চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়

আজ তাঁর সঙ্গেই সারাদিন। গভীর সবুজ অরণ্য ঘন হয়ে আছে চারপাশে। কোথাও ডেকে উঠলো অচেনা পাখি। তিনি হেঁটে যাচ্ছেন। দূরে কী কোথাও গুলির শব্দ শোনা গেলো?তার পেছনে আরও কিছু মানুষ, ক্লান্ত, আহত, ক্ষুধার্ত। সবাই সশস্ত্র। তাঁর হাতের বন্দুকটা কাঁধে ঝুলছে। ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়তে চায় শরীর। কাল রাত থেকেই তো এই যাত্রা। এখন তো পিছিয়ে পড়লে চলবে না। পুরো দলটাই ঘেরাও হয়ে গেছে। সহযোদ্ধাদের নিয়ে এই ঘেরাও ভেঙ্গে বের হয়ে যেতে চাইছেন তিনি। পারবেন কী? শ্বাসকষ্ট চেপে ধরেছে বুকের ভেতরটা আগ্রাসনের মতো। এগিয়ে আসছে যন্ত্রণা, কষ্ট, আসছে তাদের ঘিরে থাকা সেনাদলটার মতো।
আজ সারাদিন তার সঙ্গে থাকতে পারিনি কেউ-ই।
অনেক বছর আগে বন্ধুর সঙ্গে মোটরবাইকে চেপে বের হয়ে পড়েছিলেন বাড়ি থেকে। চষে বেড়িয়েছিলেন গোটা দক্ষিণ আমেরিকা। দেখেছিলেন কাছ থেকে মানুষের জীবন, তাদের যন্ত্রণা আর শোষণের আসল চেহারাটা। সেই বোধ হয় তার শুরু। ডাক্তারি পেশা বাদ দিয়ে রাজনীতি আর শ্রেণী সংগ্রামের পথে হাঁটতে শুরু করেছিলেন তিনি। তারপর? তারপর বন্দুক হাতে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া। সেটা ১৯৬৫ সালের কথা। ছোট্ট্ একটা জাহাজে চড়ে ভেসে পড়লেন তিনি। সঙ্গী সব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্নি পুরুষেরা। সেদিনও তাঁর সঙ্গে থাকা হয়নি। অবতরণ করেছিলেন কিউবা নামের দেশটির উপকূলে। তারপর বনে জঙ্গলে এক অসম সাহসী গেরিলা যোদ্ধা ঘুরে বেড়াচ্ছেন, লড়াই করছেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পতাকা হাতে।
এতোক্ষণ তো এক নিমেষে অনেক বছরের কথা বলা হয়ে গেলো। আবার ফিরে আসি সেই সবুজ জঙ্গলের ভেতরে সেই মহাকালের যাত্রীদের কথায়। সেই যাত্রীদলের নেতা হাঁটছেন অরণ্যের পথে। সাহস হারাননি তিনি। কিন্তু শত্রুপক্ষ তো প্রায় ঘিরে ফেলেছে তাকে। পালিয়ে যাবার পথ খুঁজেছিলেন তিনি? প্রশ্নই ওঠে না। পথে পথে খন্ড যুদ্ধ চলে, চলে এগিয়ে যাওয়া। সেই যাত্রায় সঙ্গে ছিলাম না আমরা কেউ। সেই ভাঙ্গা সূর্যের নিচে রক্তাক্ত লড়াই, ধড়া পড়ে যাওয়া শত্রুপক্ষের হাতে-না কোথাও আমাদের কারও চিহ্ন ছিল না। তিনি একাই লড়েছিলেন সেই যুদ্ধ। তারপর? তারপর একটা স্কুল ঘরের ভেতরে আটকে রেখে তাঁকে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়। নিভিয়ে ফেলা হয় বিপ্লবের সূর্যকে।
কিন্তু সেদিন সেই আগুন কী নিভিয়ে ফেলতে পেরেছিল তারা? না, সে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে। সেই মানুষের নাম আজও পৃথিবীজুড়ে বিপ্লবের আকাঙ্খায় উন্মাতাল মানুষের মুখে মুখে। আজ ৯ অক্টোবর তার মৃত্যুদিবস। আজ সারাটা দিন তার সঙ্গেই আছি। মনে মনে শুধু বলে চলেছি-চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।

ইরাজ আহমেদ