আমার মাকে অঞ্জলি দিতে দেখিনি…

শিলা চৌধুরী

শিলা চৌধুরী

কলকাতা প্রতিনিধি: রাতের গভীরতা বাড়তেই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক যেমনি তীব্র হচ্ছে আর অনেক দূরের অজানা কোন জায়গা দিয়ে কুমোরটুলি থেকে প্রতিমা নিয়ে হইচই করে সবার প্যান্ডেলের পথে যাবার উল্লাসের আওয়াজ ও বেড়েই চলেছে।আর মন ছুটে গিয়েছে অনেক অনেক দূরের সেই দিনগুলিতে।চোখ জ্বালা করে দু ফোঁটা নোনা জল গাল বেয়ে কখন যে পরলো টেরই পেলাম না ।মনে পড়ে গেল মা আর পিসিমার চোখের সেই জল…খুব ছোটবেলায় তাঁদের কাছে বায়না জুড়ে ছিলাম আলতার বড়ি কিনে দেবার জন্যে…বাবা সে বার বেতন বোনাস পায়নি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পূজো ছিল বলে।
সেই সামান্য আলতার বড়ি ও কিনে দিতে না পারার কস্টে পূজো দেখে বাড়ি ফিরেই মা আর পিসিমার সেই বুকফাটা কান্না আজো আমার এক ফালি শরতের আকাশটাতে পূজো এলেই জানান দিয়ে যায় ।
আমাদের বাড়িতে বহু বছরের বারোয়ারি পূজো হয়ে আসছে ।প্রতিমা মন্দিরেই বানানো হয় সবসময় …স্কুলে যাবার আগে আর স্কুল থেকে ফিরে আর কোন খেলাধূলা ছিল না আমাদের।অবাক চোখে বসে বসে দেখতাম নিপূণভাবে প্রতিমা তৈরি আর সবাই ছিলাম কারিগরের সাগরেদ… পারূলি গাঙ্গের তলা থেকে ডুব দিয়ে দিয়ে সাদা চূনা মাটি তালের কোন্দায় ( নৌকো ) করে এনে দিতাম প্রতিমা তৈরির জন্যে ।বাঁশ দিয়ে ফ্রেম বানানো থেকে তুলির শেষ টান অবধি…আমদের নাওয়া খাওয়ার বালাই থাকতো না সেই সময়ে ।
বাবা, দাদু আর সুনীল জেঁঠুর কাছে ছোটবেলায় শিখেছিলাম, বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যরা তাদের সাধ্যমত যা দিতে পারবেন বা দিতে চাইবেন, সেটুকু নিয়েই খুশি থাকতে হয়। কখনও কারও কাছে কিছু চাইতে নেই, লোভ করতে নেই , জমকালো জামাকাপড়, গয়নাগাটি পরতে নেই যা দেখে আমার প্রতিবেশী কেউ কষ্ট অনুভব করে যা ওরা কিনতে বা পরতে পারছেনা বা তাদের সন্তানদের দিতে পারছেন না বলে ।তাদের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু আবদার করা ও উচিত নয়। ছোটবেলায় ভালো করে বুঝে উঠতে পারিনি এইসব কথার গভীরতা, পরে অনুভব করলাম ….আসক্তি দমন করতে পারায় অনেক সুখ আছে,সন্তুষ্টি আসে তাতে, মন ভাল থাকে।ছোটবেলায় শান্ত আর নিরাসক্ত বাচ্চা ছিলাম যে আমি তা অবশ্য ঠিক নয় । সারা বছর হয়তো একটা বা খুব বেশি হলে দুটো নতুন জামা পেতাম আমরা ।তবে আনন্দের কোনও ঘাটতি ছিল না আমাদের ।shila-1
আমাদের শখে কেনাকাটা খুব কমই হতো প্রয়োজনটাই মুখ্য থাকতো। ক্ষমতার উর্ধ্ধে গিয়ে জীবন বিপন্ন করে আমার বাবা কোনও দিনই অতিরিক্ত দাম দিয়ে জামাকাপড় কেনার পক্ষে ছিলেন না। খুব সাধারণ ভাবেই মানুষ করেছেন আমাদের ।সেই শিক্ষা নিয়েই আমরা বড় হয়েছি আর ভুলতেও চাই না কখনও।ছোটবেলায় জামা পেতাম খুব কম। তাই যা পেতাম সেটাই খুব ভাল লাগত। আমরা তিন বোন। মোটামুটি একই সাইজের। মহালয়ার এক দুদিন আগে পরে বাবা বোনাস পেয়ে অফিস শেষে একেবারে সবার জন্যে জামা কাপড় কিনে বাড়ি ফিরতো।আমরা ভাইবোনা ঘুমোতাম না বাবার যতই ফিরতে রাত হতো ।
