এক জীবনের পুরোটাই ক্রেডিট আর ডেবিটের গল্প….।

m-al-mamun

এম আল মামুন

গেল উইক এণ্ডের ঘটনা। শনিবার সাত সকালে আমি আর আমার এক সিনিয়র চিকিৎসক বন্ধু গিয়েছি তাবুক ডাউন টাউনের উপমহাদেশীয় বাজার এলাকায়। উদ্দেশ্য, কোনও এক উপমহাদেশীয় রেস্টুরেন্টে ঢুকে গরম গরম পরোটা খাবো। পরোটার সাথে কাঁচা মরিচ-পেঁয়াজ মেশানো ডিম ভাজি, সবজি আর সুজির হালুয়া। এরপর আয়েশ করে এক কাপ চা। মরু জনপদে পেশাগত জীবনের চলার বাঁকে সপ্তাহান্তের এই সাদামাটা নাস্তাটা আমরা দারুণ রকম উপভোগ করি। উপভোগ করি নাস্তার সাথের আড্ডাটাও। সম্ভবতঃ এর কারণ, আমরা দুজনেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। কে জানে, হয়তো আমাদের অবচেতন মন ঐ গরম পরোটা, ডিম ভাজি আর চায়ের মাঝে খুঁজে বেড়ায়- সেই বাঘমারা হোস্টেলের পুকুর পাড়ের ক্যান্টিন, কলেজ ক্যাম্পাসের ক্যান্টিন, ডক্টরস্ ক্লাবের জবেদ আলীর কিংবা হাকিমের ক্যান্টিন। যদিও জানি, মেডিকেল কলেজ জীবনের ঐ নাস্তার স্বাদ, এই আরব দেশে কেন, বর্তমান পৃথিবীর কোনও পাঁচ তারকা হোটেলেও পাওয়া সম্ভব নয়। এভাবেই কোনও কোনও উইক এণ্ডে মরুভূমির শূন্যতায় দু’জন স্মৃতিকাতর মানুষ দূর অতীতে হারিয়ে যাই….।
starbucks-barista11এবার মূল ঘটনায় আসি। নাস্তা শেষ করে একটা এটিএম মেশিনে ঢুকেছি। পকেট একেবারেই খালি। কিছু টাকা তোলা দরকার। সচল মেশিনের সবুজ বাতি জ্বলা গর্তে ডেবিট কার্ড ঢুকিয়ে অপেক্ষা করছি পিন কোড চাপবো। কিন্ত মেশিন আমাকে সেই সুযোগ দিলো না। মনিটরে ভেসে উঠলো- সরি, উই ক্যানট্ সার্ভ ইউ অ্যাট দিস্ মোমেন্ট। দিস্ মেশিন ইজ আন্ডার মেইনটেইনেন্স। সাথে সাথে মেশিনের গর্তে জ্বলা সবুজ বাতির রঙ লাল হয়ে গেল। তার মানে সচল মেশিন মুহূর্তেই অচল। দ্রুত ক্যান্সেল বাটন চাপলাম। কিন্তু হায়, অনেক চেষ্টা করেও আমার ডেবিট কার্ড মেশিনের ভেতর থেকে ফেরত আনতে পারলাম না। অথচ একটু আগে আমার চোখের সামনে এক সুদানী ভদ্রলোক এই মেশিন থেকেই টাকা তুলে দিব্যি চলে গেলেন। সৌদি আরবের জাতীয় দিবসের কারণে লং উইক এণ্ড চলছে। কাজেই ব্যাংক থেকে কার্ড ফেরত পেতে কিংবা নতুন কার্ড ইস্যু করাতে আমাকে অন্ততঃ আরও দুইটা দিন অপেক্ষা করতে হবে। এ আর এমন কি? মানুষের পুরো জীবনটাই তো অপেক্ষার। আমরা তো প্রতিনিয়তই কিছু না কিছুর জন্যে অপেক্ষা করি….।
