উল্লাস পরিণত হলো কান্নায়

আহসান শামীমঃ বাংলাদেশ, বাংলাদেশ চিৎকার। গ্যালারী উত্তাল। বাজছে ঢোল, উড়ছে পতাকা। খেলার মোড় ঘুরে গেছে। টাইগাররা চেপে ধরেছে ইংলিশদের। তারপর শুরু হলো আশার আলো নিভে যাওয়ার গল্প একটু একটু করে। গ্যালারীতে শুনশান নিরবতা । দর্শকদের গাল বেয়ে নামছে অশ্রু। ঠিক এরকমই ছিল বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের ওয়ান ডে সিরিজের প্রথম ম্যাচের অন্তিম ছবিটা। বেদনায় আদ্র, যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত।
যখন জয় উদযাপনের জন্য উন্মুখ বাংলাদেশ ঠিক তখনই ৫৫ বলে ৭৯ রান করে সাকিব আউট । হতে তখনও ৬ উইকেটে । জয়ের জন্য রান দরকার ৩৮। বল বাকি ৪৯ ।বিস্ফোরণের ইনিংস খেলে ইমরুল কায়েস ১১২ রান নিয়ে তখনও ক্রিজে।তবে তাঁর আরেকটু দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। মোসাদ্দেক মাঠে নেমেই প্রথম বলেই উইকেট হারিয়ে মাঠের বাইরে । পরের বলে কায়েস ১১২ রানে ইনিংস শেষ । হঠাৎ করেই বদলে গেল দৃশ্যপট । যেখানে পাঁচ উইকেটে রান ছিলো ২৭১ সেখানে পরের ছয় উইকেট হারিয়ে রান যোগ হলো মাত্র ১৭।
মিরপুরে শুক্রবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ২১ রানে এভাবেই হেরে যায় মাশরাফির দল। ফলে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ১-০ তে পিছয়ে পড়লো বাংলাদেশ।পরাজয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে টাইগারদের অধিনায়কের চেহারা মলিন। সোজাসাপ্টা উত্তর তার, এমন পরাজয়ে মেনে নেয়া কঠিন। আগামীকাল রবিবার সিরিজের দ্বিতীয় ওডিআইতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের ব্যাপারে কোন মন্তব্য না করেই সম্মেলনটা শেষ করেন অধিনায়ক মাশরাফি। হয়ত কষ্ট আড়াল করে রাখতে চেষ্টা করছিলেন তিনি। shakib-al-hasan-ban
প্রথম ম্যাচে মাত্র ১৭ রানে শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ ম্যাচটাই হেরে গেছে। এ যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না ইংলিশ মিডিয়ার। নিজ দলের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন, অভিষিক্ত জ্যাক বলের দুর্দান্ত বোলিং, বেন স্টোকসের সেঞ্চুরি, জস বাটলারের প্রথম নেতৃত্ব—সবই তারা প্রশংসা করেছে। কিন্তু ঘুরে–ফিরে তবু যেন একটা অবিশ্বাসের প্রতিধ্বনি। এমনভাবে ম্যাচ হারল বাংলাদেশ!
টেলিগ্রাফের চোখে ইংল্যান্ডের এই জয় ছিল ‘আনলাইকলি’ । যা সম্ভব হবে বলে ভাবাই যায়নি। একেবারেই শিরোনামেই তা উল্লেখ করেছে ব্রিটিশ দৈনিকটি। শিরোনামে না উল্লেখ করলেও বিবিসি তাদের ম্যাচ রিপোর্টের শুরুতেই এই জয়কে বলেছে ‘রোমহর্ষক’। ডেইলি মেইলও তাদের লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছে, ‘নিশ্চিত বড় পরাজয়ের মুখেই ছিল ইংল্যান্ড, যখন গত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে নাস্তানাবুদ করার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছিল বাংলাদেশ, ৩০৯ রানের পুঁজিকেও মনে হচ্ছিল অপর্যাপ্ত। হতবিহ্বল গ্যালারির নিস্তব্ধতাকে গার্ডিয়ান লিখেছে ‘পরীক্ষার হল’।
আরেক জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড ডেইলি সান যেমন লিখেছে, ‘জ্যাক বল ওয়ানডে অভিষেকেই ভোজবাজির মতো ইংল্যান্ডকে স্মরণীয় এক জয় এনে দিলেন, বন্দুক আর নিরাপত্তা নিয়ে এত এত কথা অবশেষে হারিয়ে গেল গুগলি আর ছক্কার আলোচনায়।’
প্রায় প্রত্যেকের ম্যাচ প্রতিবেদনে পেশির টান পড়ে খেলায় ক্ষণিকের বিরতি চলে আসা ইংল্যান্ডের জন্য বিশেষ সুযোগ হয়ে এসেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাকিব ও ইমরুল দুজনই তাদের দুর্দান্ত জুটি গড়ার সময় পেশির টানে পড়েন। দুজনকেই শুশ্রূষা নিতে হয়। তবে সাকিবের শুশ্রূষার নেওয়ার মুহূর্তটি ইংল্যান্ডকে সবকিছু নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছিল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ম্যাচে ফিরে আসে ইংল্যান্ড। ফলাফল বাংলাদেশের ২১ রানের হার।
আফগানদের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে জয়ের পর যারা আত্মসন্তুষ্টিতে বলেছিলেন বাংলাদেশ কত বড় অভিজ্ঞ দল সেটাই প্রমাণ হয়েছে। গতকালের খেলার পর তাদের আত্মসন্তুষ্টি কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো সেটা বোঝা গেল না ।
