আলেসে আমাদের পাখিবাগান

রবিশঙ্কর-মৈত্রী

রবিশঙ্কর-মৈত্রী

আমাদের পাখিবাগানে সাত পদের কুষ্মাণ্ড (মিষ্টি কুমড়ো) হয়েছে।
আমরা থাকি দক্ষিণ ফ্রান্সের আলেস শহরে। এই শহরে সেসেআএসের (CCAS)-এর দুটি বড়ো বাগান আছে। এই বাগানকে বলা যায় শখের বাগান এবং শেখার বাগান। অধ্যাপিকা ফরনিয়ে সিলভি আমাদের পারিবারিক বন্ধু। তিনি বাগানের একটি প্লট বরাদ্দ পেয়ে আমাদেরকে দেখাশোনা করতে দিয়েছেন জার্দিনাশ ফেদেরিকের অনুমতি নিয়ে।
ঢাকায় আলমগীর ভাইয়ের বাড়ির ছাদে আমরা একটি বাগান করেছিলাম, নাম দিয়েছিলাম পাখিবাগান। পাখিবাগান একটি প্রতীকী নাম। আলেসের বাগানটিকেও আমরা নাম দিয়েছি পাখিবাগান।
গত বছর আমার স্ত্রী নীলু মৈত্রীই আলেসের পাখিবাগানের দায়িত্ব নিয়েছিল। গত দশ মাস হল সে অসুস্থ। এবার বাগানের দায়িত্ব নিয়েছে নীলুর বোন দুলু রায়। আমিও robi-4@pranerbanglaতার সঙ্গে বাগানে যাই, একটু সহযোগিতা করি। এই বাগানটিতে সপ্তাহে সাত আট ঘণ্টা সময় দিই।
বলে রাখা ভালো, ফরাসি দেশে কৃষি বিষয়ে লেখাপড়া না করে বাগান কিংবা খামারে কিছুই করা যায় না। আমরা এখন একটু একটু করে বাগান বিষয়ে লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছি। আমি এরই মধ্যে পাখি ও পোকামাকড়ের সুরক্ষা নিয়ে কিছু শিখেছি। কীভাবে জৈব সার উৎপাদন, চারা তৈরি, পাতা থেকে রঙ ও কীটনাশক তৈরি করতে হয় ইত্যাদি জেনেছি বুঝেছি।
বাংলাদেশে কথা বলা এবং কৃষিকাজ কেউ শিখতে চান না। সভ্যতার প্রথম শর্তই হল কথা বলতে শেখা এবং জীবন সুরক্ষার জন্য প্রথম শিক্ষাই কৃষিবিদ্যা।
না জেনে শিখে আমরা ডাক্তারি করি, গান গাই, কবিতা বলি– এই অশিক্ষা মাঝে মাঝেই করুণ পরিণতি ডেকে আনে।
আমরা অবাক হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখি–
গাছের পাতা মরে যায়, ধান চিটা হয়ে যায়, সবজি খেতে পোকা লেগে সব শেষ হয়ে যায়, অকালে ফুল কপি এবং মুলোয় ফুল ধরে যায়। আমরা বেশি বেশি কীটনাশক ও সার ব্যবহার করে বিষযুক্ত শাকসবজি উৎপাদন করি, অভদ্র ইতরপানা কথা বলে নিজের জীবনকে বিপন্ন করি, বুক ব্যথার রোগীকে অমিপ্রাজল খাইয়ে হার্ট ফেল করায়, তাল লয় ছন্দ ছাড়া ছন্নছাড়া গান কবিতা বলে কাছের মানুষদের বিরক্ত করি। এসব আর কতোদিন?
স্কুলে না গিয়েও শেখা যায়, নিজে নিজে শেখার ইতিহাস তো কম নেই বাঙালির। কিন্তু আজকাল আমরা কারো কাছ থেকে কিছুই শিখতে চাই না। কথা কথায় বলে ফেলি– ‘‘তুমি আমারে শিখাইতে আইসো না।”
উন্নত বিশ্বে কৃষকরা উন্নত মানুষ। খামারের মালিক মানেই সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু আমাদের দেশে কৃষকরা সবচেয়ে অবহেলিত, নিষ্পেষিত, অপমানিত– তাঁরা চাষা বলে তথাকথিত ভদ্রদের গালি খান। যাঁর দশ বিঘা জমিতে ধান পাট শাক সবজি হয়– তাঁকে আমরা মানুষ হিসেবে মূল্যায়নও করি না; আমাদের কাছে গেরস্থের চেয়ে একজন চাটুকার করণিকের দাম অনেক বেশি। এই নষ্ট চিন্তা ও অসভ্যতা থেকে আমরা মুক্ত না-হলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।