ষড়ঋতুর ছয়কাল

আব্দুল-করিম-কিম

আব্দুল-করিম-কিম

ষড়ঋতুর ছয়কাল । তৃতীয় কাল শরৎ। যদিও শহুরে বাঙালী জীবনে ছয়কাল নেই । এখানে গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল ও শীতকাল । নগরের যাপিত জীবনে ষড়ঋতু’র খুব একটা প্রভাব নেই । সনাতন ধর্মীয়রা ধর্ম পালনে, সাংস্কৃতিক সংগঠন উৎসব আয়োজনে ও সংবাদমাধ্যম গৎবাঁধা প্রতিবেদনে ঋতু পরিবর্তনের খবরাখবর রাখে । কিন্তু গ্রামীণ জীবনে ঋতু বদলের প্রভাব রয়েছে । কারন কৃষিকাজ মূলত ঋতুচক্রে প্রভাবিত ।
ঋতুর প্রভাব প্রকৃতিতে এখনো প্রবল। প্রকৃতি এখনো ঋতুর সাজেই সাঁজে । নানা প্রতিকূলতা ও বৈরিতাকে উপেক্ষা করে বৈশাখে আমের মঞ্জরীতে ভ্রমর খেলা করে, নানা বৃক্ষের আড়াল থেকে বর্ষায় হটাৎ করেই কদমফুল হেসে ওঠে, শরৎ এলে কিভাবে যে নদীতীরে কাশফুল শরৎ বন্দনা শুরু করে, হেমন্তে সবুজ ধান ক্ষেত কিভাবে যে রঙ বদলে সোনালী হয়ে যায়, শীতে বৃক্ষরা পুরনো পাতা একে একে ঝেড়ে ফেলে, বসন্তে নিশ্চুপ কোকিল কুহু কুহু ডেকে জানান দিয়ে যায় গাছে গাছে নতুন পাতা আর ফুলের আবাহনের । ঋতুচক্রের এই চিরন্তন প্রাকৃতিক পরিবর্তনের বিশেষ প্রভাব রয়েছে বাঙ্গালী জীবনে । বাঙ্গালীর সাহিত্য সংস্কৃতিতে ফিরে ফিরে আসে ঋতুবন্দনা । ঋতুর আগমনীতে হয় উৎসব, হয় পালাপার্বন।
গ্রামীণ বাঙ্গালী জীবনে ঋতুভিত্তিক উৎসবমূলত প্রাত্যহিক প্রয়োজনকেন্দ্রিক । বছরের প্রারম্ভিক ঋতু গ্রীষ্ম ও সমাপনী ঋতু বসন্তে গঞ্জগ্রামে সবচেয়ে বেশী মেলা’র আয়োজন হয় । নতুন বছরে জীবন জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায় এসব মেলাতে । বর্ষায় নৌকাবাইচ, মাছ ধরা, পলো বাওয়া, শরৎ-এ শারদীয় দূর্গোৎসব, হেমন্তে নবান্ন উৎসব, শীতে পিঠেপুলি, যাত্রাপালা, ঘোড়দৌড়, ষাড়ের লড়াই ইত্যাদি প্রতিটি গ্রামীণ উদ্যোগে প্রকৃতির সাথে মেলবন্ধন রাখা হয় । জীবনজীবিকার চাহিদাও পূরণ হয় । কিন্তু শহরে প্রকৃতির সাথে মেলবন্ধন করে এমন অনেক কিছুই করা সম্ভব হয় না । সে অভাব পূরণ করে দেয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন । এক সময় বাংলাবর্ষ বরণই ছিল শহুরে বাঙ্গালীর ঋতুকেন্দ্রিক একমাত্র উৎসব । এখন তা আর বর্ষবরণে থেমে নেই । এখন বর্ষায় বর্ষাবরণ হয়, শরতে শরৎবরণ হয়, হেমন্তে নবান্ন হয়, শীতে পৌষমেলা হয়, বসন্তে বসন্pranerbangla-2ত উৎসব হয়, ফাগুয়া হয় চৈত্রের শেষ বিকেলেও বর্ষবিদায়ের নানা আয়োজন থাকে । রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি শহরে-নগরে ঋতুকেন্দ্রিক উৎসব এখন বিস্তৃত হচ্ছে । শহুরে বাঙ্গালী তাঁর সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অন্তরে ধারন করতে শিখছে ।