এই যেমন, মাস চারেক আগের কোনও এক মেঘাচ্ছন্ন সকালে আমি লন্ডনের গ্যাট উইক বিমানবন্দরের আভ্যন্তরীণ লাউন্জে, অপেক্ষা করছি টরোন্টোগামী ফ্লাইটের জন্যে। স্টারবাকস্-এ ঢুকে স্যাণ্ডউইচ আর কফির অর্ডার দিয়েছি। পেমেন্ট করার জন্যে মানিব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে কাউন্টারের শ্বেতাঙ্গিনী তরুণীর হাতে দিলাম। তরুণী হাসিমুখে কার্ডটি “পয়েন্ট অব সেলস্ টারমিনাল” মেশিনে ঢোকাচ্ছে। আমি তরুণীর অনিন্দ্য সুন্দর মুখমন্ডলে ছড়িয়ে থাকা মিষ্টি হাসির দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছি। তবে এই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। তরুণী আমাকে কার্ড ফেরত দিয়ে বললো, সরি, আনফরচুনেটলি দিস্ মেশিন ক্যানট্ রিড ইয়োর ভিসা কার্ড। তুমি কি ক্যাশ-এ পেমেন্ট করতে পারবেSTARBUCKS COFFEE COMPANY - True North Blend™ Blonde Roast? আমি না-সূচক উত্তর দিয়ে অর্ডার বাতিল করে স্টারবাকস্ থেকে বেরিয়ে এলাম। ক্যাশেও পেমেন্ট করতে পারতাম, কারণ আমার কাছে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যাশ ডলার আছে। কিন্তু আমাকে নিশ্চিত হতে হবে, ক্রেডিট কার্ডটি আসলেই কাজ করছে না। অন্য কোনও কফি শপে গিয়ে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। পাশের আরেকটি রেস্টুরেন্টে ‌ঢুকে স্যাণ্ডউইচ আর কফির অর্ডার দিয়ে কাউন্টারে ক্রেডিট কার্ড এগিয়ে দিলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অ্যাপ্রুভড্ লেখা প্রিন্ট বের হতে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখানে পাঠকদের জানিয়ে রাখা ভালো, কানাডায় এই একই ক্রেডিট কার্ড কোথাও কাজ করেছে, আবার কোথাও কাজ করে নি। সে গল্প না হয় আরেকদিন বলা যাবে।
কানাডা-বাংলাদেশ ভ্রমণ শেষ করে তাবুকে ফেরার পরদিনের ঘটনা। মরুশহরটির যে সুপার মল থেকে আমি নিত্যদিনের বাজার সারি, সেই মলের অতি চেনা “পয়েন্ট অব সেলস্ টারমিনাল” মেশিন আমার ক্রেডিট কার্ড পড়তে পারছে না। কাউন্টারের সেলস্ ম্যান আমাকে আরবি ভাষায় বললো, সম্ভবতঃ তোমার কার্ডের ইলেকট্রনিক চিপ নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে কার্ডটা রিপ্লেস করে নিও। বাসায় ফিরে ইন্টারনেটে ঢুকলাম। একই ক্রেডিট কার্ড দিয়ে অনলাইনে কোনও ঝামেলা ছাড়াই বাসার ল্যাণ্ড ফোনের বিল শোধ করলাম। ফিজিক্যালি কাজ না করলেও এই কার্ড দিয়ে অন লাইনে কেনাকাটা করা যাচ্ছে। তার মানে সেলস্ ম্যানের কথাই ঠিক। ব্যাংকে গিয়ে কার্ডটা বদলে নিতে হবে। কিন্তু হায়, দেখতে দেখতে চার মাস পেরিয়ে গেছে। আমার ব্যাংকেও যাওয়া হয় নি, কার্ডও বদলে নেয়া হয় নি। হয়তো একেই বলে আলসেমি।
ক্রেডিট মানে পাওয়া, আর ডেবিট মানে হারানো। মানুষের এক জীবনের পুরোটাই তো ক্রেডিট আর ডেবিটের গল্প….।