মানবসেবা

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা

কনকচাঁপা

দক্ষিণ গাঁয়ে আমাদের বাড়ীটা ভীষন অন্যরকম ছিল। বাড়ির সামনে একটা স্রোতস্বিনি খাল ছিল।খালটির শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।সকাল বিকাল জোয়ার ভাটা হতো।সেই খাল পেরিয়ে আমাদের বাড়ি।বাঁশের সাঁকো ছিল।সেটা অবলীলায় পার হতাম।কে কত দ্রুত পার হতে পারি তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো ভাইবোন দের মাঝে।বর্ষাকালে সাঁকো লম্বা হয়ে যেতো। তখন সাঁকোটা পার হওয়া আসলেই একটু কঠিন হতো। তো ভিক্ষুক যখন আসতো তখন তাদের বোঁচকাবুচকি নিয়ে পুল পার হওয়া কঠিন হতো।আম্মা বলতেন পুল পার হয়ে ভিক্ষা দিয়ে এসো। আদেশ পালন করতাম কিন্তু মন ভরতো না।কারন এক মুঠি চাল দেয়া আর ভিক্ষুক এর খোঁজ খবর নেয়া কিছু খাবার সামনে বসিয়ে খাওয়ানো দুই ব্যাপার! আম্মার কপট রক্তচক্ষু কে পাশ কাটিয়ে রোজ দিন ভিক্ষুক এর বোঁচকাবুচকি পুল পার করিয়ে বাসায় এনে দিতাম।আব্বা কিছুই বলতেন না কিন্তু আম্মা রাগ করার আসল কারন ছিলো ওইটা একটা পড়া ফাঁকি দেয়ার বুদ্ধি ছিল বলে।কারন মনি বলতো তুমি আগের বার পোঁটলা এনেছো এবার আমি আনবো। আম্মা অবাক হয়ে বুঝে যেতেন শুভঙ্কর এর ফাঁকি! তো একদিন আম্মা কোথায় যেন গেছেন,হঠাৎ দেখি থুরথুরে এক বুড়ি,সে আবার আম্মার খুব প্রিয়, ওই পাড় থেকে চেঁওচেঁও করছেন।যথারীতি ওই পাড়ে গিয়ে তাকে বাড়িতে আনলাম।কি কি kataghuri_konokchapa-2যেন দিলাম।এবার তাকে আবার পুল পার করে দিয়ে আসার পালা।পার করে দিলাম,আমি ফিরবো, তখন বুড়ি বলে, মারে— আমারে একটু ধইরা ওই বাড়ি দিয়া আয়! যেই কথা সেই কাজ! বুড়ির পোঁটলাপুটলি ধরে লাঠি ধরে তাকে ধরে অন্য একটা বাড়ি গিয়ে দাঁড়ালাম। বুড়ি হাপিয়ে উঠেছে।একটু জিরালো সে।আমি তাকে ফেলে আসতেও পারছিনা।দম নিয়ে বুড়ি হাঁক ছাড়লো—— মাগো,দুগা ভিক্ষা দেও—- আমি তার লাঠি ধরে দাঁড়িয়ে। বাসার আন্টি দরজা খুলে আমাকে দেখে প্রথমে চমকে উঠলেন। পরে হেসে গড়িয়ে পড়লেন।আমি হতভম্ব! উনি জোরে জোরে বাড়ির ভেতর মুখ দিয়ে বললেন আপা গো দেখে যান কি কান্ড! এক ঝাক গল্পরত খালাম্মাগন দরোজায় মুখ বাড়ালেন তার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে আমার মা জননীর অনিন্দিত আঁখি যুগল! রাগে আয়তাকার আঁখি গোল গোল আর কেমন সূর্যের মত হয়ে গেছে! আল্লাহ গো! কি কান্ড! কি করলাম! ভাবতেই দেখি আম্মা বুড়িকে বকছেন।বলছেন তোমার এতো টুকু আক্কেল নাই,ভিক্ষা করতে করতে বুড়া হইসো! উজবুক! ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি ভাবছিলাম আমার মা এতো নিষ্ঠুর! কি হয় ওনাকে ভিক্ষা তে সাহায্য করলে।এমন নিষ্ঠুর মহিলা আমার মা! হাহাহাহাহাহাহা।এর পর কি হয়েছিল মনে নেই তবে মায়ের রক্তচক্ষু পাশ কাটিয়ে এইরকম মানবসেবা আর করা যায় নি।তাতে এই ছোট কনার খুব দুঃখ হয়েছে তবে তার কার্যক্রম এর ব্যত্যয় ঘটেনি আলহামদুলিল্লাহ। এবং আমি জানি ওইদিন আম্মা পাড়ার ভাবিদের কাছে লজ্জা পেয়েছিলেন সামাজিকতার ঘেরাটোপ এ। কিন্তু আম্মার শিক্ষা কিন্তু এটাই।কোন রকম স্তর এর ভাবনাহীন মানবসেবা। যা পরবর্তী কালে আমার মজ্জাগত অভ্যাস এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে।আলহামদুলিল্লাহ। আমি আমার মা বাবা আমার পরিবার এবং পারিবারিক শিক্ষা নিয়ে গর্বিত। ও আল্লাহ, কতই তুমি দিলা আমায় বিনা কারনে।