টরন্টো্তে শারদীয় দূর্গাপূজা উৎসব

আন্জুমান রোজী (টরেন্ট থেকে): ধর্ম যার যার, উৎসব সবার, তা সতঃসিদ্ধভাবে প্রমানিত হলো আবারো শারদীয় দূর্গাপূজা উৎসবে। কথাটা মনে গেঁথে আছে গভীরভাবে সময়ের তালে তালে বাংলার সব প্রাণের উৎসবের সঙ্গে। সব ধর্মীয় উৎসব যেন বাংলা-সংস্কৃতির প্রধান অংশ হয়ে উঠছে।তেমনি দূর্গাপূজাও বাংলার একটি শ্রেষ্ঠ উৎসব। দূর্গাপূজা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে গেছে বাংলার সার্বজনীন উৎসব।

সনাতন ধর্মী্য় চেতনালব্ধ এই পূজা। বিশ্বব্রক্ষ্মন্ডের শান্তি রক্ষার্থে শ্রী দূর্গা মহাশক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিশ্বব্যাপি উচ্ছৃঙ্খলতা, ধর্মী্য় উন্মত্ততা, অশুভ শক্তির তান্ডবলীলা ধ্বংসের অভিপ্রায়ে শান্তিরূপিনী শ্রী দূর্গার চরনে আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়। সামাজিক সম্প্রীতির চেতনায়,আনন্দোৎসবের নিবিড়তায়, মানবিক মূল্যবোধের প্রেরনায় এবং আধ্যাতিক সাধনার দ্যোতনায় এ পূজার তাৎপর্য্য অত্যন্ত ব্যাপক ও গভীর।

শারদীয় দূর্গাপূজা উপলক্ষে টরন্টোর বাংলাদেশী কমিউনিটিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সংগঠন পৃথক পৃথকভাবে পূজা ও নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিপুল উৎসাহ উদ্দিপনা আর ধর্মীয় ভাবগম্ভির্যতার মধ্য দিয়ে হিন্দু ধর্মাবম্বীদের সর্ববৃহৎধর্মীয় উৎসব দূর্গাপুজা উদযাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশ-কানাডা হিন্দু মন্দির, হিন্দু ধর্মাশ্রম এবং টরন্টো দুর্গাবাড়িতে অক্টোবরের ৭, ৮, ৯ ও ১০ তারিখে আড়ম্বর আয়োজনে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী পূজা হচ্ছে। পূজা শেষে অঞ্জলি প্রদানের ব্যবস্থা আছে। আরো আছে প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থাও। মহালয়া,তর্পন,নবরাত্রি, বোধন, অধিবাস, বিজয় উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,প্রসাদ বিতরণ, স্মরণিকা প্রাকাশ সহ বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহন করে “হিন্দু ধর্মাশ্রম টরন্টো”র পূজা কমিটি। “হিন্দু ধর্মাশ্রম টরেন্টো”র পূজা কমিটির পক্ষ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে আমরা ক’জন বন্ধু-বান্ধবি গিয়েছিলাম পূজা মন্ডপে। ধর্মাশ্রমেpuja-2 যেতেই দেখি লোকে-লোকারন্য। মানুষের ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই শুনি দূর থেকে ভেসে আসা পূজার গান। মন্ত্রমুগ্ধের মত ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সবাই গান শুনছে আপন ধ্যানে।সার্বজনীন এই উৎসবে উপস্থিত হতে পেরে আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠছিলাম, বার বার চোখের সামনে ভেসে আসছিল পুরনো ঢাকার শারদীয় দূর্গা উৎসবের সেই হিরন্ময় দিনগুলো।

পন্ডিত প্রসেনজিৎ দেওঘরিয়া ও অরুনাভ ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট শিল্পী অরুনাভ ভট্টাচার্য বাংলাদেশ-কানাডা হিন্দু মন্দির এবং টরন্টো দুর্গাবাড়িতে মহালয়ায় নেতৃত্ব দেন। পন্ডিত প্রসেনজিৎ দেওঘরিয়ার দলটি পরিবেশন করেন হিন্দু ধর্মাশ্রমে। প্রবাসী ক্লাবেও তাঁরা মহালয়ার অনুষ্ঠান করেছেন। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিল্পীদের অংশগ্রহণে সে অনুষ্ঠান অসাম্প্রদায়িক বাঙালির দীর্ঘ ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। উদাহরণ তৈরি করেছে যে কোনো বাঙালির জন্যে। নজর কেড়েছে বাংলাদেশের বহু লেখক-সাংবাদিককে। অন্যদিকে শংকর চক্রবর্তী এবং অরুনাংশু হোর তাঁদের উচ্চমার্গের উপস্থাপনায় মুগ্ধ করেছেন বঙ্গীয় পরিষদের শ্রোতাদের। টরেন্টো কালীবাড়িতে কৃষ্ণকলি সেনগুপ্তা এবং অরুনাংশু হোর করেছেন অনুপম মহালয়া। তাদের মাসাধিককালের দলগত অনুশীলন মূল্যায়িত হয়েছে দর্শক-শ্রোতাদের কাছে।

শক্তি আর ঐক্যের পূজা হলো দূর্গাপূজা।অসুরদের হাতে স্বর্গের দেবতাগন পরাজিত, নির্যাতিত ও স্বর্গচ্যুৎ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে একক শক্তি হিসাবে মা দূর্গাকে সৃষ্টি করেন। দশভূজা দূর্গাদেবী মহাশক্তিধারিনীর হাতে পরাস্ত সকল অসুরের দল। এমনি চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে দূর্গাদেবীকে দেখছিলাম, আর ভাবছিলাম দূর্গাদেবীর ঐশ্বরিক শক্তির কথা ।কি মোহমায়ায় আটকিয়ে রেখেছেন এই বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ডকে, আগলে রেখেছেন সকল সত্য সুন্দরের অসীমতাকে,যেন আশীর্বাদের ঝর্নাধারা ঝরে পড়ছে ভক্ত অনুরাগিদের মনন চৈতন্যে,সিক্ত হচ্ছে ভালোবাসার সকল মিলনে, জাগিয়ে তুলছেন মানবতাকে। আর সকল হিংসা, দ্বেষ-বিদ্বেষের উর্ধে নিয়ে যাচ্ছেন মানবধর্মকে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সম্মিলিত এই মিলন মেলা মানুষে মানুষে সম্প্রীতির যোগসূত্র এনে দিয়েছে।সকল সীমাবদ্ধতার উর্ধে্ব উঠে আজ শারদীয় উৎসব হয়েছে সার্বজনীন। তাই আবারো মহাদেবীর কাছে প্রার্থণা দূর হোক সকল দুঃখ, দৈন্য, দূর্বলতা, স্বার্থপরতা ।বিনাশ হোক সকল প্রকার অসুরতা,ক্ষুদ্রতা, ক্রোধ, লোভ, ভয়, হানাহানি,হিংসা-বিদ্বেষ, রেষারেষি। হস্ত প্রসারিত হোক মানবতায়।জয় হোক মানবতার, মানবধর্মের।