আর সে সময় বাবা-মা,ঠাম্মী, কাকুরা একটুখানি বাড়ি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেই হলো….দাদু কে চেয়ারে বসিয়ে শুরু হয়ে যেত
নতুন জামা, জুতো পরে তিন বোনের ফ্যাশন শো।জেঠতুতো ভাই প্রবীর আর পিসতুতো ভাই রাতুলকে আমাদের জামা, জুতো পরিয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে কোঠাঘরে ক্যাটওয়াক করাতাম। আবার সবাই ফেরার আগেই সে সব আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখতাম। অদ্ভুত সে এক সময় ছিল।আর আজকাল
ক্রেডিট কার্ডের যুগে মানুষের কেনাকাটার কোনও লাগাম থাকে না। ওর আছে বলে আমারও চাই, এই ভাবনায় অস্থির সবাই । আজ শীতের জন্য হাল্কা শাল, কাল জামদানি শাড়ি, পরশু তার জন্য বিশেষ কায়দা করা ব্লাউজ। একদিন আনারকলি কামিজ তো পরের দিন সেই আগের দিনের দোকানে দেখে আসা রুপোর ঝুমকো। তার সঙ্গে মানানসই জুতো, ছোট-বড় ব্যাগ বা ক্লাচ, লিপস্টিক, নেলপলিশ, পারফিউম। আর বাড়ির ছেলেদের জন্য ব্র্যান্ডেড শার্ট আর লিনেনের জামা। অন্তত একটা লিনেন শার্ট না থাকলেই নয়। ইজ্জতের ব্যাপার!
অবশেষে আসতো সারা বছরের প্রতিক্ষা শেষে সেই মহেন্দ্রক্ষন।
কাকিমা-জেঠিমা, বৌদিদের কাটা ফল আর প্রসাদ, সন্ধ্যা দিদির বাবার পৌরোহিত্য, কানু জেঠুর চন্ডী পাঠ, ছুট্টা দার গাল ফোলানো উপোষ,অষ্টমী,নবমীর ভোগের গন্ধ, ঢাকের সঙ্গে কাঁসর বাজানো, সন্ধ্যারতির প্রদীপের আলোর ছটা, ধুনোর অন্ধকার করা ধোঁয়া, দশমীতে বড়দের প্রণাম, মা কাকিমা-জেঠিমাদের সিঁদুর খেলা , পুকুরের খাদের ধারে বসে গল্পে মেতে গাছ থেকে জাম্বুরা (বাতাবী লেবু ) পেরে কলা পাতায় নুন ,কাচা লংকা দিয়ে মেখে সবাই মিলে হুমড়ি খেয়ে কাড়াকাড়ি করে খেতে খেতে বড়শি দিয়ে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা ,সব ভাই বোনদের হুল্লোড় , এ সব মিলিয়েই আমাদের ছোট গ্রাম ফাউগান বড়বাড়ীর অনারম্ভর দূর্গা পূজো।
বিকেল হতেই কেশব দাদার খোঁজ হ্যাজাকের জন্যে আর সেই
হ্যাজাকের টিম টিমে আলোয় সন্ধ্যা আরতিতে ধুনচি নাচ, তরনি দাদার জোকার সেজে কৌতুক ,নবমীর বিকেলে নতুন জামা পরে দাদু, ঠাম্মী, বাবা, কাকুদের সাথে সবাই মিলে পাশের গাঁ লক্ষীপুরে পূজো দেখতে যাওয়া,শেষ মন্ডপের মেলায় গরম গরম জিলিপি, আমৃত্তি কিনে নৌকো ভাড়া করে সন্ধ্যের পর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরতাম সবাই মিলে ।নতুন জুতোতে পায়ে ফোস্কা পড়া সত্বেও বাড়ি ফিরেই আবার প্যান্ডেলে ছুট…