সিলেটে সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে ও তত্বাবধানে বাংলা বর্ষবরণ শুরু । প্রান্তিক চত্বরের এক চিলতে ফাঁকা জায়গায় আয়োজন করা হত বৈশাখীমেলা । প্রান্তিক চত্বর বিলুপ্ত হয়ে গেলেও বাংলা বর্ষপুঞ্জির প্রথম ঋতুর প্রথম দিনের উৎসব এখন নগরময় ছড়িয়ে গেছে । পাড়ায় পাড়ায় এখন আয়োজন হয় বৈশাখীমেলার । বাংলা বর্ষবরণ এখন সারাদেশের মত সিলেটেও সার্বজীন বিশাল পরিসরের এক উৎসব । বর্ষবরণের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য নগরে ঋতুবরণ এখন নিয়মিত হচ্ছে । সিলেটেও শুরু হয়েছে ঋতুবরণের আয়োজন । সব ঋতুতে সম্ভব না হলেও শরৎ ও বসন্তে উৎসব হচ্ছে । আর সিলেটে এই আয়োজন কয়েক বছর ধরে নিয়মিতভাবে করার চেষ্টা করে যাচ্ছে গুপ্ত ভ্রাতৃদ্বয়ের সংগঠন শ্রুতি-সিলেট । গত ১৫ই আশ্বিন ১৪২৩ বাংলা (৩০শে সেপ্টেম্বর) শ্রুতি সিলেট-এর ১৬ বছরপুর্তিতে আয়োজন করা হয় ‘শরতোৎসব’ ।
সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদমিনারের উন্মুক্ত মঞ্চে আয়োজিত এ উৎসবের উদ্বোধনপর্বে নাট্যজন ভবতোষ রায় বর্মন, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব ব্যরিস্টার মো. আরশ আলী ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সরকার সুহেল রানাসহ আমাকেও আমন্ত্রন জানানো হয় । মঞ্চের সামনে রোপণ করা কাশফুল । পেছনের ব্যানারে কাশবন ও শিউলি ফুলের ছবি । নীল আকাশ ও নীলাম্বরী শাড়ী পরে উৎসবে অংশ নেয়া দর্শক, শিল্পী ও আয়োজকদের পরিশীলিত আয়োজন দেখে একটা ভাবনাই ভেবেছি । যা উদ্বোধনকালের প্রস্তুতিহীন বক্তব্যে বলার চেষ্টা করেছি । আর তা হল প্রকৃতি ও পরিবেশ ।
এই যে ঋতু পরিবর্তন জানান দেয় অযত্নে জন্ম নেয়া কাশফুল, সেই কাশফুল ফোঁটার জন্য শহরে বা গ্রামে আমরা কি পরিত্যাক্ত জমি রাখছি ? যে কাশফুল এক সময় বিস্তৃতপ্রান্তর সাদা করে রাখতো । সেই বিশাল প্রান্তরকে বলা হত কাশবন । এখন কাশবন দূরে থাক, কাশফুল ফোঁটার জন্য সামান্য জায়গা ছেড়ে দেয়ার কি কেউ আছে ? আমরাতো সবই আমাদের ইচ্ছার অধীনে নিয়ে যাচ্ছি । মন চাইছে- নদীর তীরে বানাচ্ছি বিলাসী শৌচাগার বানাচ্ছি । আমরা রাস্তার পাশে, বনে-বাদাড়ে, গ্রামে-বাজারে বর্ষায় ফোঁটার জন্য কদম গাছ চাই না । আমরা চাই দ্রুত বর্ধনশীল ইউক্যালিপ্টাস, একাশিয়া । আমরা পুরনো বৃক্ষগুলো কেটে ফেলতে উৎসাহী কিন্তু একবারো ভাবি না বসন্তে কোকিল কোথায় লুকিয়ে থাকবে আর ডেকে যাবে কুহু কুহু ?