বাউলরা অল্পতেই দুঃখ পায় না- কাঙ্গালিনী সুফিয়া

ফয়েজ আহমেদ: সবেমাত্র ভোরের আলো ছড়াচ্ছে চারদিক। সাভারের জামশিংয়ের পথ ধরে একটু সামনে গিয়েই খুঁজে পেলাম লোকগানের শিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়াকে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর তবু গানের আছে বেশ জোর। নতুন করে একটি গান বাঁধছেন তিনি। শুনালেন তার কয়েকটি লাইন। পুরো গান শুনতে চাইলে বাদ সাধেন। জানান, অনেকেই নাকি তার গান চুরি করেছেন। সুতরাং নতুন গানটি আর শোনা হলো না। তবে শুনালেন তার জনপ্রিয় গানের কয়েকটি- পরাণের বান্ধব রে/বুড়ি হইলাম তোর কারণে, কোনবা পথে নিতাইগঞ্জে যাই, ওকি ময়নারে, আমার ভাঁটি গাঙের নাইয়া, নারীর কাছে কেউ যায় না, মানুষ কখন আসে কখন যায়। জানতে চাইলাম, গেল বছরের শেষদিকে লোকসংগীতের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্ট-২০১৫’ এর তৃতীয় দিনে আপনার গান গাওয়ার কথা থাকলেও কেন গান গাইতে পারেননি। বললেন, লোকসংগীতের উৎসবে আমি কাঙ্গালিনী গান গাইতে পারিনি এ নিয়ে আমার দুঃখ নেই। আমি বাউল মানুষ, বাউলরা অল্পতে দুঃখ পায় না। দুঃখ একটা জায়গায় আয়োজকsafiaরা আমাকে আমন্ত্রণ করে কেন গান গাওয়ার সুযোগ দিতে পারলেন না। পত্রিকায়, রেডিও, টিভিতে প্রচারিত হয়েছে তৃতীয় দিন আমি গান গাইব কিন্তু আমাকে সুযোগ দিতে পারেননি। নামের পূর্বে কাঙ্গালিনী শব্দটার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার প্রকৃত নাম ছিল অনিতা খেপী। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর সুফিয়া খাতুন নাম রাখা হয়। পরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সাবেক ডিজি মুস্তাফা মনোয়ার আমাকে কাঙ্গালিনী উপাধি প্রদান করেন। তারপর থেকে দেশব্যাপী আমি কাঙ্গালিনী সুফিয়া নামে পরিচিত হই। কাঙ্গালিনী সুফিয়া ১৯৬১ সালে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার রামদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রাম্য একটি গানের অনুষ্ঠানে ১৪ বছর বয়সে তিনি তার সংগীত জীবন শুরু করেন। ওস্তাদ হালিম বয়াতির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ১৯৭৮ সালে। তার গুরু দেবেন থাপা, গৌর মোহন্ত। গুণী এই সংগীতশিল্পী সরকার থেকে অনুদান পাচ্ছেন প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা আর তার থাকার জন্য রাজবাড়ীর কল্যাণপুরের বিলপাড়ায় ২০ শতাংশ জায়গায় একটি বাড়ি করে দিয়েছে সরকার। তাছাড়া অসুস্থ অবস্থায় যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন তখন সরকার চিকিৎসা খরচ দিয়েছে। বেশ কিছু চলচ্চিত্রের গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। ‘এই ঘুমতো সেই ঘুম না, উঠো প্রভাতে জাগিয়া…’ কথায় ‘রাজ সিংহাসন’ চলচ্চিত্রে প্রথম কণ্ঠ দেন তিনি। গানের পাশাপাশি অনুরোধের কারণে দু-একটি নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেছেন। বুড়ি হইলাম তোর কারণে গানটি অবলম্বনে নির্মিত নাটক ‘নোনাজলের গল্প’। এ নাটকে সুফিয়া প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। ‘দেয়াল’ নামের একটি নাটক করেছেন। এছাড়াও তিনি ১৯৯৭ সালে ‘বুকের ভেতর আগুন’ নামে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সুফিয়ার মোট রচিত গানের সংখ্যা প্রায় ৫০০। গুণী এই শিল্পী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, চীন ও ভারতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। সংগীতে তিনি প্রায় ৩০টি জাতীয় ও ১০টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয় এই শিল্পীর কণ্ঠে নতুন গান শোনা যায়নি। তবে সম্প্রতি প্রয়াত আব্দুর রহমান বয়াতির অপ্রকাশিত লেখা গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। গানটির কথা এমন- ‘ভুলি ভুলি মনে করি/মনে ধৈর্য মানে না/ তোমরা যে বোঝাওগো সখী ভুলতে পারি না…।’ মগবাজারের একটি স্টুডিওতে গানটির ধারণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গানটিতে সুর দিয়েছেন মুরাদ নূর। সংগীত করেছেন মুশফিক লিটু। উল্লেখ্য, আবদুর রহমান বয়াতির ছেলে আলম বয়াতির অনুমতি সাপেক্ষে গানটি করা হচ্ছে।

বিদায় বেলায় জানতে চাইলাম- নিঃসন্দেহে আপনি গান ভালোবাসেন, গান ছাড়া আর কি ভালোবাসেন?

বললেন- গানের ভালোবাসাই তো মজে আছি। গান ছাড়া আর কিছুই ভালোবাসি না। যে কটা দিন বাঁচবো গানকে ভালোবেসেই বাঁচবো। এখানে অন্য কিছুর ভাগ বসাবো না। গানই তো আমার ঘর-বসতি।

প্রণম্য  কাঙালিনী সুফিয়া। আপনার মতো যেন এ প্রজন্মের শিল্পীদেরও ঘর-বসতি হয় গান।