আশা ছাড়লাম না। মেঘ দেখে তুই করিসনে ভয় আড়ালে তার সূর্য হাসে এই বানী চিরন্তনী মনে রেখে এগিয়ে চললাম। ঠিকই আমাদের সবার মুখ আলো করে সূর্য দেবের দেখা মিললো। ইতিমধ্যেই আমাদের বন্ধু সানজিদা আপা এসে হাজির। জারিন এরই মধ্যে বারবি কিউ কুকার রেডি করে রেখেছে। আমি আর সানজিদা আপা কয়লায় আগুন দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। এর মধ্যে খবর পেলাম আমাদের আরেক বন্ধু উল্লাস ভাই, ভাবী আর বাচচারা সহ রওয়ানা দিয়েছেন। উলউইচ থেকে তিনিও যোগ দেবেন আমাদের আড্ডায়। তবে বড় সারপ্রাইজ হলো উল্লাস ভাই আর জারিন পূর্ব পরিচিত হলেও উল্লাস ভাই জানতেন না তিনি জেরিনের বাসায় আসছেন। আমি আর জারিন এই সারপ্রাইজ গোপন রেখেছিলাম, তবে একই কান্ড করতে গিয়ে সানজিদা আপার অসুবিধা হয়ে গেলো। মেয়েকে একা রেখে এসে বেশীক্ষণ আমাদের সঙ্গে আড্ডায় থাকতে পারেন নি তিনি, তবে অল্প সময়ে এই ফেইসবুক সাহিত্যিক পার্টি জমিয়ে রেখেছিলেন।bishobangla-1

আমার প্রিয় বন্ধু শারমিন, আমরা কুমু বলেই ডাকি, আমার প্রিয় বন্ধু বলেই হয়তো তার হ্যাসবেন্ডের নামও তানভীর। তাই বন্ধুর হ্যাসবেন্ডের সঙ্গে খুনসুটি জমে উঠে প্রায়ই। তবে সানজিদা আপা কুমুর হ্যাসবেন্ডের নাম বসিয়ে দিলেন ‘উলটাইনা তানভীর’ তানভীর ভাই আবার নিজের নামটা একটু এডিট করে রাখলেন ‘উলটাইনা শেফ’। উল্টাইন্যা শেফ ছবি তোলার জন্য মোটামুটি থং টা তার হাত ছাড়া করতে রাজী নন। ছবি তুলেই তার ক্লান্তি দূর হলো।

এদেকে আমাদের বারবি কিউ দ্বিতীয় দফা কুকিং শেষে হাজির হলেন উল্লাস  দম্পতি। জিপিএস এ তাদেরকে ভুল ঠিকানায় নিয়ে গিয়েছিলো। বাচ্চারা যখন খেলায় ব্যস্ত তখন আমাদের পার্টির মধ্যমনি বিখ্যাত গায়ক শুভ্র হক গিটারের তারে ঝঙ্কার তুললেন। মন শুধু মন ছুঁয়েছে….লাকি আকন্দ থেকে শুরু করে ডিফারেন্ট টার্চএর শ্রাবনের মেঘ গুলো জড়ো হলো আকাশে সহ নব্বই দশকের সেই সারা জাগানো ব্যন্ডের গান দিয়ে জমতে শুরু করলো আসর। সঙ্গে যুক্ত হলেন আরেক শিল্পী তাঞ্জিনা। দুই গাতক মিলে মোটামুটি আড্ডা জমিয়ে দিয়েছেন। আসর হবে আর লাইভ হবে না তাতে হয় না, ফেইসবুক লাইভে বাংলাদেশ থেকে সহপাঠি ডলি-চঞ্চল জুটি’র অনুরোধে তাঞ্জিনা আবারো সুর ধরলো শুভ্র হকের সঙ্গে। শুরু হলো অনুরোধের আসর। তানভীর ভাই মোটামুটি ডজন খানেক গান আদায় করে ছাড়লেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত বাড়তে থাকলো, লন্ডনে ফিরে এলাম ফুর ফুরে মেজাজ নিয়ে। বৃষ্টিস্নাত উইকেন্ডকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বন্ধুত্বের জোরে আমরা এই বছরের সেরা পার্টি করে ফেললাম।