বাংলাদেশকে নিয়ে একটা খারাপ পরাজয় দিয়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক হবে না । যদিও দলের প্রয়োজন টাইগারদের চুলচেরা বিশ্লেষণ দরকার । এশিয়া কাপে দেশের মাটিতে ফাইনালে মাত্র ২ রানের জন্য জয়টা হাতছাড়া করতে হয়েছিল । গত বছরের ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ খেলায় মাত্র ২ রানের জয়টা হাতছাড়া করতে হয় টাইগার খেলোয়াড়দের অতিরিক্ত উত্সব করতে গিয়ে । সেই ম্যাচে ২ রানের জন্য ৫ উইকেট হারিয়েও আদায় হয়নি জয়টা । ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গতকালের ম্যাচে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। সমস্যা সমাধানে উদ্যোগের অভাব না খেলা নিয়ে অতিরিক্ত গবেষণা ।কোনটা ঠিক বলা মুশকিল । কিন্তু বড় আর অভিজ্ঞ দলে পরিণত হতে হলে এই সমস্যার সমাধান জরুরি।
আফগানদের বিপক্ষে স্পিনারদের অভাব পূরণ করতে হঠাৎ করে দলে ৮ বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকা মোশাররফ রুবেলের জায়গা হয় মুল একাদশে ।যদিও আফগানদের দল আর ইংল্যান্ডের দলের পার্থক্য অনেক। সেই হিসাব নিকাশ না করেই বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন রুবেলকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের মুল একাদশে রাখার কথা আগেভাগে ঘোষণা দিলেন । যে কারণে বিসিবি একাদশের হয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে দারুণ পারফরমেন্সের পরেও অলরাউন্ডার নাসিরের জায়গা হয়নি মুল একাদশে। ফর্মে ফিরে আসা নাসির রুবেলের পরিবর্তে মুল একাদশে থাকলে হয়তো গতকাল রাতে খেলার ফলাফল অন্যরকম হতে পারতো । অথচ মুল একাদশে রাখা স্পিনার মোশাররফ রুবেল গতকাল মাত্র তিন ওভার বল করেছেন। খেলার শেষ পর্যায়ে ব্যাট হাতে কিছুই করতে পারেননি । টাইগারদের কাটার মাষ্টার মুস্তাফিজের অভাব অনেকটাই পূরণ করেছে পেসার সাইফুল । দলের মুল সমস্যা এখন নিচের দিকের খেলোয়াড়দের রান না পাওয়া । এইদিক বিবেচনায় মাঠের বাইরে থাকা অলরাউন্ডার নাসিরের মুল একাদশে থাকাটা খুব জরুরী ।
দীর্ঘদিন ধরে টাইগাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে । কোচিং স্টাফ ছাড়া বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা সঠিকভাবে আন্তর্জাতিক মানের অনুশীলন থেকে বঞ্চিত। একমাত্র সাকিব আল হাসান বিভিন্ন জায়গায় টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট খেলায় দারুণ একটা ফর্ম ধরে রাখতে পেরেছেন । প্রতিটা খেলায় তিনি যুক্ত হচ্ছেন নতুন নতুন রেকর্ডের তালিকায়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের মাঠে বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণের দিনেও অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের শের্ন ওয়ার্নের দারুণ একটা রেকর্ড অতিক্রম করেন সাকিব । যদিও সেই রেকর্ড নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি।
ওয়ানডেতে ঘরের মাঠে সাকিবের উইকেট এখন ১৩৬টি। আর ১২ বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে নিজ দেশে ১৩৪ উইকেট নেন অস্ট্রেলিয়া স্পিনার ওয়ার্ন। ঘরের মাঠে ওয়ানডে ম্যাচে সবচেয়ে বেশি উইকেটের মালিক দক্ষিণ আফ্রিকার শেন পোলক। ১২৭ ম্যাচে ১৯৩ উইকেট শিকার করেন পোলক।১৬৯ উইকেট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ওয়ার্নের স্বদেশি ব্রেট লি। এরপরের দুটি স্থানে রয়েছেন অস্ট্রিলিয়ার আরেক কিংবদন্তি গ্লেন ম্যাকগ্রা ও লঙ্কান স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন। ঘরের মাঠে তারা পেয়েছেন যথাক্রমে ১৬০ ও ১৫৪ উইকেট।
এখন সাকিব যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন তাতে পোলককে ছাড়াতেও হয়তো আর বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না তাকে।
আগামীকাল রোববার মিরপুরে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে আবারও ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে স্বাগতিক বাংলাদেশ। মানসিক চাপে খানিকটা ভেঙ্গে পড়া টাইগারদের সামনে কঠিন পরীক্ষা সিরিজে সমতা ফিরিয়ে আনার। কতটা সফল হবে সেটা সময়েই বলে দেবে ।