আমাদের পূজোর আরো এক আনন্দের বিষয় ছিল যাত্রা পালা…আর সেই পালার প্রস্তুতি হতো পূজোর দু তিন মাস আগে থেকেই। বাবা,সফু দাদা,চিত্ত দা,রাখাল দা,আউয়াল দা সহ অনেকে অভিনয় করতো সেই যাত্রা পালাতে।আর মহিলা চরিত্রের জন্যে ভাড়া করে শিল্পী আর জরির পোশাক আনা হতো ।জানালা দিয়ে উঁকি মেরে অবাক হয়ে দেখতাম সেই শিল্পীদের।আর আমাদের সুধীর ছিল যাত্রা পাগল…ওকে খুঁজেও পেতো না কেউ কোথাও।অনেক খুঁজার পর পেতাম যাত্রা মঞ্চের নিচে. ..ঘুমন্ত অবস্থায় তার কারণ যদি একেবারে মঞ্চের সামনে সবার আগে জায়গা না পায় রাতে।shila-4
আমার মাকে খুব কমই দেখেছি অঞ্জলি দিতে,যৌথ পরিবার . ..মা সারাক্ষন ব্যস্ত রান্নাঘরে..পূজোর দিন গুলোতে নিরামিষ রান্না …..কত্তো অতিথি আসতেন পূজোতে আমাদের বাড়িতে ওদের জন্যে আর সাথে পরিবারের পচিঁশ জন সদস্য সবার জন্যে রান্না করে উঠোনে পিঁড়ি পেতে খাওয়ানোই ছিল আমার মায়ের অঞ্জলি।আর খাবার শুরু হবার সময় ছিল কিন্তু শেষ কখন হবে তা বলা মুশকিল ছিল…কি নিয়ে গল্প না হতো সেই আসরে রাজনীতি থেকে টুনি পিসিমার ঘাটে অস্টমী স্নান আর উরাইল্লা কেতির গল্প. .।তার উপর একেকদিন কুড়ি পচিঁশ জোড়া নারকেলের নাড়ু বানাতে বানাতে ঠাম্মী, মা ,পিসিমা,কাকিমারা প্যান্ডেলে যাবার সময়ই পতো না।
কোথায় সেই দিন…কলকাতায় বাহারি আলো জ্বলমল করা একেকটা বিখ্যাত পূজোর প্যান্ডেল কোটি কোটি টাকার প্রতিযোগিতা কোন প্যান্ডেল কোন থিমে প্রতিমা তৈরি করবে কোন থিমে আলোকসজ্জা হবে,কোন সেলিব্রেটিকে দিয়ে প্রতিমা উন্মোচনের ফিতে কাটবে তার কোন আয়োজনের কমতি নেই ।
তবুও এই তিলোত্তমা নগরীতে খুঁজে ফেরে অবাধ্য এই মন আমার ফেলে আসা শৈশবের সেই ফাউগান বড়বাড়ীর অনারম্ভর দূর্গা পূজো …..।মহালয়ার ভোরের গোলাপি আকাশ, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, পঙ্কজ মল্লিকের ভুবন মাতানো নিবেদন, শিউলির গন্ধ, ছাতিম ফুলের পাঠানো আমেজ, শরতের নীল-শুধু নীল আকাশ, বৃষ্টিস্নাত ঝকঝকে, চনমনে গাছের পাতা, ঝলমলে একটা শহর, রাস্তায় মানুষের ঢল, কাছের মানুষের হাসি, আর সঙ্গে পুজোর কিছু একাত্ম স্মৃতি। প্রকৃতির কোলে আমার ফেলে আসা শৈশব, আমার অন্য ভাবে বড় হয়ে ওঠা.। কখনও কখনও প্রিয়জনের সাথে থেকেও বড্ড মন কেমন করে।গান শোনা, ছবি দেখা, আড্ডা, স্মৃতি রোমন্থন। আর কখনও বারান্দায় চায়ের কাপ নিয়ে আমার দস্যি মেয়ে অনি-কে নিয়ে নিচে রাস্তায় মানুষের ভিড় দেখে, নিজের মধ্যে একদম একা হয়ে যাওয়া। হয়তো পুরনো কোনও জামা পরেই। হয়তো পুরনো কথা ভেবেই। উৎসবে মেতে ওঠা এই ঝলমলে শহর তার সাক্ষী থাকে। ছাতিম ফুলের গন্ধ। পুজোর গন্ধ। বাবার গন্ধ।গত পাঁচ বছরে খুঁজে ফিরি বাবার হারিয়ে যাওয়া গলার স্বর,ঠাম্মীর ফোনে না বলা নাড়ুর রেসিপি, দাদুর পকেটের টিনের বাক্সে রুমালে বেঁধে রাখা পয়সার ঝনঝনাৎ শব্দ….. অনেক বছর আগেই হারিয়ে গেছে ষষ্ঠীর দিনে পিসিমার আসার অপেক্ষায় পথ না চেয়ে ভোলাই সিং এর পুকুর পাড়ে বট গাছের নিচে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা…..।হারিয়ে গেছে আমার ফেলে আসা লাল মাটির গাঁয়ের সেই হুল্লোড়ে মাতা জীবনের পূজো. …।